কক্সবাজারে রিসোর্টে আগুন
নন্দীপাড়ার বাড়িতে কান্নার রোল
Advertisement
আরমান ভূঁইয়া
প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ০১:০৪ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
‘আমার সঙ্গে যদি আমার স্ত্রী থাকত, তাহলে তাকে নিয়ে বের হতে পারতাম। কিন্তু সে পাশের কক্ষে বোনদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়েছিল। আমরা শনিবার সকালে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দিতাম। ব্যাগ গোছাতে গিয়েছিল সে। আগুনের তাপে দরজা খুলতে পারছিলাম না। পরে জানালার কাচ ভেঙে দোতলা থেকে লাফ দিয়ে প্রাণে বেঁচেছি। কিন্তু আমার স্ত্রীকে আর বের করতে পারিনি। ভেতরে আগুন আর ধোঁয়ায় কিছুই দেখা যাচ্ছিল না।’
কথাগুলো বলতে বলতে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন আশিকুর রহমান আশিক। কক্সবাজারের ইনানীর টুপটুপ রিসোর্টে ভয়াবহ আগুন থেকে প্রাণে বেঁচে ফিরেছেন তিনি। কিন্তু হারিয়েছেন স্ত্রী ইসরাত জাহান মালিহাসহ একই পরিবারের ছয়জনকে। শনিবার রাতে রাজধানীর খিলগাঁওয়ের পশ্চিম নন্দীপাড়ায় স্বজনদের বাসায় বসে সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা বলছিলেন আশিক। তার কথায় তখনো স্পষ্ট আতঙ্ক, শোক আর প্রিয়জনকে হারানোর অসহায়ত্ব। কক্সবাজারের আনন্দ ভ্রমণ শেষ হয়েছে ছয়টি প্রাণহানিতে। যে বাড়িতে কয়েক দিন আগেও ছিল বেড়াতে যাওয়ার আনন্দ, সেখানে এখন কান্না আর আহাজারি। স্বজনদের বুকফাটা আর্তনাদে ভারী হয়ে উঠেছে পুরো নন্দীপাড়া এলাকার পরিবেশ। কেউ হারিয়েছেন মেয়ে, কেউ বোন, কেউ সন্তান। আর আশিকের কাছে স্ত্রীকে হারানোর শোকের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চোখের সামনে ঘটে যাওয়া সেই ভয়াবহ স্মৃতি।
স্বজনরা জানান, গত বুধবার রাতে আশিকসহ একই পরিবারের ১০ জন কক্সবাজারে ঘুরতে যান। তারা টুপটুপ রিসোর্টের দোতলার তিনটি রুম ভাড়া নেন। শনিবার সকালে আগুন লাগার পর আশিকসহ তিনজন জানালা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলেও পুড়ে মারা যান তার স্ত্রী ইসরাত জাহান মালিহা (২৯), মালিহার বোন লাইলা জাহান নাবিলা (২৫), মালিহার খালাতো বোন মেলিতা মেহজাবিন (২৩) ও ফারিহা কবির (৩৩), ফারিহার ছেলে ফাইজান নূর (৫) এবং তার ভাই নাফিস তেহামি জেরিফ (২৪)। রিসোর্টের দ্বিতীয়তলা থেকে লাফিয়ে প্রাণে বেঁচেছেন মালিহার খালা মেহেরুন নেসারুল মিলা ও তার স্বামী মাসুদ এবং মালিহার স্বামী আশিক। এছাড়াও নিহত ফারিহার স্বামী নূর আলম অফিসের কাজের জন্য আগের দিন (শুক্রবার) ঢাকায় ফিরে আসেন। আশিক জানান, রিসোর্টের নিচের দিক থেকে আগুন ছড়িয়ে পড়ায় বের হওয়ার পথ ছিল না। কয়েকজন জানালার কাচ ভেঙে কিংবা ওপর থেকে লাফ দিয়ে প্রাণে বাঁচেন। কিন্তু ছয়জন আর বের হতে পারেননি।
‘খেয়ে আবার ফোন দেবে বলেছিল মেয়েরা’ : রাজধানীর পশ্চিম নন্দীপাড়ার ১৩৫/৩০ নম্বর বাড়িতে শনিবার রাতে গিয়ে দেখা যায়, স্বজনদের কান্নায় পরিবেশ ভারী হয়ে আছে। নিহত মালিহা ও নাবিলার মা রোকসানা আক্তার রিনা বারবার বিলাপ করছিলেন। দুই মেয়েকে হারিয়ে তিনি বাকরুদ্ধ। কখনো মেয়েদের নাম ধরে ডাকছেন, কখনো স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ছেন।
রিনা যুগান্তরকে বলেন, শুক্রবার দিবাগত রাত চারটার দিকে দুই মেয়ের সঙ্গে শেষ কথা হয়েছিল তার। মেয়েরা বলেছিল, তারা খাচ্ছে। খাওয়া শেষ করে আবার ফোন দেবে। কিন্তু সেই ফোন আর আসেনি। সেটিই যে মেয়েদের সঙ্গে শেষ কথা হবে, তা তিনি কল্পনাও করেননি।
মেয়েদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ছিল কত স্বপ্ন। পড়াশোনা শেষ করে ভালো চাকরি করবে, নিজের পায়ে দাঁড়াবে এমন আশায় দিন গুনছিলেন মা। কিন্তু একটি আগুনে মুহূর্তেই সব শেষ হয়ে গেল। দুই মেয়েকে হারানোর শোকের সঙ্গে পরিবারের অন্য সদস্যদের মৃত্যু তাকে আরও ভেঙে দিয়েছে।
আগুনে থেমে গেল কত স্বপ্ন : নিহতদের স্বজনদের কাছে এই মৃত্যু শুধু ছয়টি প্রাণ হারানোর ঘটনা নয়; একসঙ্গে হারিয়ে যাওয়া একটি পরিবারের স্বপ্ন, ভালোবাসা আর ভবিষ্যৎ। কারও পড়াশোনা শেষ করে কর্মজীবনে প্রবেশের কথা ছিল, কারও সামনে ছিল নতুন জীবন গড়ার পরিকল্পনা। ছোট্ট শিশুটির জীবন তো সবে শুরু হয়েছিল। কক্সবাজারের সেই রিসোর্টে এখন পড়ে আছে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের স্মৃতি। আর ঢাকার নন্দীপাড়ায় স্বজনদের চোখে শুধু পানি। যে মানুষগুলো একসঙ্গে বেড়াতে গিয়েছিলেন, তাদের সবাই আর একসঙ্গে ফিরবেন না। স্বজনরা জানান, নিহত ছয়জনের লাশ ডিএনএ টেস্টের পর পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
