হাসিনা ইস্যুতে ঢাকার পাশে ওয়াশিংটন: কী করবে দিল্লি?
Advertisement
আহসান হাবিব বরুন
প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:১৯ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঢাকার ক্রমবর্ধমান যোগাযোগ—এই তিনটি বিষয়কে ঘিরে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নতুন করে আলোচনার জন্ম হয়েছে।
দীর্ঘ বিরতির পর আবারও মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব নিয়ে ফিরে এসেছে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ। এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, ভূ-রাজনীতির আন্তর্জাতিক দাবার বোর্ডে বাংলাদেশ এখন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে ওয়াশিংটনের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক তৎপরতা দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে এক নতুন সমীকরণের বার্তা দিচ্ছে। শেখ হাসিনা ইস্যুতে ওয়াশিংটন যে অবস্থান স্পষ্ট করেছে, তা মূলত ঢাকার বর্তমান রাজনৈতিক ও আইনি দৃষ্টিভঙ্গিরই পরোক্ষ সমর্থন।
মার্কিন প্রশাসনের এই বার্তা কেবল ঢাকার জন্যই স্বস্তিদায়ক নয়, বরং এটি দিল্লির নীতি-নির্ধারকদের সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে এক নতুন কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ বলেই মনে হচ্ছে।
সম্প্রতি নিউইয়র্ক ফরেন প্রেস সেন্টারে দক্ষিণ এশিয়া নিয়ে আয়োজিত মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক উচ্চপর্যায়ের অন-ব্যাকগ্রাউন্ড ব্রিফিংয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান পরিষ্কার করা হয়।
শেখ হাসিনার বিচার, মৃত্যুদণ্ডের সম্ভাবনা কিংবা রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় তাঁর বা আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ পুনর্বাসন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো নির্দিষ্ট কিংবা অনড় অবস্থান নেই—এটি এখন অত্যন্ত স্পষ্ট। যুক্তরাষ্ট্রের বক্তব্য সোজা, শেখ হাসিনার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার একচ্ছত্র অধিকার কেবল বাংলাদেশের জনগণের এবং তাদের আইনি প্রক্রিয়ার। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র কোনো পক্ষ নিতে রাজি নয়।
ওয়াশিংটনের সুস্পষ্ট বার্তা—যেখানে বলা হয়েছে তারা কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা দলকে কেন্দ্র করে নীতি নির্ধারণ করে না, বরং নির্বাচিত ও জনগণের প্রতিনিধিত্বশীল সরকারের সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়—তা আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনার রাজনীতির জন্য এক বিশাল ধাক্কা।
ক’দিন আগেও একশ্রেণির রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করতেন, ট্রাম্প প্রশাসনের পুনরাগমন হয়তো শেখ হাসিনার জন্য এক ধরনের আশার আলো বা রাজনৈতিক ‘লাইফলাইন’ নিয়ে আসবে। কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্পর্কের কঠোর বাস্তবতা ফের প্রমাণ করল—কূটনীতি চলে জাতীয় স্বার্থ ও ভূ-রাজনৈতিক প্রয়োজনের ওপর ভিত্তি করে, কোনো ব্যক্তিস্বার্থের ওপর নির্ভর করে নয়।
মার্কিন জ্যেষ্ঠ পররাষ্ট্র কর্মকর্তারা খোলাখুলি স্বীকার করেছেন যে, শেখ হাসিনার অবস্থান ও তার আইনি বিচারের বিষয়টি বর্তমান সময়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিরোধের কারণ বা পয়েন্ট অব ফ্রিকশন হয়ে উঠেছে। ওয়াশিংটন প্রত্যাশা করছে, দুই দেশ নিজেদের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমেই এই টানাপোড়েনের এক ভারসাম্যপূর্ণ সমাধান খুঁজে নেবে।
এখানে আসল প্রশ্ন হচ্ছে, দিল্লি এখন কী করবে? ভারতের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি এতকাল ছিল একমুখী বন্ধুত্বের ওপর প্রতিষ্ঠিত, যেখানে শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করেই বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের সমস্ত সমীকরণ সাজানো হতো।
কিন্তু ২৪-পরবর্তী পরিবর্তিত বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের পতন এবং ক্ষমতার রাজনৈতিক পুনর্গঠন দিল্লির সেই ঐতিহ্যগত নীতিকে চরম চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে। ভারত যদি শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিক আশ্রয় দিয়ে ঢাকার সঙ্গে বৈরী সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়, তবে তা দক্ষিণ এশিয়ায় দিল্লির নিজস্ব প্রভাবকে আরও সংকুচিত করবে।
অন্যদিকে, ওয়াশিংটন স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে তারা বাংলাদেশকে চীন কিংবা ভারতের মধ্যে যেকোনো একটি পক্ষ বেছে নিতে বাধ্য করতে চায় না। বরং স্পর্শকাতর খাত যেমন অবকাঠামো, তথ্যপ্রযুক্তি কিংবা টেলিযোগাযোগে ভারতের পাশাপাশি মার্কিন বিকল্প তৈরির সুযোগ রেখে ঢাকার সার্বিক সার্বভৌমত্ব সুরক্ষায় সহায়তা করতে চায়। এই জায়গায় ভারতের কৌশলগত পুনর্বিন্যাস বা কোর্স অব অ্যাকশন পরিবর্তন করা ছাড়া আর কোনো দ্বিতীয় পথ খোলা নেই।
দিল্লিকে এখন বুঝতে হবে—ব্যক্তি হাসিনার চেয়ে ১৮ কোটি মানুষের বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও বন্ধুত্ব ভারতের নিজের জাতীয় নিরাপত্তার জন্যই বেশি জরুরি।
এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের যে স্পষ্ট বার্তা উঠে এসেছে, তা আওয়ামী লীগের রাজনীতির ভবিষ্যৎকে এক ঘোর অন্ধকার ও অনিশ্চয়তার মুখে ফেলে দিয়েছে। এর আগেও আমি একাধিক বিশ্লেষণে ও কলামে এই নির্মম বাস্তবতার কথা তুলে ধরেছিলাম যে, শেখ হাসিনার মূলধারায় রাজনীতিতে ফেরার বা পুনর্বাসিত হওয়ার ন্যূনতম কোনো রাজনৈতিক ও নীতিগত সম্ভাবনা আর অবশিষ্ট নেই।
আওয়ামী লীগকে যদি কখনো ভবিষ্যতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ময়দানে পুনর্জন্ম নিতে হয় কিংবা টিকে থাকতে হয়, তবে তাদের সামনে প্রথম ও প্রধান শর্ত হলো জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত গণহত্যার জন্য প্রকাশ্যে জাতির কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করা।
এর পাশাপাশি স্বৈরাচারী ও একক ব্যক্তিকেন্দ্রিক নেতৃত্ব বর্জন করে দলের অভ্যন্তরে এক আমূল আত্মশুদ্ধি চালানো এবং পরিচ্ছন্ন, গণতান্ত্রিক নেতৃত্বের হাতে দলের দায়ভার হস্তান্তর করার কোনো বিকল্প নেই। এর বাইরে কোনো শর্টকাট বা বিদেশি শক্তির ওপর ভর করে ক্ষমতায় ফেরার অলৌকিক চিন্তা যে কতটা অবাস্তব, ওয়াশিংটনের অবস্থান তা আবারও প্রমাণ করে দিল। স্বৈরাচারী শাসনের কালো ছায়াকে ধুয়ে মুছে না ফেললে আওয়ামী লীগের সামনে রাজনীতির কোনো পথই খোলা থাকবে না।
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ক্ষমতার রূপান্তর এবং পরিবর্তিত সামাজিক কাঠামোর পর বিশ্ব রাজনীতি এখন একটি স্থিতিশীল, সুশাসিত ও প্রতিনিধিত্বশীল সরকার দেখতে চায়। সেই ধারাবাহিকতায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ইতিবাচক মনোযোগ এখন বিএনপি ও দক্ষিণ এশিয়ার গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার দিকে।
স্মরণ করা যেতে পারে, কিছুদিন আগেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে একটি বিশেষ চিঠি পাঠান। সেই চিঠির মূল সুর ছিল স্পষ্ট—আন্তর্জাতিক বিশ্ব আশা করে, তারেক রহমানের রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা ও বলিষ্ঠ নেতৃত্বে বাংলাদেশ এক নতুন ও সমৃদ্ধশালী গণতান্ত্রিক যুগে প্রবেশ করবে।
বিশ্ব রাজনৈতিক মহল এখন এটি ভালোভাবেই উপলব্ধি করছে যে, পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দেশের সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক শক্তির ধারক হিসেবে জনাব তারেক রহমান ও তার নেতৃত্বই একটি স্থিতিশীল ও সুসংহত বাংলাদেশ গঠন করতে সক্ষম। বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে এই গ্রহণযোগ্যতা ঢাকার কূটনৈতিক শক্তিকে অনেকটাই বাড়িয়ে দিয়েছে।
পররাষ্ট্র দপ্তরের ব্রিফিংয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি ছিল বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বর্তমান ইতিবাচক গতিপথ। যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক ব্যুরোর ডেপুটি অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি বেথান মরিসন সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তারা বর্তমানে একটি অত্যন্ত ভালো অবস্থানে রয়েছেন।
এই সুসম্পর্কের প্রতিফলন কেবল কথায় নয়, কাজের ক্ষেত্রেও দৃশ্যমান হচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাম্প্রতিক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক দুই দেশের সম্পর্ককে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
এর পাশাপাশি দুই দেশের বাণিজ্য বৃদ্ধি, বিশেষ করে বোয়িং ক্রয়ের মতো আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বৃহৎ বাণিজ্য চুক্তি দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক ভিত্তি বহুগুণ শক্তিশালী করেছে, যা খোদ ট্রাম্প তার নিজস্ব ট্রুথ সোশ্যাল অ্যাকাউন্টে উল্লেখ করে ইতিবাচক মন্তব্য করেছেন। একই সঙ্গে দুই দেশের মধ্যে বেসামরিক পরমাণু প্রযুক্তি আদান-প্রদান এবং শান্তিপূর্ণ ব্যবহারে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের প্রস্তুতি দুই দেশের প্রযুক্তিগত ও কৌশলগত অংশীদারিত্বকে বিশ্বমঞ্চে এক নতুন মাত্রা দিচ্ছে।
পরিশেষে বলা যায়, ভূ-রাজনৈতিকভাবে বাংলাদেশ আজ আর কোনো নির্দিষ্ট ব্লকের অনুগত বা ভূ-পদ্ধতির চালিত কোনো দুর্বল দেশ নয়। ওয়াশিংটনের নীতি পরিষ্কার, তারা শেখ হাসিনাকে রক্ষা বা প্রত্যাখ্যানের কোনো ব্যক্তিগত দায় নেবে না, বরং ঢাকার নতুন সার্বভৌম যাত্রা এবং গণতান্ত্রিক ধারার সঙ্গেই হাঁটবে। এই বাস্তবতায় দিল্লির জন্য বার্তা অত্যন্ত স্পষ্ট—বাংলাদেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক ধরে রাখতে হলে ভারতকে হাসিনা-বান্ধব নীতির খোলস ছেড়ে বেরিয়ে বাংলাদেশ-বান্ধব নীতি গ্রহণ করতেই হবে।
অন্যদিকে, শেখ হাসিনাহীন আওয়ামী লীগকে যদি কোনো দিন বাংলাদেশের জনগণের মুখোমুখি হতে হয়, তবে জুলাই হত্যার রক্তের দাগ স্বীকার করে ক্ষমা চাওয়ার কোনো বিকল্প নেই।
ওয়াশিংটন ঢাকার পাশে দাঁড়িয়ে যে ইতিবাচক ইঙ্গিত দিয়েছে, তা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, সার্বভৌম নিরাপত্তা ও একটি নতুন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের শুভ সূচনার পথকেই প্রশস্ত করছে। এতে আমার ন্যূনতম সন্দেহ নেই। মহান আল্লাহ সুবহানাতায়ালা আমাদের সহায় হোন।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন
