৪০ দেশের দলকে পেছনে ফেলে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ‘টিম চুয়েট সি’
Advertisement
চুয়েট প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:৪১ পিএম
৪০ দেশের দলকে পেছনে ফেলে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ‘টিম চুয়েট সি’
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টায় অনুষ্ঠিত ‘এসিআই মর্টার ওয়ার্কেবিলিটি কম্পিটিশন ২০২৬’-এ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থীদের দল ‘টিম চুয়েট সি’।
বিশ্বের নির্বাচিত সেরা ৪০টি দলকে পেছনে ফেলে বিশ্বসেরার তালিকায় নাম লিখিয়েছে বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্বকারী এই দলটি।
প্রতিযোগিতাটির সামগ্রিক বিভাগে শীর্ষস্থান অর্জনের পাশাপাশি দলটি অর্থনৈতিক বিভাগে দ্বিতীয় এবং পরিবেশগত বিভাগে চতুর্থ স্থান লাভ করেছে।
আমেরিকান কংক্রিট ইনস্টিটিউট (এসিআই) আয়োজিত এই আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা গত ১১ থেকে ১৪ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের আটলান্টায় অনুষ্ঠিত হয়। বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রতিষ্ঠানের জমা দেওয়া প্রতিবেদন পুঙ্খানুপুঙ্খ যাচাই-বাছাই শেষে নির্বাচিত সেরা ৪০টি দল মূলপর্বে অংশগ্রহণের সুযোগ পায়।
মূলপর্বে চুয়েটের প্রতিনিধিত্ব করেন পুরকৌশল বিভাগের চার শিক্ষার্থী—খন্দকার ফাহাদ আলম, স্বরূপ চন্দ্র মোদক, তানজিম মুশাররাত তুশিন ও সুমাইয়া বিনতে মান্নান। দলটির অনুষদ উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন চুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক এবং এসিআই স্টুডেন্ট চ্যাপ্টার-চুয়েটের উপদেষ্টা ড. জিএম সাদিকুল ইসলাম।
বিজয়ের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে দলের সদস্য স্বরূপ চন্দ্র মোদক বলেন, এ ধরনের বড় প্রতিযোগিতায় অংশ নিলে বোঝা যায় বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে আমাদের সামর্থ্য কতটা। আমরা যে বিশ্বমানের কাজ করতে সক্ষম, তা এখানে এসে নতুন করে উপলব্ধি করেছি। তবে দুঃখজনক বিষয় হলো, সব সময় আমরা পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা পাই না। এখানে আমাদের প্রবাসী অগ্রজরা বলেছেন, বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা অত্যন্ত মেধাবী ও পরিশ্রমী। তারা যদি যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা ও সুযোগ পান, তবে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তেই মেধার স্বাক্ষর রাখতে পারবেন।
দলের উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. জিএম সাদিকুল ইসলাম জানান, ২০১৮ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে এসিআই স্টুডেন্ট চ্যাপ্টার-চুয়েট আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানসহ এ পর্যন্ত মোট ছয়টি পুরস্কার অর্জন করেছে। তবে এর আগের অর্জনগুলো ছিল মূলত অনলাইনভিত্তিক প্রতিযোগিতায়। গত বছর মালয়েশিয়ায় অনুষ্ঠিত সশরীরে অংশগ্রহণের একটি প্রতিযোগিতায় আমাদের দল চতুর্থ স্থান অর্জন করেছিল। আমেরিকার মাটিতে সরাসরি উপস্থিত হয়ে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে শিক্ষার্থীরা ভালো করবে—এটি ছিল দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন। সেই প্রত্যয় নিয়েই দলটি যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমায়। আজ তারা বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। এই গৌরব শুধু আমাদের একার নয়, পুরো চুয়েট পরিবার তথা সমগ্র বাংলাদেশের। আশা করি, চুয়েটের এই সাফল্যের ধারা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।
প্রতিযোগিতায় মর্টারের বিভিন্ন প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্য মূল্যায়ন করা হলেও সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় এর প্রবাহক্ষমতা (Workability/Flowability) ও স্থিতিশীলতার ওপর। মূল্যায়নে মোট নম্বরের ৫০ শতাংশ বরাদ্দ ছিল প্রবাহক্ষমতার জন্য এবং ২০ শতাংশ স্থিতিশীলতার জন্য। এছাড়া কার্বন নিঃসরণের পরিমাণের ওপর ১০ শতাংশ, অর্থনৈতিক সাশ্রয়িতার জন্য ৫ শতাংশ এবং বাকি ১৫ শতাংশ নির্ধারিত হয় লিখিত প্রযুক্তিগত প্রতিবেদনের গুণগত মানের ভিত্তিতে।
দলের সদস্যরা জানান, মর্টারের প্রবাহক্ষমতা ও স্থিতিশীলতার মধ্যে নিখুঁত ভারসাম্য বজায় রাখাই ছিল তাদের জন্য সবচেয়ে বড় কারিগরি চ্যালেঞ্জ। মর্টারকে বেশি তরল বা প্রবাহক্ষম করতে গেলে অনেক সময় এর উপাদানের স্থিতিশীলতা কমে যায়, আবার স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে গেলে প্রবাহক্ষমতা ব্যাহত হতে পারে। কোনো বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে আপস না করে সর্বোত্তম অনুপাত খুঁজে বের করাই ছিল গবেষণার মূল সাফল্য।
এছাড়া পরিবেশবান্ধব করতে এবং নির্মাণ খরচ সাশ্রয়ী রাখতে বিশেষ জোর দেওয়া হয় সম্পূরক সিমেন্টীয় উপাদান (SCMs) ব্যবহারের ওপর। অর্থাৎ শুধু কার্যকারিতা নয়, পরিবেশ সুরক্ষা ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা—উভয় দিক বিবেচনায় রেখেই চূড়ান্ত মিশ্রণটি তৈরি করা হয়েছিল।
প্রতিযোগিতার মূলপর্বে প্রবাহক্ষমতা পরীক্ষা করা হয় এসিআই নির্ধারিত বিশেষ ছাঁচ ব্যবহারের মাধ্যমে। নির্দিষ্ট সময়ে মর্টার কত দ্রুত সেই ছাঁচ পূর্ণ করতে পারে, তার ভিত্তিতেই এর গতিশীলতা নির্ণয় করা হয়।
অন্যদিকে স্থিতিশীলতা যাচাইয়ে দেখা হয় উপাদানের তলানি জমা ও উপাদান পৃথকীকরণ (Bleeding and Segregation)। একটি পরিমাপক চোঙে নির্দিষ্ট পরিমাণ মর্টার রেখে পর্যবেক্ষণ করা হয় মিশ্রণ থেকে পানি বা ভারি উপাদান আলাদা হয়ে যায় কিনা। উপাদান পৃথকীকরণ যত কম ঘটে, মর্টার প্রযুক্তিগতভাবে তত বেশি টেকসই ও স্থিতিশীল বলে বিবেচিত হয়।
উল্লেখ্য, আমেরিকান কংক্রিট ইনস্টিটিউট (এসিআই) বৈশ্বিক নির্মাণ ও কংক্রিট প্রযুক্তির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড, স্ট্যান্ডার্ড কোড ও প্রকৌশল জ্ঞান প্রণয়নে নেতৃত্বদানকারী শীর্ষ প্রতিষ্ঠান।
বর্তমানে বিশ্বের ১২০টিরও বেশি দেশে সংস্থাটির ৩৫ হাজারের অধিক সদস্য রয়েছে। এর সদর দপ্তর যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্যে অবস্থিত।
