Logo
Logo
×
   

শিক্ষাঙ্গন

এনকেএম স্কুল থেকে টিসি পাওয়া ৫৯ শিক্ষার্থীর মধ্যে জিপিএ-৫ পেয়েছে ২৯ জন

Icon

নরসিংদী প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২৬, ১০:৪২ পিএম

এনকেএম স্কুল থেকে টিসি পাওয়া ৫৯ শিক্ষার্থীর মধ্যে জিপিএ-৫ পেয়েছে ২৯ জন

নরসিংদীর নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমসের শিক্ষার্থীদের উচ্ছ্বাস। ছবি: যুগান্তর

নরসিংদীর নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমসের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে শতভাগ জিপিএ-৫ পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটির পরীক্ষার্থীরা। ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ৩৮২ শিক্ষার্থীর সবাই জিপিএ-৫ অর্জন করেছে। তবে এই সাফল্যের পাশাপাশি শিক্ষার্থী ছাঁটাইয়ের অভিযোগ ঘিরে প্রশ্ন উঠেছে প্রতিষ্ঠানটির ফলাফল ব্যবস্থাপনা নিয়ে।

প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে নবম শ্রেণিতে নিবন্ধিত শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ৬০১ জন। কিন্তু দুই বছর পর ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয় ৩৮২ জন। অর্থাৎ নবম শ্রেণিতে নিবন্ধনের পর থেকে এসএসসি পরীক্ষা পর্যন্ত ২১৯ শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পায়নি।

ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের অভিযোগ, টেস্ট পরীক্ষায় অকৃতকার্য দেখিয়ে অনেক শিক্ষার্থীকে ফরম পূরণের সুযোগ দেওয়া হয়নি। তাদের দাবি, প্রতিষ্ঠানের শতভাগ জিপিএ-৫-এর ফলাফল ধরে রাখতেই টেস্ট পরীক্ষাকে শিক্ষার্থী বাছাইয়ের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, বাদ পড়া শিক্ষার্থীদের অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়ে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ নিতে হয়েছে। এক্ষেত্রে কয়েকজন শিক্ষার্থীর কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার অভিযোগও করেছেন অভিভাবকরা।

সরেজমিনে ঘুরে জানা গেছে, টেস্টে বাদ পড়া শিক্ষার্থীরা নরসিংদীর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা দিয়েছে। নরসিংদী সানবীন স্কুলে ভর্তি হয়ে এসএসসি দেওয়া ৫০ শিক্ষার্থীর মধ্যে ২৫ জনই পেয়েছে জিপিএ-৫। ঘোড়াদিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে পরীক্ষা দেওয়া ৫ জনের মধ্যে ৩ জন এবং নরসিংদী মডেল স্কুলের ৪ জনের মধ্যে ১ জনসহ বেশ কয়েকটি স্কুলের শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে ভালো ফলাফল করেছে।

অভিযোগের বিষয়ে পরিচয় গোপন করে এক অভিভাবক বলেন, আমার ছেলে নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমস থেকে পঞ্চম শ্রেণি থেকে পাঁচ বছর পড়াশোনা করেছে। কিন্তু এসএসসি পরীক্ষার আগে টেস্ট পরীক্ষায় গিয়ে অপশনাল বিষয় বায়োলজিতে কম নম্বর পেয়েছে। এরপর তারা জোরপূর্বক টিসি দিয়েছে। নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল থেকে টিসি দিয়ে নরসিংদী সানবীন স্কুলে যেতে বলেছে। তারা ভর্তির সময় ২০ হাজার টাকা নিয়েছে। আমার ছেলে জিপিএ-৫ পেয়েছে। হ্যাঁ, এটা তো অন্যায়। টেস্ট পরীক্ষার পর দুই মাস পর এসএসসি পরীক্ষা, তাকে যদি বের করে দেওয়া হয়, তখন তার মানসিকতা ঠিক থাকে না। খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। তারা শুধু জিপিএ-৫ খুঁজবে, সবাই কি জিপিএ-৫ পাবে? এটা কোনো কথা হলো?

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী বলেন, আমি ষষ্ঠ শ্রেণিতে লটারির মাধ্যমে এনকেএমে ভর্তি হই। অষ্টম শ্রেণি থেকে তারা বের করে দেওয়া শুরু করে ধাপে ধাপে। তারা খুব কঠিন করে খাতা দেখে, আবার প্রশ্নও কঠিন করে। আমি এই স্কুলে না পড়ে অন্য স্কুলে গিয়ে জিপিএ-৫ পেয়েছি। তার মানে কি তখন আমি পড়িনি। এই যে শিক্ষার্থীদের বের করে দেওয়া হয়, এতে করে অনেক শিক্ষার্থী ঝরে পড়ে।

অন্যদিকে নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল থেকে টিসি পেয়ে সানবীন স্কুল থেকে পরীক্ষা দেওয়া এক শিক্ষার্থী জানান, এনকেএমে নিয়মকানুন অনেক কঠিন। আমি পাশ করতে পারিনি, তাই অন্য স্কুলে গিয়েছি। আমি প্রিটেস্টে এখান থেকে বের হয়েছিলাম। আমাকে কেউ জোর করেনি। আমি পাশ করতে পারিনি, আমার বেস্টটা এখানে দিতে পারিনি। তাই নরসিংদী সানবীন স্কুল থেকে পরীক্ষা দিই এবং জিপিএ-৫ পাই।

তিনি আরও বলেন, এনকেএম স্কুল জোর করে বের করার বিষয়টি মিথ্যা। জোর করে কোনো কিছু হয় না। আপনি পাশ মার্ক না তুলতে পারলে আপনাকে রাখবে না, এটা স্বাভাবিক।

এ ব্যাপারে নরসিংদী সানবীন স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা ও অধ্যক্ষ মোমতাজ উদ্দিন আহাম্মেদ বলেন, নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমস থেকে ৫০ জন ভর্তি হয়েছে। আমরা তাদের অঙ্গীকারনামা নিয়ে ভর্তি করি। তাদের মধ্যে ২৫ জন জিপিএ-৫ পেয়েছে।

শিক্ষাবিদদের মতে, টেস্ট পরীক্ষার মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত শিক্ষার্থীর দুর্বলতা চিহ্নিত করে তাকে চূড়ান্ত পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত করা। কোনো শিক্ষার্থীকে বাদ দেওয়ার মাধ্যম হিসেবে এটি ব্যবহার করা হলে শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

একদিকে ৩৮২ পরীক্ষার্থীর শতভাগ জিপিএ-৫, অন্যদিকে একই প্রতিষ্ঠানের নবম শ্রেণিতে নিবন্ধিত ৬০১ শিক্ষার্থীর মধ্যে ২১৯ জনের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিতে না পারা—এই দুই তথ্যই এখন সামনে এনেছে বড় প্রশ্ন।

এ ব্যাপারে নরসিংদীর নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমসের প্রধান শিক্ষক মো. ইমন হোসেন বলেছেন, টেস্ট পরীক্ষায় ভালো ফল না করা শিক্ষার্থীদের বাছাই করে ফরম পূরণের সুযোগ দেওয়া হয়েছে—এমন অভিযোগ সঠিক নয়। সরকারি নির্দেশনা ও বোর্ডের পরিপত্র অনুসরণ করেই টেস্ট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের ফরম পূরণের সুযোগ দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেছেন তিনি।

ইমন হোসেন বলেন, আমাদের বিরুদ্ধে বলা হচ্ছে, টেস্ট পরীক্ষায় এ প্লাস না পেলে শিক্ষার্থীদের ফরম পূরণ করতে দেওয়া হয় না। এটি সম্পূর্ণ ভুয়া ও মিথ্যা তথ্য। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, ৩৩ শতাংশ নম্বর পেলেই শিক্ষার্থীদের ফরম পূরণের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। কোনো শিক্ষার্থী বা অভিভাবক যদি প্রমাণ করতে পারেন যে ৩৩ শতাংশ পাওয়ার পরও তাকে ফরম পূরণ করতে দেওয়া হয়নি, তাহলে এ বিষয়ে যে শাস্তি হবে, আমরা তা মাথা পেতে নেব। 

এবারের টেস্ট পরীক্ষার তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, টেস্ট পরীক্ষায় আমাদের মোট ৪৮৩ জন শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছিল। এর মধ্যে ৩৮২ জন পাস করেছে এবং ১০১ জন অকৃতকার্য হয়েছে। যারা পাস করেছে, তাদের ফরম পূরণ করা হয়েছে। যারা অকৃতকার্য হয়েছে, তাদের ফরম পূরণ করা হয়নি। আমরা টেস্ট পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতেই ফরম পূরণ করেছি।

জেলা শিক্ষা অফিসার এ এস এম আব্দুল খালেক বলেন, যদি কোনো শিক্ষার্থী টেস্টে ফেল করে, তাহলে তো সে পরীক্ষা দিতে পারবে না। তখন তাকে অন্য জায়গায় টিসির মাধ্যমে পরীক্ষা দিতে হবে। টিসির মাধ্যমে বের করে দেওয়া ব্যাপারটা এমন না। তাও যদি কর্তৃপক্ষ কোনো ভুল করে থাকে, তাহলে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তা তদন্ত করবেন। কিন্তু তাদের এই ফলাফলে আমরা তাদের উৎসাহিত করি।

প্রতিষ্ঠানটির শতভাগ জিপিএ-৫-এর সাফল্য নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তবে সেই সাফল্যের পেছনে শিক্ষার্থী বাছাইয়ের কোনো প্রক্রিয়া ছিল কিনা, থাকলে তা কতটা ন্যায়সঙ্গত, তা খতিয়ে দেখতে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম

We use cookies to improve your browsing experience. By using the site, you agree to our Privacy Policy .