Logo
Logo
×

Advertisement

দৃষ্টিপাত

সেকুলার নামের পিকুলার রূপ এবং ব্যাকফায়ারের গল্প

Advertisement

Icon

কাকন রেজা

প্রকাশ: ০২ জানুয়ারি ২০২০, ০৫:৫৩ পিএম

সেকুলার নামের পিকুলার রূপ এবং ব্যাকফায়ারের গল্প

Advertisement

খুব একটা কার্যত না হলেও নামত ভারতের একটি সেকুলার চরিত্র ছিল। ভারতের জাতীয় প্রতীক অশোকস্তম্ভের নিচে হিন্দু ধর্মের উপনিষদ থেকে নেয়া বাণী ‘সত্যমেব জয়তে’ লেখা থাকলেও, সেটা সেকুলার নাম ধারণের পেছনে কোনো বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। 

ভারতের বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তা হিন্দু ধর্মশাস্ত্র উদ্ধৃত এ বাক্যটিকে সার্বজনীন হিসাবেই ধরে নিয়েছিল। ‘সত্যের জয় অবশ্যম্ভাবী’ এটা শুধু হিন্দু ধর্মের কথা নয়, সব ধর্মেরই কথা। সব মানবিকবোধ সম্পন্ন মানুষেরই চিন্তা। ধর্ম দিয়ে এই চিন্তাকে বিভাজন করতে গেলে দেশ বিভাজিত হবে, এমনটাই ভাবনা ছিলো তাদের। আর ভারতে বুদ্ধিজীবীদের সিংহভাগই ধর্মের চেয়ে দেশের উপর জোর দিয়েছেন। 

কারণ ১৯৪৭ এর দেশভাগ এবং দ্বিজাতি তত্ত্বের রূপটা তারা বুঝেছিলেন। তারা জানতেন জাতিতত্ত্ব যত টেনে আনা যাবে তত টুকরো হবে ভারতভূমি। তাই ভারতীয় বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তা এর সেকুলার রূপটি ধরে রাখতে চেয়েছিল।  

এখানে একটু আমাদের কথা বলেনি। আমাদের সংবিধানে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ সংযোজনে অনেকে আপত্তি জানিয়েছিলেন। কিন্তু তারপরও দেশটাতে ধর্মীয় অনুদারতার ছাপ খুব আশংকাজনকভাবে লাগেনি। 

আল্লাহ, ঈশ্বর, ভগবান এসব নাম সবই সৃষ্টিকর্তার এটা সর্বজনে মানেন। যেমন উপনিষদের বাণী হলেও, ‘সত্যের জয় অবশ্যম্ভাবী’ এর একটি সার্বজনীনতা ছিল। তাই যে নামেই হোক সৃষ্টিকর্তার নামে কিছু শুরু হবে সে কারণেই ‘বিসমিল্লাহ’ বিষয়ে ঘোরতর আপত্তি উঠেনি। 

আর সবধর্মের মানুষের জন্য এটা ফরযে আইনও করা হয়নি। কিন্তু সমস্যাটা পাকিয়েছে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম করা নিয়ে। রাষ্ট্রের মূলত কোনো ধর্ম হয় না, মানুষের হয়। মানুষের সংখ্যাধিক্যে রাষ্ট্রকে হয়তো একটা ক্ষেত্রে চিহ্নিত করার কাজ দেয় ধর্ম। তবে সেই চিহ্নিত করার প্রক্রিয়াটাও সঠিক কিনা তা নিয়ে রয়েছে বিস্তর বাহাস। 

মুসলিম রাষ্ট্রগুলো যেভাবে ধর্ম দ্বারা চিহ্নিত হয়, সে অর্থে তাদের ধর্মীয় প্রকৃতিটা নেই। অর্থাৎ সে রাষ্ট্র অন্যধর্মের বসবাসের অনুপযুক্ত নয়। দুবাইয়ে দুর্গাপূজা হয়। মধ্যপ্রাচ্যে বসবাসরত হিন্দুরা তাদের পূজা-পার্বণ পালন করেন। 

মুসলিম রাষ্ট্র হিসাবে স্বীকৃত রাষ্ট্রগুলো তাতে কোনো বাধা দেয় না। সংখ্যাধিক্যে বাংলাদেশ মুসলিম রাষ্ট্র হিসাবে পরিচিতি পেলেও, দেশটা মূলত গণতান্ত্রিক। পরমত-ধর্মে সহিষ্ণুতা এখানে সংবিধান স্বীকৃত। 

এমন একটি দেশে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম, এমনটা অনেকেই মেনে নিতে পারেননি। অনেকে রাষ্ট্রধর্মের বিষয়টির সরাসরি বিরোধীতা করেছেন। আবার কেউ বলেছেন, শরিয়াহ আইন চালু করলেই হতো, ‘না ঘরকা, না ঘাটকা’ করার দরকার কি ছিল! 

রাষ্ট্র ব্যবস্থা গণতান্ত্রিক হোক, আর শরিয়াহ’র হোক তা মানুষের কল্যাণে হলে সব ব্যবস্থাই ভালো। মানুষের মৌলিক অধিকার কেড়ে নিয়ে তাকে ডিটেনশন ক্যাম্পে পাঠানোর চেয়ে অন্তত ভালো। ‘ডিটেনশনে’র শব্দগত অর্থ বন্দিত্ব, আটক। একজন স্বাধীন মানুষকে ক্ষতিকর অপরাধের কারণ ছাড়া বন্দি বা আটক করার চেয়ে খারাপ কোনো আইন হতে পারে না। এনআরসি সর্বতোভাবে একটি খারাপ আইন। 

খারাপ আইন সবসময়ই ব্যাকফায়ার করে। এনআরসি’র নামে ভারত থেকে বাংলাভাষী মুসলিমদের তাড়ানোর যে প্রজেক্ট হাতে নিয়েছে বিজেপি, তা ব্যাকফায়ার করেছে। একে একে দেউটি নিভতে চলেছে বিজেপির। ভারতের মানচিত্র থেকে ক্রমেই গেরুয়া রঙ উধাও হতে চলেছে। 

মুসলমানদের বোল্ডআউট করার পন্থায় হিন্দুরাও রানআউটে পড়েছেন। ফলে আসাম এমনকি খোদ মহারাষ্ট্রেও বিজেপির বিরুদ্ধে উঠেছে বুলন্দ আওয়াজ। ঝাড়খণ্ডের উপনির্বাচনে একরকম শেকড়শুদ্ধ উপড়ে গেছে দলটি। ক্ষমতালোভী, স্বার্থান্ধ স্বৈরতন্ত্রীদের এই অবস্থাই হয়। ইতিহাস তার সাক্ষী।

পুনশ্চ : স্বৈরতন্ত্রে বিভেদ বিভাজনের জন্য শুধু উছিলা লাগে। ধর্ম-বর্ণ-গোষ্ঠী-সম্প্রদায়-ভাষা এসব শুধু সেই উছিলা। ঘোঁট পাকানোর উপকরণ। যে উপকরণ ব্যবহারে টিকে থাকার চেষ্টা করে স্বৈরচারীরা। 

মানুষের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করে। যারা ঐক্যের কথা বলে, ভালোর কথা বলে, আলোর কথা বলে তাদের চুপ করিয়ে দিতে চায়। ভয় দেখিয়ে, নির্যাতন করে কখনো বা হত্যার মাধ্যমে। বিভাজন আর ভীতি সৃষ্টি স্বৈরাচারীদের প্রয়োজনীয় উপকরণ। 

ফুটনোট : খবরে দেখলাম সংবাদ সম্মেলনে পুতিনকে প্রশ্ন করায় রাশিয়ার এক সাংবাদিকের চাকরি চলে গিয়েছে। অর্থাৎ তাকে চুপ করিয়ে দেয়া হয়েছে। বেচারা কেন যে না বুঝে প্রশ্ন করতে গেলো। তাকে বলা উচিত ছিল, ‘সাংবাদিকতা শেখার জন্য সুদূর বঙ্গালে যাও।’

হুমায়ূন আজাদ তার প্রবচনগুচ্ছে শামসুর রাহমান সম্পর্কে লিখেছিলেন, ‘শামসুর রাহমানকে একটি অভিনেত্রীর সাথে টিভিতে দেখা গেছে। শামসুর রাহমান বোঝেন না কার সঙ্গে পর্দায়, কার কার সঙ্গে শয্যায় যেতে হয়।’ রাশিয়ার সাংবাদিকদেরও শেখা উচিত কোথায় কথা বলা উচিত, কোথায় চুপ থাকতে হয়। 

লেখক: কাকন রেজা, সাংবাদিক ও কলাম লেখক। 

Advertisement

সেকুলার

Advertisement

আরও পড়ুন

চীনারা কি বাংলাদেশকে অনলাইন স্ক্যাম নেটওয়ার্কের নতুন ঘাঁটি বানাচ্ছে?

চীনারা কি বাংলাদেশকে অনলাইন স্ক্যাম নেটওয়ার্কের নতুন ঘাঁটি বানাচ্ছে?

ইরানের মিত্র নাকি নিজস্ব স্বার্থে চলে হুথিরা

ইরানের মিত্র নাকি নিজস্ব স্বার্থে চলে হুথিরা

ড. ইউনূসকে হেনস্তা করে কী অর্জন করল আওয়ামী লীগ?

ড. ইউনূসকে হেনস্তা করে কী অর্জন করল আওয়ামী লীগ?

অন্যমত স্থবির শেয়ারবাজারকে টেনে তুলতে যা প্রয়োজন

স্থবির শেয়ারবাজারকে টেনে তুলতে যা প্রয়োজন

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম