৪৫ শয্যার ওয়ার্ডে ভর্তি ২১৫
গাছতলায় চিকিৎসা শিশুদের
ঠাকুরগাঁও জেনারেল হাসপাতালে অতিরিক্ত রোগীর চাপে ওয়ার্ডে তৈরি হয়েছে অসহনীয় পরিবেশ। গরম, বিশুদ্ধ পানির সংকট, অপরিচ্ছন্ন শৌচাগার
এটিএম সামসুজ্জোহা, ঠাকুরগাঁও
প্রকাশ: ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ঠাকুরগাঁও ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে শয্যা সংকটের কারণে গাছের নিচে চলছে শিশুদের চিকিৎসা। বুধবারের ছবি -যুগান্তর
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
গাছতলায় পাতা বিছানায় শুয়ে আছে শিশুরা। তাদের কারও হাতে চলছে স্যালাইন, কারও হাতে রয়েছে ক্যানোলা। কেউবা অপেক্ষা করছে চিকিৎসা বা ওষুধ নেওয়ার জন্য। হাসপাতালের ভেতরে জায়গা না পাওয়ায় খোলা আকাশের নিচে এভাবে তাদের চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। এটি ঠাকুরগাঁও ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের নিত্যদিনের দৃশ্য।
খোঁজ নিয়ে যায় জানা যায়, বুধবার হাসপাতালটির ৪৫ শয্যার শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি ছিল ২১৫ শিশু। যে কারণে এক শয্যায় রাখা হয়েছে একাধিক শিশুকে। ওয়ার্ডের মেঝে ও বারান্দায় চলছে অনেক শিশুর চিকিৎসা। এরপরও জায়গা সংকুলান না হওয়ায় হাসপাতালের আঙিনায় গাছতলায় শিশুদের নিয়ে অবস্থান করছেন অভিভাবকরা।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, অতিরিক্ত রোগীর চাপে ওয়ার্ডে তৈরি হয়েছে অসহনীয় পরিবেশ। গরম, বিশুদ্ধ পানির সংকট, অপরিচ্ছন্ন শৌচাগার। এসব কারণে রাতে অনেকে শিশুদের নিয়ে হাসপাতালের ভেতরে থাকলেও দিনে গাছতলায় অবস্থান করেন। সেখানে চলে তাদের চিকিৎসা। কেউ কেউ ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী বাইরে থেকে কিনতে হয় বলে অভিযোগ করেছেন।
শিশু বিভাগের সিনিয়র নার্স তাজনেহার বলেন, শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি হওয়া রোগীদের অধিকাংশই শ্বাসকষ্ট, জ্বর, সর্দি-কাশি ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত। ১৭ মাস বয়সি নাতিকে হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছেন পঞ্চগড়ের বিউটি বেগম। শিশুটি জন্ম থেকেই বিভিন্ন জটিলতায় ভুগছে। এবার সে টাইফয়েডে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছে। বিউটি বেগম বলেন, ওয়ার্ডে প্রচণ্ড গরম ও ভিড়। এক বিছানায় দুই থেকে তিনটি শিশুকে রাখা হচ্ছে। শিশুরা কান্নাকাটি করে, ভেতরে থাকতে চায় না। তাই বেশির ভাগ সময় নাতিকে বাইরে খোলা বাতাসে রাখতে হয়। স্যালাইন ও ইনজেকশন দেওয়ার সময় শুধু ভেতরে নেওয়া হয়।
তিনি অভিযোগ করেন, রোগীর তুলনায় শৌচাগার কম। নারী-পুরুষকে একই শৌচাগার ব্যবহার করতে হচ্ছে। খাওয়ার পানিরও সংকট রয়েছে। রাস্তার পাশের টিউবওয়েল থেকে পানি আনতে গেলেও অনেক সময় তা ব্যবহার করা যায় না। তখন হোটেল থেকে পানি আনতে হয়। বালিয়াডাঙ্গীর বড়পলাশবাড়ীর আবু বকর বলেন, জ্বর হওয়ায় আমার শিশুকে দুদিন হলো হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তবে হাসপাতাল থেকে কোনো ওষুধ দেওয়া হয়নি। সব ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হয়েছে।
একই অভিযোগ ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার ঢেপটিগুড়া গ্রামের কৃষক শরিফুল্লাহর। তিনি নাতিকে হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছেন। তার ভাষ্য, ভর্তি হওয়ার পর থেকে হাসপাতাল থেকে কোনো ওষুধ পাননি তিনি।
একই ধরনের অভিযোগ করেন আর্নিতা আক্তার নামে এক নারী। তিনি বলেন, আমার শিশু টাইফয়েডে আক্রান্ত। পাঁচ দিনে ৭ থেকে ৮ হাজার টাকার ওষুধ কিনতে হয়েছে। হাসপাতালে খাওয়ার পানি পাওয়া যায় না। টিউবওয়েলের হাতল বাঁধা থাকায় পানি তোলার উপায় নেই। শৌচাগারের অবস্থাও নাজুক। দুটি শৌচাগারের একটিতে ময়লা জমে বন্ধ রয়েছে, অন্যটি ব্যবহার করতে হচ্ছে সবাইকে।
এক শিশুর বাবা বলেন, ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী দুটি ক্যানোলা কিনে আনলেও একটি ব্যবহারের পর অন্যটি ও নতুন মেডিকেল টেপ নিজেদের কাছে রেখে দিয়েছে তারা। পরে টেপ চাইলে নেই বলে জানানো হয়। এ বিষয়ে গণপূর্ত বিভাগের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. কামাল হোসেন বলেন, দুটি শৌচাগারে সমস্যা রয়েছে, বাকি চারটি চালু আছে। সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে আগামী এক সপ্তাহ পর্যবেক্ষণ ও ফলোআপ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ফিরোজ জামান জুয়েল বলেন, সমস্যাগুলো সমাধানে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। গণপূর্ত বিভাগের প্রকৌশলী ও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগকে বিষয়গুলো জানানো হয়েছে। শৌচাগার ও পানির ব্যবস্থাপনার দায়িত্বের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে সমাধান করা হবে।
ওষুধ সরবরাহ না করা ও ক্যানোলা নিয়ে অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, বিষয়টি হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট সুপারভাইজারকে জানানো হবে। ওষুধের বিষয়ে স্টোরকিপারকেও ডাকা হবে। পরিচ্ছন্নতার জন্য সুইপারদেরও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হচ্ছে। অতিরিক্ত রোগীর বিষয়ে তত্ত্বাবধায়ক বলেন, ৪৫ শয্যার জায়গায় কখনো ২৫০ জনের মতো শিশু ভর্তি থাকে। তাদের সঙ্গে মা-বাবাও থাকেন। এতে ওয়ার্ডে মানুষের চাপ আরও বেড়ে যায়।
