Logo
Logo
×

সারাদেশ

পেকুয়া বিলের জলে ‘ঝাই’, ৩০০ জেলে পরিবারের আশীর্বাদ

Icon

এম এ হাকাম হীরা, নালিতাবাড়ী (শেরপুর)

প্রকাশ: ১৬ অক্টোবর ২০২৫, ১১:০১ পিএম

পেকুয়া বিলের জলে ‘ঝাই’, ৩০০ জেলে পরিবারের আশীর্বাদ

ভোরের আলো সবেমাত্র পেকুয়া বিলের স্থির জলে সজীবতা ছড়াতে শুরু করেছে। হালকা কুয়াশার চাদর সরিয়ে বিলের জলে ছুটে চলেছে ছোট ছোট ডিঙ্গি নৌকা। বিলের জলকে ঢেকে রাখা সবুজ পুরু স্তর, স্থানীয় ভাষায় ‘ঝাই’ (ভাসমান জলজ উদ্ভিদ) নামে পরিচিতি। সেই স্তর ঠেলে চলছে নৌকাগুলো। 

শেরপুরের নকলা উপজেলার গণপদ্দি এলাকার পেকুয়া বিলসংলগ্ন প্রায় ৩০০ পরিবার দৈনন্দিন জীবনের চাকা সচল রাখে এই ‘ঝাই’ সংগ্রহ করে। 

পেকুয়া বিল, যা তার বিস্তীর্ণ ও প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের জন্য স্থানীয়দের কাছে সুপরিচিত। প্রভাবশালীদের লোলুপ দৃষ্টি ও দুই-তৃতীয়াংশ কচুরিপানায় আবৃত্ত হওয়ার পরও সেটি এখন যেন সবুজ খনি। এতে ২১৯ একর আয়তনের বেশিরভাগ অংশই ঢেকে রাখে এই ঝাই। এক সময় ‘ঝাই’ বিলের জন্য অভিশাপ ছিল, যা মাছের চলাচলে বাধা। ব্যাহত করত মাছের প্রজণনও। জাল দিয়ে মাছ ধরতে পারতেন না জেলেরা। এখন এটিই জীবিকার প্রধান উৎস। 

পেকুয়া বিলের পাড়ের বাসিন্দা সানি ইসলাম, যিনি গত দশ বছর ধরে এই ঝাই সংগ্রহ করছেন। তার দিন শুরু হয় ফজর নামাজের পর। তিনি তার ছোট ডিঙ্গি নিয়ে বিলে ভাড়া নেওয়া জায়গায় চলে যান। 

সানি ইসলাম বলেন, সকাল বেলা ঝাই নরম থাকে, তুলতে সুবিধা হয়। বাঁশ দিয়ে ঝাই তুলে নৌকায় ভরে নিই। তারপর সেগুলো বিলের কিনারায় এনে ডাঙ্গায় স্তূপ করে রেখে বিক্রি করি। 

আব্দুর রহিম নামে আরেকজন জানান, এক বেলায় দু’জন মিলে প্রায় পাঁচ ভ্যান পর্যন্ত ঝাই তুলতে পারি। প্রতি নৌকা বিক্রি হয় ৮শ’ থেকে এক হাজার টাকায়। দু’বেলায় আয় হয় দু’হাজার টাকা; যা দিয়ে এখন সংসার ভালোই চলছে। 

সংগৃহীত এই ঝাইয়ের ক্রেতা হলেন এলাকার ছোট-বড় মাছ চাষিরা। প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া যায় বলে ঝাই মাছের সাশ্রয়ী ও স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্য হিসেবে বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে।  রুই, কাতলা, মৃগেল, গ্রাসকার্প, শিং, মাগুর, তেলাপিয়া মাছের প্রিয় খাবার। 

গণপদ্দি গ্রামের সাবেক ইউপি মেম্বার এবং মাছচাষী শামছুল হক বলেন, মাছের খাবার বাজারে খুব দাম। এই ঝাই খুব সস্তায় ও সহজে পাওয়া যায়। তাছাড়া ঝাই প্রাকৃতিক খাবার হওয়ায় মাছ দ্রিুত বাড়ে এবং মাছের স্বাদও ভালো হয়। 

বিল সংলগ্ন কৈয়ার বাজারের বাসিন্দা বিএনপি নেতা বরুণ চৌধুরী বলেন, এক সময় ঝাই এতটাই ছেয়ে গিয়েছিল যে মাছ ধরা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। এতে মাছের স্বাভাবিক প্রজননও ব্যাহত হচ্ছিল। সময়ের পরিক্রমায় এখন জেলে পরিবারগুলোর জীবন-জীবিকার নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। তিনি বিলটি দখল মুক্ত ও কচুরিপানা পরিষ্কারের দাবি জানান। 

নকলা উপজেলার নয়টি বিলের মধ্যে পেকুয়া বিল অন্যতম। প্রশাসনের পক্ষ থেকে তেমন নজরদারি নেই। ফলে বিলের সেই আগের সৌন্দর্য নেই। বিলের এক-তৃতীয়াংশ ভরে গেছে কচুরিপানায়। বাকি যেটুকু আছে সেটুকু রয়েছে ঝাইয়ে আবৃত। 

নকলা উপজেলা মৎস কর্মকর্তা অনিক রহমান জানান, ঝাই সংগ্রহে যেমন মাছের খরচ কমছে, তেমনি বিলের অতিরিক্ত উদ্ভিদ অপসারণ হওয়ায় জলজ পরিবেশের ভারসাম্যও ফিরছে। ঝাই পেকুয়া বিলের জেলে পরিবারগুলোর জীবিকার উৎস হয়ে উঠেছে। 

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম