সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির শিরশ্ছেদ, শাহবাগে বিক্ষোভ
Advertisement
ঢাবি প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৩২ পিএম
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় শাহবাগে বিক্ষোভ।
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সৌদি আরবে ‘অনৈতিক কাজে’ জড়িত থাকার অভিযোগে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় বাংলাদেশ সরকারের ভূমিকার সমালোচনা করে শাহবাগে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। সমাবেশ থেকে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় সৌদি সরকারের কাছে জবাব চাওয়া এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের বক্তব্যের বিষয়ে সাত দিনের মধ্যে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) বিকাল ৫টায় রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে ‘নেটওয়ার্ক ফর পিপলস অ্যাকশন’ আয়োজিত এ সমাবেশে বক্তারা এসব দাবি জানান।
রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সভাপতি হাসনাত কাইয়ুম বলেন, প্রবাসীদের সহায়তা ও তাদের পাঠানো রেমিট্যান্সের ওপর দাঁড়িয়েই বাংলাদেশের অর্থনীতি ও রাজনীতি পরিচালিত হচ্ছে। অথচ প্রবাসীদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের বক্তব্য অত্যন্ত নৃশংস, জঘন্য, আক্রমণাত্মক ও অপমানজনক।
তিনি বলেন, প্রবাসীদের বিনা বিচারে, বিনা নোটিশে বিচারের নামে হত্যা করে তাদের লাশ যখন বাংলাদেশে পাঠানোর পরিস্থিতি হয়েছে, তখন বাংলাদেশের মানুষ এদের কাছে যে প্রশ্ন তুলছে এবং একজন মন্ত্রী যে উত্তর দিচ্ছেন, তা আগের ফ্যাসিস্ট সরকারগুলোর চাইতে অনেক বেশি নৃশংস।
হাসনাত কাইয়ুম বলেন, বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে যথাযথভাবে না জেনেই সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনাকে সমর্থন করা হচ্ছে। এমনকি নিহত ব্যক্তিদের নিয়ে ‘পাপের লাশ’ ধরনের মন্তব্য করে বাংলাদেশের নাগরিকদের প্রতি অবজ্ঞা প্রকাশ করা হচ্ছে। এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
তিনি বলেন, এটা অভ্যুত্থানের পরের বাংলাদেশ। ফ্যাসিজমের ভেতর দিয়ে ফ্যাসিস্টরা যেভাবে ক্ষমতায় এসেছিল, আপনি সেইভাবে ক্ষমতায় এসেছেন। আপনাকে বিনা ভোটে, পাহারা দিয়ে ক্ষমতায় নিয়ে এসেছে এবং আপনার কোথাও জবাবদিহি করতে হবে না—এ রকম চিন্তা করে বাংলাদেশে সরকার পরিচালনা করতে চাইলে সেটা চলবে না।
সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের বক্তব্যের বিষয়ে সাত দিনের মধ্যে পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়ে হাসনাত কাইয়ুম বলেন, সরকারকে পরিষ্কার করে বলতে হবে, এই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যারা বিদ্বেষমূলক বক্তব্য দিয়েছেন, তাদের ব্যাপারে সরকার কী ভূমিকা নেয়। আগামী সাত দিনের মধ্যে তাদের বিরুদ্ধে সরকার কী ভূমিকা নেয়, এটা আমরা দেখতে চাই।
তিনি আরও বলেন, যদি পদক্ষেপ না নেয়, এই সরকারের এই মন্ত্রীদেরকে পদ থেকে হটিয়ে দেওয়ার জন্যে, অপসারণের জন্যে প্রবাসীদের পক্ষ থেকে আমরা তাদের বিরুদ্ধে লড়াই-সংগ্রাম শুরু করব।
অল্টারনেটিভসের সংগঠক তাজনূভা জাবীন বলেন, সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় সরকারের ভূমিকা ও বক্তব্য অত্যন্ত দুঃখজনক। নিহত ব্যক্তিদের একজন নজরুল ২০২৩ সালের আগস্টে গ্রেফতার হওয়ার পর দীর্ঘ সময় কারাগারে ছিলেন। এ সময়ে বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বা সৌদি আরবে বাংলাদেশি দূতাবাস ও কনস্যুলেট তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছে কিংবা তাকে আইনি সহায়তা দিয়েছে এমন তথ্য তারা পাননি।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের প্রবাসী শ্রমিকেরা শ্রম বিক্রি করে দেশে রেমিট্যান্স পাঠান। সেই অর্থের ওপর দাঁড়িয়ে বড় বড় বাজেট ঘোষণা করা হয়। অথচ সেই শ্রমিকদের জীবনের মূল্য ও অধিকার নিশ্চিত করা হচ্ছে না। এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
তাজনূভা জাবীন বলেন, বাংলাদেশ সরকারের যদি নিজের নাগরিকের মূল্য নিজের কাছে না থাকে, তাহলে আরেক দেশের কাছে কীভাবে থাকবে?
তিনি আরও বলেন, সৌদি আরবে বাংলাদেশি শ্রমিকদের গ্রেফতার, কারাবাস এবং তাদের আইনি সহায়তার বিষয়গুলোতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রয়োজন। বৈধ কাগজপত্র থাকার পরও কেন শ্রমিকেরা কারাগারে যাচ্ছেন এবং তাদের সহায়তায় দূতাবাস কী ভূমিকা পালন করছে, তার ব্যাখ্যা দিতে হবে।
তাজনূভা জাবীন আরও বলেন, বিদেশে শ্রমিক পাঠানোর পুরো প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছতার আওতায় আনতে হবে। কোন নীতিমালার অধীনে এবং কোন কোন এজেন্সির মাধ্যমে শ্রমিকেরা বিদেশে যাচ্ছেন, তা প্রকাশ করতে হবে। রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর কার্যক্রম তদারকি এবং শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান তিনি।
শিক্ষক ও গবেষক মাহা মির্জা বলেন, শ্রীলঙ্কা, ফিলিপাইন ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশ প্রবাসী নাগরিকদের অধিকার রক্ষায় নিজেদের অবস্থান তুলে ধরতে পেরেছে। অথচ বাংলাদেশে প্রবাসী শ্রমিকদের সুরক্ষার প্রশ্নে কার্যকর কূটনৈতিক তৎপরতার অভাব দেখা যাচ্ছে।
তিনি বলেন, আমরা যেহেতু নিজেদেরকে গরিব মিসকিনের দেশ বলে মনে করি, আমরা মনে করি যে আমরা বাসাবাড়িতে কাজ করার জন্য আমাদের বাংলাদেশের নারীদেরকে পাঠাব। তারা ওখানে গিয়ে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হবেন, যৌন নিপীড়নের শিকার হবেন, ধর্ষণের শিকার হবেন, গণধর্ষণের শিকার হবেন। কিন্তু আমাদের কিছু বলার নাই।
মাহা মির্জা বলেন, প্রবাসী নারী শ্রমিকদের ওপর নির্যাতনের ঘটনা দীর্ঘদিন ধরে ঘটে চললেও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশি দূতাবাস ও প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কার্যকর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিদেশে কর্মরত শ্রমিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।
তিনি আরও বলেন, আমরা আমাদের দেশের প্রবাসী ভাইবোনদের মনে করি যে তারা টাকা বানানোর মেশিন এবং তারা বাংলাদেশের রেমিট্যান্স পাঠানোর মেশিন। তাদের যে মানবাধিকার আছে, শ্রম অধিকার আছে, একটু ভালো খেয়ে বেঁচে থাকার অধিকার আছে এবং সর্বোপরি আমাদের যে জেদ্দা এবং রিয়াদে যে কনস্যুলেট আছে, সেখান থেকে যে সহযোগিতা পাওয়ার অধিকার আছে, এই বিষয়ে আমরা কখনো কোনো কথা বলিনি।
প্রবাসী শ্রমিকদের মৃত্যুর পরিসংখ্যানের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, গত ১৩ বছরে ৩৩ হাজার শ্রমিকের লাশ দেশে ফেরার বিষয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোও গুরুত্ব দিয়ে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। এসব শ্রমিকের মৃত্যুর কারণ, তাদের কর্মপরিবেশ এবং মৃত্যুর আগে তারা কী ধরনের পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেছেন, তা খতিয়ে দেখতে হবে।
তিনি বলেন, এসব অনিয়ম বন্ধে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রয়োজনে বিদেশে কর্মী পাঠানোর পুরো প্রক্রিয়াকে সরকারি ব্যবস্থাপনার আওতায় এনে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
সমাবেশ থেকে বক্তারা সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করা, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের বক্তব্যের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া, প্রবাসী শ্রমিকদের সুরক্ষায় কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন এবং বিদেশে শ্রমিক পাঠানোর প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানান।

