মৃত্যুর আগে আবরার ফাহাদের সেই ফেসবুক পোস্টে কী ছিল?
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:০২ পিএম
শহীদ আবরার ফাহাদ। ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের সাত বছর পূর্ণ হয়েছে। ২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর রাতে শেরেবাংলা হলের একটি কক্ষে তাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। দীর্ঘ সাত বছর পরও মামলার চূড়ান্ত আইনি প্রক্রিয়া শেষ হয়নি। বিচারিক আদালত ও হাইকোর্টে দণ্ড বহাল হওয়ার পর মামলাটি এখন আপিল বিভাগে বিচারাধীন। চূড়ান্ত আপিল শুনানি এখনো শুরু হয়নি।
আবরার হত্যাকাণ্ডের পর তার একটি ফেসবুক পোস্ট ব্যাপক আলোচনায় আসে। মৃত্যুর আগে দেওয়া ওই পোস্টে ভারত ও বাংলাদেশের বিভিন্ন চুক্তি, পানি, বন্দর ও গ্যাস-সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন তিনি। পোস্টটি এখন পর্যন্ত ৪ লাখ ৭১ হাজারের বেশি প্রতিক্রিয়া পেয়েছে এবং ৭৩ হাজারের বেশি বার শেয়ার হয়েছে।
২০১৯ সালের ৪ অক্টোবর, হত্যাকাণ্ডের দুই দিন আগে, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বিভিন্ন চুক্তি ও সমঝোতার সমালোচনা করে ফেসবুকে পোস্টটি দেন আবরার। মামলার তদন্ত ও বিচারিক নথিতে উঠে আসে, ওই পোস্টকে কেন্দ্র করে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের নামে শেরেবাংলা হলের ২০১১ নম্বর কক্ষে ডেকে নেওয়া হয়েছিল। পরে সেখানে রাতভর তাকে মারধর করা হয়। একপর্যায়ে তার মৃত্যু হয়।
২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর মধ্যরাতে বুয়েটের শেরেবাংলা হলের ২০১১ নম্বর কক্ষে আবরারকে মারধর করা হয়। রাত প্রায় ৩টার দিকে হলের সিঁড়ি থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
যে পোস্টে ভারত প্রসঙ্গ তুলেছিলেন আবরার
আবরার ফাহাদের সেই পোস্টে ভারতের কলকাতা বন্দর, পানি বণ্টন, গ্যাস ও বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহারের প্রসঙ্গ উঠে আসে। পাঠকদের জন্য তার পোস্টটি হুবহু তুলে ধরা হলো—
‘৪৭ এ দেশভাগের পর দেশের পশ্চিমাংশে কোন সমুদ্রবন্দর ছিল না। তৎকালীন সরকার ৬ মাসের জন্য কলকাতা বন্দর ব্যবহারের জন্য ভারতের কাছে অনুরোধ করল। কিন্তু দাদারা নিজেদের রাস্তা নিজেদের মাপার পরামর্শ দিছিলো। বাধ্য হয়ে দুর্ভিক্ষ দমনে উদ্বোধনের আগেই মংলা বন্দর খুলে দেওয়া হয়েছিল। ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে আজ ইন্ডিয়াকে সে মংলা বন্দর ব্যবহারের জন্য হাত পাততে হচ্ছে।
কাবেরি নদীর পানি ছাড়াছাড়ি নিয়ে কানাড়ি আর তামিলদের কামড়াকামড়ি কয়েকবছর আগে শিরোনাম হয়েছিল। যে দেশের এক রাজ্যই অন্যকে পানি দিতে চাই না সেখানে আমরা বিনিময় ছাড়া দিনে দেড়লাখ কিউবিক মিটার পানি দিব।
কয়েকবছর আগে নিজেদের সম্পদ রক্ষার দোহাই দিয়ে উত্তরভারত কয়লা-পাথর রপ্তানি বন্ধ করেছে অথচ আমরা তাদের গ্যাস দিব। যেখানে গ্যাসের অভাবে নিজেদের কারখানা বন্ধ করা লাগে সেখানে নিজের সম্পদ দিয়ে বন্ধুর বাতি জ্বালাব।
হয়তো এসুখের খোঁজেই কবি লিখেছেন-
“পরের কারণে স্বার্থ দিয়া বলি
এ জীবন মন সকলি দাও,
তার মত সুখ কোথাও কি আছে
আপনার কথা ভুলিয়া যাও।”’
মামলায় ২০ জনের মৃত্যুদণ্ড
আবরার হত্যার এক মাসের মধ্যে ২০১৯ সালের ১৩ নভেম্বর ২৫ জনকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র দেয় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। ২০২০ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর অভিযোগ গঠন করা হয়।
২০২১ সালের ৮ ডিসেম্বর ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১ মামলার রায় দেন। রায়ে ২০ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং পাঁচজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
পরে আসামিদের ডেথ রেফারেন্স, আপিল ও জেল আপিলের শুনানি শেষে ২০২৫ সালের ১৬ মার্চ হাইকোর্টও বিচারিক আদালতের রায় বহাল রাখেন। এরপর মামলাটি আপিল বিভাগে যায়। বর্তমানে সেখানেই চূড়ান্ত আইনি প্রক্রিয়া চলছে।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ২০ আসামির মধ্যে তিনজন বিচারিক আদালতের রায়ের সময় থেকেই পলাতক। তারা হলেন মোর্শেদ-উজ-জামান মণ্ডল জিসান, এহতেশামুল রাব্বি তানিম ও মুজতবা রাফিদ। আরেক মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি মুনতাসির আল জেমি ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট গাজীপুরের হাই সিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে পালিয়ে যান। ফলে এ মামলায় দণ্ডিত ২৫ আসামির মধ্যে বর্তমানে চারজন পলাতক।
দ্রুত রায় কার্যকরের দাবি পরিবারের
আবরারের বাবা বরকত উল্লাহ বলেন, ‘ভারত আমাদের দেশটাকে গ্রাস করতে চেয়েছিল। আবরার সেটার প্রতিবাদ করেছিল। যে কারণে আবরারকে জীবন দিতে হয়েছে, সেটার বাস্তবায়ন চাই আমরা। দেশকে নিয়ে আবরার ফাহাদের যেই স্বপ্ন ছিল, সেই স্বপ্নের বাংলাদেশ দেখতে চাই।’
মামলার দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে ক্ষোভ জানিয়ে তিনি বলেন, সাত বছর পেরিয়ে গেলেও রায় কার্যকর হয়নি। পলাতক আসামিদের দ্রুত গ্রেফতার এবং বিচারপ্রক্রিয়া শেষ করে রায় কার্যকর করার দাবি জানান তিনি।
ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আবরারের স্মৃতি ধরে রাখতে একটি সেতুর নাম তার নামে করারও দাবি জানিয়েছেন তার বাবা।
আবরার হত্যার সাত বছর পরও তাই তার পরিবারের অপেক্ষা শেষ হয়নি। বিচারিক আদালত ও হাইকোর্টের পর এখন মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তির অপেক্ষায় তারা।
