বর্তমান সরকারের স্বাস্থ্যব্যবস্থা-একটি পর্যালোচনা
jugantor
বর্তমান সরকারের স্বাস্থ্যব্যবস্থা-একটি পর্যালোচনা

  অধ্যাপক ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদ|সাবেক প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়  

০২ অক্টোবর ২০১৮, ১৯:৪৪:১৪  |  অনলাইন সংস্করণ

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৩ সেপ্টেম্বর সেন্টার অব এক্সিলেন্স প্রকল্পের বাস্তবায়িত কার্যক্রমের শুভ উদ্বোধন করেন। ছবি: যুগান্তর

২০১৮ সালের ৭ অক্টোবর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী চিকিৎসক বান্ধব জননেন্ত্রী শেখ হাসিনা হাজার হাজার চিকিৎসকের সামনে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়ন সর্ম্পকে এবং বাংলাদেশ মেডিক্যাল এসোসিয়েশন এর সকল চিকিৎসকদের অবদান সর্ম্পকে মূল্যবান বক্তব্য রাখবেন বলে আশা করছি।

২০১১ সালের ১৯তম বাংলাদেশ মেডিক্যাল এসোসিয়েশন এর সম্মেলনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ১২ হাজার চিকিৎসকের সামনে যে গুরুত্বপর্ণ ভাষণ প্রদান করেছিলেন তা সকল চিকিৎসককে উৎসাহিত ও অনুপ্রানিত করেছিল। প্রায় ৮ বছর পর আবার তিনি বিএমএ আয়োজিত চিকিৎসক সমাবেশে উপস্থিত থেকে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা সাফল্য ও ভবিষৎ দিক নির্দেশনা প্রদানের জন্য উপস্থিত হয়ে আমাদের সকল চিকিৎসকদের কৃতজ্ঞতা পাশে আবদ্ধ করেছে। মার্দার অব হিউম্যানিটি মাননীয় প্রধান মন্ত্রী বিশ্বনেন্ত্রী সারা বিশ্বের উন্নয়নের রোল মডেল প্রতিষ্ঠায় স্বিকৃতি প্রাপ্ত, চিকিৎসা সেবার উন্নয়নে ব্যাপক প্রসংশা অর্জন করেছেন।

স্বাধীনতা উত্তরকালে বঙ্গবন্ধুর সরকারই প্রথম এ দেশের পল্লী অঞ্চলের সাধারণ মেহনতি মানুষের স্বাস্থ্য সেবার কথা বিবেচনা করে, চিকিৎসা সেবাকে থানা পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যে থানা স্বাস্থ্যকমপ্লেক্স চালু করেন, চিকিৎসকদের সরকারী চাকুরীতে সম্মান ও মর্যাদার কথা বিবেচনা করে চিকিৎসকদের পদমর্যাদা দ্বিতীয় শ্রেনী থেকে প্রথম শ্রেনীতে উন্নীত করেছিলেন যা দেশের চিকিৎসক সমাজ চিরদিন শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে। তার’ই ধারাবাহিকতায় বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা হিসেবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী প্রতি ৬০০০ জনগোষ্ঠির জন্য একটি কমিউনিটি ক্লিনিক ব্যবস্থা প্রবর্তন করে স্বাস্থ্য সেবাকে আরো প্রান্তিক পর্যায়ে পৌছে দিয়েছেন যা শুধু বাংলাদেশে নয় আর্ন্তজাতিক পর্যায়ে প্রসংশিত হয়েছে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় ২০০১ সালে বিএনপি-জামাত সরকার নিছক দলীয় বিবেচনায়, প্রতিহিংসামূলকভাবে উক্ত কমিউনিটি ক্লিনিক প্রকল্প বাতিল করে জনস্বার্থ বিরোধী কাজ করে। আমরা অত্যন্ত আনন্দিত যে, বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহনের স্বল্পতম সময়ের মধ্যে ১৩৩৩৩টি কমিউনিটি ক্লিনিক প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং গ্রামের জনসাধারন’ তার সুবিধা ভোগ করছে।

তৃণমূল পর্যায়ের চিকিৎসকদের নিরলস পরিশ্রমের ফলে শিশু ও মাতৃমৃত্যু হার জাতিসংঘ ঘোষিত এমডিজি-৪ ও ৫ এর লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী হ্রাস করায় জাতিসংঘ পুরস্কার তুলে দেওয়ায়, বর্তমান সরকারের নেতৃত্বে সমগ্র চিকিৎসক সমাজ এবং গোটা জাতি এই অর্জনকে স্বাস্থ্য খাতের অন্যতম সাফল্য হিসেবে গৌরববোধ করছে।

বর্তমান সরকারের সাফল্যঃ

চিকিৎসকদের বিপুল সংখ্যাক পদ শূন্য থাকায় চিকিৎসাসেবা ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম হয়েছিল। তখন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি নির্দেশে অতি দ্রæততার সাথে শূন্যপদ সমূহ পুরনের জন্য এডহকসহ বিসিএস এর মাধ্যমে প্রায় ১৫০০০ সহকারী সার্জন নিয়োগ প্রদান করা হয়েছে, যাহা বাংলাদেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন। ইতিমধ্যে উক্ত চিকিৎসকগণ গ্রামগঞ্জে দায়িত্বরত আছেন। এছাড়া ১২০০০ নার্স নিয়োগ, নার্সদের ২য় শ্রেণীর মর্যাদা দান।

বর্তমান সরকারের আমলে ডিপিসি এবং এসএসবি’র মাধ্যমে মেডিক্যাল শিক্ষক ও স্বাস্থ্য প্রশাসনের পদসমূহে প্রায় ১০ হাজার পদে পদোন্নয়ন দেওয়া হয়েছে।

সকল উপজেলায় সরকারী মোবাইল ফোনের মাধ্যমে স্বাস্থ্য সেবা প্রদানের সুযোগ সুষ্টি করা হয়েছে।

সকল জেলা ও উপজেলা হাসপাতাল সমূহে ইন্টারনেট সংযোগ প্রদানের মাধ্যমে দ্রæততম সময়ের মধ্যে তথ্য আদান প্রদানের ব্যবস্থ্য করা হয়েছে। টেলিমেডিসিন সেন্টার চালু করা মাধ্যমে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে।

সকল সিভিল সার্জন ও সকল উপজেলার টঐঋচঙ দের জন্য নতুন গাড়ি ক্রয় করা হয়েছে ।

ইন্টানি ভাতা ৬৫০০ টাকা হতে ১৫০০০ টাকায় উন্নীত করা হয়েছে।

বিগত বিএনপি জামাত সরকারের সময় ব্যাপক দূনীর্তি ও অনিয়মের মাধ্যমে মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষাকে কলুষিত করা হয়েছিল, বর্তমান সরকার অত্যন্ত দক্ষতা ও নিরপেক্ষতার সাথে মেডিক্যাল ওভার সাইট কমিটির মাধ্যমে দক্ষতার সাথে পরিচালোনা করছে।

ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি নতুন সরকারী মেডিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠা ও শিক্ষা কার্যক্রম চালুকরা হয়েছে এবং ৩টি নতুন মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

বর্তমান সরকার পূর্বের চেয়ে স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে বাজেট বৃদ্ধি করেছেন তবে বিএমএ এর দাবী মূল বাজেটের ১০% স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ দেওয়া। কিন্তু এখনও তা বাস্তবায়িত হয়নি।

শেখ হাসিনা বার্ন ও প্লাষ্টিক সার্জারী হাসপাতাল কোরিয়ান সহায়তায় বঙ্গবন্ধু বিশ্ববিদ্যালয়ে সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল নির্মাণ শুরু। ঘবঁৎড়ংপরবহপব, ঘওঞঙজ, ঠওঈঠউ সোহরাওয়াদী হাসপাতাল ও শিশু হাসপাতালের নতুন ভবন নির্মাণ, দেশের সব হাসপাতালের শয্যা সংখ্যা বৃদ্ধি নতুন যন্ত্রপাতি ক্রয়ের মাধ্যমে চিকিৎসা সেবা আরও উন্নত করা হয়েছে।

সরকার বিদেশে ঔষধ রফতানীর মাধ্যমে সুনাম অর্জন করেছে।

রোহিঙ্গাদের সকল ধরনের চিকিৎসা প্রদান, আগামীতে বর্তমান তিনটি মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়সহ প্রত্যেক বিভাগে আগামীতে আরও পাঁচটি মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার, বর্তমান সরকারের স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে ব্যাপক সফলতা ও উন্নয়নের ধারাবাহিকতা।

১৩৫০০ টি কমিউনিটি ক্লিনিক হেলথ কেয়ার প্রো ভাইডার পদ সৃষ্টি করা এবং তাদের নিয়োগ প্রদান করা হয়েছে।

কিছু প্রস্তাবনাঃ

প্রশাসনিক পদে পদোন্নতির সুযোগ সম্প্রসারিত করা উচিত- নতুন নতুন রোগ বালাই এর আবির্ভাব এবং নতুন নতুন স্বাস্থ্য সমস্যা জনস্বাস্থ্যকে হুমকির মুখে ফেলেছে। জনজীবন এবং সুস্বাস্থ্য রক্ষার জন্য অন্যান্য দেশের ন্যায় প্রধান স্বাস্থ্য সমস্যাভিত্তিক বিভিন্ন বিভাগ চালু করা জরুরী। এর ফলে জনস্বাস্থ্য সংরক্ষণসহ চিকিৎসকদের পদোন্নতির সুয়োগ সৃষ্টির লক্ষ্যে ডেপুটি সিভিল সার্জন, এডিশনাল সিভিল সার্জন, হসপিটাল সুপারিনটেনডেন্ট, সহকারী পরিচালক, উপ-পরিচালক যুগ্ন পরিচালক, অতিরিক্ত পরিচালক ও পরিচালক পদের সংখ্যা বৃদ্ধি ও নতুন পদ সৃষ্টি করা অত্যাবশ্যক। বর্তমান প্রেক্ষাপটে এবং অনাগত ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে স্বাস্থ্য কেডারভূক্ত চিকিৎসকের সংখ্যা ৩০,০০০ হাজার উন্নীত করা উচিত ।

স্বাস্থ্য ক্যাডারে অন্তত ১০টি পদ ১ম গ্রেডে উন্নীত করার উচিত- স্বাস্থ্য ক্যাডার প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তাদের সর্ববৃহৎ ক্যাডার সার্ভিস হওয়া সত্বেও মহাপরিচালক স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পদমর্যাদা জাতীয় বেতন কাঠামোতে ২য় গ্রেডে নির্ধারিত অথচ সকল সচিব ১নং গ্রেডভুক্ত। আন্তক্যাডার বৈষম্য নিরসনে স্বাস্থ্য ক্যাডারে অন্তত ১০টি পদ ১ম গ্রেডে উন্নীত করা উচিত। প্রশাসন ক্যাডারে ১০বছর পূর্তিতে ৫ম গ্রেডে বেতন উন্নীত করার বিধানটি স্বাস্থ্য ক্যাডারে চালু করা এবং সেই সাথে অন্যান্য ক্যাডার সার্ভিসের সাথে স্বাস্থ্য ক্যাডারের বেতন বৈষম্য দূরীকরণের মাধ্যমে অনেক হতাশা দূর করা সম্ভব। মেডিক্যাল শিক্ষকদের পূর্বের ন্যায় ১নং গ্রেডে পদোন্নতি পাওয়ার ব্যবস্থা করা উচিত।

পার্শ্ব প্রবেশ রহিত করা- স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের যে সকল পদে পার্শ্ব প্রবেশ বিদ্যামান আছে সে সকল পদসমূহ যথাযথ পদ মর্যাদার চিকিৎসক দ্বারা পূরণ করার দাবী বিএমএ’র দীর্ঘ দিনের। এর ফলে চিকিৎসকদের হতাশা দুর হবে এবং পদোন্নতি প্রক্রিয়া সম্প্রসারিত হবে।

চিকিৎসক সন্তানদের জন্য একটি স্বতন্ত্র পূর্ণঙ্গ মেডিক্যাল কলেজ- চিবিকৎসক সন্তানদের অধ্যায়নের জন্য একটি স্বতন্ত্র পূর্ণাঙ্গ মেডিক্যাল কলেজ সরকারী উদ্যোগে প্রতিষ্ঠা করলে ভালো হয়। আর্মড ফোর্স মেডিক্যাল কলেজ এর একটি উৎকৃষ্ট উদাহরন।

এডহক নিয়োগকৃত চিকিৎসককে ক্যাডারভুক্তকরণ- এডহক ভিত্তিতে নিয়োগ প্রাপ্ত চিকিৎসকদের ক্যাডারভ’ক্তি তরান্বিত করা। ব্যাসিক মেডিকেল শিক্ষকদের উচিত

চাকুরীর বয়স সীমা ৬৫ বছরে উন্নীত করা উচিত- ব্যাসিক মেডিকেল শিক্ষকদের উচিত যে সমস্ত মেডিকেল কলেজে শিক্ষক স্বল্পতা আছে তা বন্ধ করে দেওয়া উচিৎ।

এক সময় বিএমএ ভবনকে ২২ তলায় উন্নীত করা প্রস্তাব ছিলো- প্রেসক্লাবের ন্যায় বিএমএ ভবনকে ২২তলায় উন্নীত করার জন্য আর্থিক অনুদান প্রদানের ব্যবস্থা করা। চিকৎসক শিক্ষকদের প্রশিক্ষন এর ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে সকল কর্মকর্তার পদ চিকিৎসকদের দ্বারা পুরণ- স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সকল কর্মকর্তা যেমন উ/ঝ ঃড় ঝবপ পদ চিকিৎসকদের দ্বারা পূরণ করে স্বাস্থ্য খাতে কাঙ্খিত অগ্রগতি আনয়ন সম্ভব হবে। এ জন্য পয়োজন হলে ভিন্ন আইন ও বিধি প্রণয়ন করা যায়।

পূর্বানুমতি ব্যতিরেকে চিকৎসক গ্রেফতার না করা- ভারত যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র এর সুষ্ঠভাবে দ্বায়িত্ব পালনে নিরাপত্তার জন্য পূর্বানুমতি ব্যতীত কোন চিকিৎসককে গ্রেফতার বা ফৌজদারী মামলা দ্বারা হয়রানী না করার বিধান রেখে নতুন চিকিৎসক সুরক্ষা আইনের সংযোজন হওয়া উচিৎ

স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে বাজেট বৃদ্ধিঃ ভবিষ্যতে গ্রামীণ স্বাস্থ্য সেবার মান আরো উন্নত করার জন্য স্বাস্থ্য খাতে বাজেট আগামী বছরে আরো বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।

২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজি বাস্তবায়নের কর্মপরিকল্পনা নির্মানে এখন থেকেই সকল মহলকে উদ্যেগী হতে হবে।

এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা (৩) সকল বয়সের সকল মানুষের সুস্থ জীবন নিশ্চিত করা। মাতৃমৃত্যুর হার ও শিশু মৃত্যুর হার কমানো মেলেরিয়া যক্ষা এডইস সহ সকল সংক্রামক ও অসংক্রামক রোগ নিরোধ করার জন্য এখনই ব্যবস্থা নিতে হবে।

ভবিষ্যতে সুস্থ নাগরিকগনই ২০৪১ সালের উন্নত দেশ গড়তে সহায়তা করবে যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেন্ত্রী শেখ হাসিনার রুপকল্প ২০৪১। বাংলাদেশ মেডিকেল এসোসিয়েশনের সদস্য সকল চিকিৎসক সব সময় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সাথে আছে ও থাকবে ইনশাআল্লাহ।

লেখক: অধ্যাপক ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদ, সাবেক প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় ও সাবেক মহাসচিব, বাংলাদেশ মেডিকেল এসোসিয়েশন

বর্তমান সরকারের স্বাস্থ্যব্যবস্থা-একটি পর্যালোচনা

 অধ্যাপক ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদ|সাবেক প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় 
০২ অক্টোবর ২০১৮, ০৭:৪৪ পিএম  |  অনলাইন সংস্করণ
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৩ সেপ্টেম্বর সেন্টার অব এক্সিলেন্স প্রকল্পের বাস্তবায়িত কার্যক্রমের শুভ উদ্বোধন করেন। ছবি: যুগান্তর
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৩ সেপ্টেম্বর সেন্টার অব এক্সিলেন্স প্রকল্পের বাস্তবায়িত কার্যক্রমের শুভ উদ্বোধন করেন। ছবি: যুগান্তর

২০১৮ সালের ৭ অক্টোবর  মাননীয় প্রধানমন্ত্রী চিকিৎসক বান্ধব জননেন্ত্রী শেখ হাসিনা হাজার হাজার চিকিৎসকের সামনে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়ন সর্ম্পকে এবং বাংলাদেশ মেডিক্যাল এসোসিয়েশন এর সকল চিকিৎসকদের অবদান সর্ম্পকে মূল্যবান বক্তব্য রাখবেন বলে আশা করছি।  

২০১১ সালের ১৯তম বাংলাদেশ মেডিক্যাল এসোসিয়েশন এর সম্মেলনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ১২ হাজার চিকিৎসকের সামনে যে গুরুত্বপর্ণ ভাষণ প্রদান করেছিলেন তা সকল চিকিৎসককে উৎসাহিত ও অনুপ্রানিত করেছিল। প্রায় ৮ বছর পর আবার তিনি বিএমএ আয়োজিত চিকিৎসক সমাবেশে উপস্থিত থেকে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা সাফল্য ও ভবিষৎ দিক নির্দেশনা প্রদানের জন্য উপস্থিত হয়ে আমাদের সকল চিকিৎসকদের কৃতজ্ঞতা পাশে আবদ্ধ করেছে। মার্দার অব হিউম্যানিটি মাননীয় প্রধান মন্ত্রী বিশ্বনেন্ত্রী সারা বিশ্বের উন্নয়নের রোল মডেল প্রতিষ্ঠায় স্বিকৃতি প্রাপ্ত, চিকিৎসা সেবার উন্নয়নে ব্যাপক প্রসংশা অর্জন করেছেন।

স্বাধীনতা উত্তরকালে বঙ্গবন্ধুর সরকারই প্রথম এ দেশের পল্লী অঞ্চলের সাধারণ মেহনতি মানুষের স্বাস্থ্য সেবার কথা বিবেচনা করে, চিকিৎসা সেবাকে থানা পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যে থানা স্বাস্থ্যকমপ্লেক্স চালু  করেন, চিকিৎসকদের সরকারী চাকুরীতে সম্মান ও মর্যাদার কথা বিবেচনা করে চিকিৎসকদের পদমর্যাদা দ্বিতীয় শ্রেনী থেকে প্রথম শ্রেনীতে উন্নীত করেছিলেন যা দেশের চিকিৎসক সমাজ চিরদিন শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে। তার’ই ধারাবাহিকতায় বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা হিসেবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী প্রতি ৬০০০ জনগোষ্ঠির জন্য একটি কমিউনিটি ক্লিনিক ব্যবস্থা প্রবর্তন করে স্বাস্থ্য সেবাকে আরো প্রান্তিক পর্যায়ে পৌছে দিয়েছেন যা শুধু বাংলাদেশে নয় আর্ন্তজাতিক পর্যায়ে প্রসংশিত হয়েছে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় ২০০১ সালে বিএনপি-জামাত সরকার নিছক দলীয় বিবেচনায়, প্রতিহিংসামূলকভাবে উক্ত কমিউনিটি ক্লিনিক প্রকল্প বাতিল করে জনস্বার্থ বিরোধী কাজ করে। আমরা অত্যন্ত আনন্দিত যে, বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহনের স্বল্পতম সময়ের মধ্যে ১৩৩৩৩টি কমিউনিটি ক্লিনিক প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং গ্রামের জনসাধারন’ তার সুবিধা ভোগ করছে।

তৃণমূল পর্যায়ের চিকিৎসকদের নিরলস পরিশ্রমের ফলে শিশু ও মাতৃমৃত্যু হার জাতিসংঘ ঘোষিত এমডিজি-৪ ও ৫ এর লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী  হ্রাস করায় জাতিসংঘ পুরস্কার তুলে দেওয়ায়, বর্তমান সরকারের নেতৃত্বে সমগ্র চিকিৎসক সমাজ এবং গোটা জাতি এই অর্জনকে স্বাস্থ্য খাতের অন্যতম সাফল্য হিসেবে গৌরববোধ করছে।

বর্তমান সরকারের সাফল্যঃ

চিকিৎসকদের বিপুল সংখ্যাক পদ শূন্য থাকায় চিকিৎসাসেবা ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম হয়েছিল। তখন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি নির্দেশে অতি দ্রæততার সাথে শূন্যপদ সমূহ পুরনের জন্য এডহকসহ বিসিএস এর মাধ্যমে প্রায় ১৫০০০ সহকারী সার্জন নিয়োগ প্রদান করা হয়েছে, যাহা বাংলাদেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন। ইতিমধ্যে উক্ত চিকিৎসকগণ গ্রামগঞ্জে দায়িত্বরত আছেন। এছাড়া ১২০০০ নার্স নিয়োগ, নার্সদের ২য় শ্রেণীর মর্যাদা দান।

বর্তমান সরকারের আমলে ডিপিসি এবং এসএসবি’র মাধ্যমে মেডিক্যাল শিক্ষক ও স্বাস্থ্য প্রশাসনের পদসমূহে প্রায় ১০ হাজার পদে পদোন্নয়ন দেওয়া হয়েছে।

সকল উপজেলায় সরকারী মোবাইল ফোনের মাধ্যমে স্বাস্থ্য সেবা প্রদানের সুযোগ সুষ্টি করা হয়েছে।

সকল জেলা ও উপজেলা হাসপাতাল সমূহে ইন্টারনেট সংযোগ প্রদানের মাধ্যমে দ্রæততম সময়ের মধ্যে তথ্য আদান প্রদানের ব্যবস্থ্য করা হয়েছে। টেলিমেডিসিন সেন্টার চালু করা মাধ্যমে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে।

সকল সিভিল সার্জন ও সকল উপজেলার টঐঋচঙ দের জন্য নতুন গাড়ি ক্রয় করা হয়েছে ।

ইন্টানি ভাতা ৬৫০০ টাকা হতে ১৫০০০ টাকায় উন্নীত করা হয়েছে।

বিগত বিএনপি জামাত সরকারের সময় ব্যাপক দূনীর্তি ও অনিয়মের মাধ্যমে মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষাকে কলুষিত করা হয়েছিল, বর্তমান সরকার অত্যন্ত দক্ষতা ও নিরপেক্ষতার সাথে মেডিক্যাল ওভার সাইট কমিটির মাধ্যমে দক্ষতার সাথে পরিচালোনা করছে।

ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি নতুন সরকারী মেডিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠা ও শিক্ষা কার্যক্রম চালুকরা হয়েছে এবং ৩টি নতুন মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

বর্তমান সরকার পূর্বের চেয়ে স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে বাজেট বৃদ্ধি করেছেন তবে বিএমএ এর দাবী মূল বাজেটের ১০% স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ দেওয়া। কিন্তু এখনও তা বাস্তবায়িত হয়নি।

শেখ হাসিনা বার্ন ও প্লাষ্টিক সার্জারী হাসপাতাল কোরিয়ান সহায়তায় বঙ্গবন্ধু বিশ্ববিদ্যালয়ে সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল নির্মাণ শুরু। ঘবঁৎড়ংপরবহপব, ঘওঞঙজ, ঠওঈঠউ সোহরাওয়াদী হাসপাতাল ও শিশু হাসপাতালের নতুন ভবন নির্মাণ, দেশের সব হাসপাতালের  শয্যা সংখ্যা বৃদ্ধি নতুন যন্ত্রপাতি  ক্রয়ের মাধ্যমে চিকিৎসা সেবা আরও উন্নত করা হয়েছে।

 সরকার বিদেশে ঔষধ রফতানীর মাধ্যমে সুনাম অর্জন করেছে।

রোহিঙ্গাদের সকল ধরনের চিকিৎসা প্রদান, আগামীতে বর্তমান তিনটি মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়সহ প্রত্যেক বিভাগে  আগামীতে আরও পাঁচটি মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার, বর্তমান সরকারের স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে ব্যাপক সফলতা ও উন্নয়নের ধারাবাহিকতা।

১৩৫০০ টি কমিউনিটি ক্লিনিক হেলথ কেয়ার প্রো ভাইডার পদ সৃষ্টি করা এবং তাদের নিয়োগ প্রদান করা হয়েছে।

কিছু প্রস্তাবনাঃ

প্রশাসনিক পদে পদোন্নতির সুযোগ সম্প্রসারিত করা উচিত- নতুন নতুন রোগ বালাই এর আবির্ভাব এবং নতুন নতুন স্বাস্থ্য সমস্যা জনস্বাস্থ্যকে হুমকির মুখে ফেলেছে। জনজীবন এবং সুস্বাস্থ্য রক্ষার জন্য অন্যান্য দেশের ন্যায় প্রধান স্বাস্থ্য সমস্যাভিত্তিক বিভিন্ন বিভাগ চালু করা জরুরী। এর ফলে জনস্বাস্থ্য সংরক্ষণসহ চিকিৎসকদের পদোন্নতির সুয়োগ সৃষ্টির লক্ষ্যে ডেপুটি সিভিল সার্জন, এডিশনাল সিভিল সার্জন, হসপিটাল সুপারিনটেনডেন্ট, সহকারী পরিচালক, উপ-পরিচালক যুগ্ন পরিচালক, অতিরিক্ত পরিচালক ও পরিচালক পদের সংখ্যা বৃদ্ধি ও নতুন পদ সৃষ্টি করা অত্যাবশ্যক। বর্তমান প্রেক্ষাপটে এবং অনাগত ভবিষ্যতের  কথা বিবেচনা করে স্বাস্থ্য কেডারভূক্ত চিকিৎসকের সংখ্যা ৩০,০০০ হাজার উন্নীত করা উচিত ।

স্বাস্থ্য ক্যাডারে অন্তত ১০টি পদ ১ম গ্রেডে উন্নীত করার উচিত- স্বাস্থ্য ক্যাডার প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তাদের সর্ববৃহৎ ক্যাডার সার্ভিস হওয়া সত্বেও মহাপরিচালক স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পদমর্যাদা জাতীয় বেতন কাঠামোতে ২য় গ্রেডে নির্ধারিত অথচ সকল সচিব ১নং গ্রেডভুক্ত। আন্তক্যাডার বৈষম্য নিরসনে স্বাস্থ্য ক্যাডারে অন্তত ১০টি পদ ১ম গ্রেডে উন্নীত করা উচিত। প্রশাসন ক্যাডারে ১০বছর পূর্তিতে ৫ম গ্রেডে বেতন উন্নীত করার বিধানটি স্বাস্থ্য ক্যাডারে চালু করা এবং সেই সাথে অন্যান্য ক্যাডার সার্ভিসের সাথে স্বাস্থ্য ক্যাডারের বেতন বৈষম্য দূরীকরণের মাধ্যমে অনেক হতাশা দূর করা সম্ভব। মেডিক্যাল শিক্ষকদের পূর্বের ন্যায় ১নং গ্রেডে পদোন্নতি পাওয়ার ব্যবস্থা করা উচিত।

পার্শ্ব প্রবেশ রহিত করা- স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের যে সকল পদে পার্শ্ব প্রবেশ বিদ্যামান আছে সে সকল পদসমূহ যথাযথ পদ মর্যাদার চিকিৎসক দ্বারা পূরণ করার দাবী বিএমএ’র দীর্ঘ দিনের। এর ফলে চিকিৎসকদের হতাশা দুর হবে এবং পদোন্নতি প্রক্রিয়া সম্প্রসারিত হবে।

চিকিৎসক সন্তানদের জন্য একটি স্বতন্ত্র পূর্ণঙ্গ মেডিক্যাল কলেজ- চিবিকৎসক সন্তানদের অধ্যায়নের জন্য একটি স্বতন্ত্র পূর্ণাঙ্গ মেডিক্যাল কলেজ সরকারী উদ্যোগে প্রতিষ্ঠা করলে ভালো হয়। আর্মড ফোর্স মেডিক্যাল কলেজ এর একটি উৎকৃষ্ট উদাহরন।

এডহক নিয়োগকৃত চিকিৎসককে ক্যাডারভুক্তকরণ- এডহক ভিত্তিতে নিয়োগ প্রাপ্ত চিকিৎসকদের ক্যাডারভ’ক্তি তরান্বিত করা। ব্যাসিক মেডিকেল শিক্ষকদের উচিত

চাকুরীর বয়স সীমা ৬৫ বছরে উন্নীত করা উচিত- ব্যাসিক মেডিকেল শিক্ষকদের উচিত যে সমস্ত মেডিকেল কলেজে শিক্ষক স্বল্পতা আছে তা বন্ধ করে দেওয়া উচিৎ।

এক সময় বিএমএ ভবনকে ২২ তলায় উন্নীত করা প্রস্তাব ছিলো- প্রেসক্লাবের ন্যায় বিএমএ ভবনকে ২২তলায় উন্নীত করার জন্য আর্থিক অনুদান প্রদানের ব্যবস্থা করা। চিকৎসক শিক্ষকদের প্রশিক্ষন এর ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে সকল কর্মকর্তার পদ চিকিৎসকদের দ্বারা পুরণ- স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সকল কর্মকর্তা   যেমন উ/ঝ ঃড় ঝবপ পদ চিকিৎসকদের দ্বারা পূরণ করে স্বাস্থ্য খাতে কাঙ্খিত অগ্রগতি আনয়ন সম্ভব হবে। এ জন্য পয়োজন হলে ভিন্ন আইন ও বিধি প্রণয়ন করা যায়।

পূর্বানুমতি ব্যতিরেকে চিকৎসক গ্রেফতার না করা- ভারত যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র এর সুষ্ঠভাবে দ্বায়িত্ব পালনে নিরাপত্তার জন্য পূর্বানুমতি ব্যতীত কোন চিকিৎসককে গ্রেফতার বা ফৌজদারী মামলা দ্বারা হয়রানী না করার বিধান রেখে নতুন চিকিৎসক সুরক্ষা আইনের সংযোজন হওয়া উচিৎ

স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে বাজেট বৃদ্ধিঃ ভবিষ্যতে গ্রামীণ স্বাস্থ্য সেবার মান আরো উন্নত করার জন্য স্বাস্থ্য খাতে বাজেট আগামী বছরে আরো বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।

২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজি বাস্তবায়নের কর্মপরিকল্পনা  নির্মানে এখন থেকেই সকল মহলকে উদ্যেগী হতে হবে।

এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা (৩)  সকল বয়সের সকল মানুষের সুস্থ জীবন নিশ্চিত করা। মাতৃমৃত্যুর হার ও শিশু মৃত্যুর হার কমানো মেলেরিয়া যক্ষা এডইস সহ সকল সংক্রামক ও অসংক্রামক রোগ নিরোধ করার জন্য এখনই ব্যবস্থা নিতে হবে।

ভবিষ্যতে সুস্থ নাগরিকগনই ২০৪১ সালের উন্নত দেশ গড়তে সহায়তা করবে যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেন্ত্রী শেখ হাসিনার রুপকল্প ২০৪১। বাংলাদেশ মেডিকেল এসোসিয়েশনের সদস্য সকল চিকিৎসক সব সময় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সাথে আছে ও থাকবে ইনশাআল্লাহ।

লেখক: অধ্যাপক ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদ, সাবেক প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় ও সাবেক মহাসচিব,  বাংলাদেশ মেডিকেল এসোসিয়েশন

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন