ঢাকা জেলা পরিষদ টাওয়ার
নির্মাণে দুর্নীতি তদন্তে দুদককে সুপারিশ
নতুন করে জরিপ ও কারিগরি যাচাই শুরু * ব্যয় ৫৩ কোটি, হিসাব নেই ৪৪ কোটির * নেই নকশা অনুমোদন ও ফায়ার অনাপত্তিপত্র
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ঢাকা জেলা পরিষদ টাওয়ার নির্মাণে ৫৩ কোটি ৫৬ লাখ টাকা ব্যয় হলেও হিসাব নেই রাজস্ব তহবিল থেকে দেওয়া ৪৪ কোটি ৩২ লাখ টাকার। একমাত্র দরদাতা প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয় ১৬০ কোটি টাকার কাজ। রাজউকের নকশা অনুমোদন ও প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র ছাড়াই এগিয়েছে নির্মাণকাজ।
সাত বছরের বেশি সময় ধরে বন্ধ প্রকল্পে এসব অনিয়ম-দুর্নীতি তদন্তে দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) সুপারিশ করেছে স্থানীয় সরকার বিভাগের তদন্ত কমিটি। একই সঙ্গে সরকারি অর্থ আত্মসাতের প্রমাণ পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশও করেছে কমিটি।
এদিকে ২০১৭ সাল থেকে ভবনটির নির্মাণকাজ বন্ধ থাকার পর সম্প্রতি অসমাপ্ত কাজের পরিমাণ নির্ধারণে যৌথ পরিমাপ এবং কারিগরি যাচাই শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, পুরান ঢাকার আদালত এলাকার যানজটপূর্ণ স্থানে এ ধরনের ভবন নির্মাণে যানজট আরও বাড়তে পারে কিনা তাও যাচাই করা জরুরি।
২০২৫ সালের ৩০ জুলাই ঢাকা জেলা পরিষদ ভবনটির নির্মাণকাজ পুনরায় শুরুর বিষয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগের কাছে নির্দেশনা চায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে স্থানীয় সরকার বিভাগ কাজ বন্ধ থাকার কারণ, নকশা ও প্রাক্কলনের অনুমোদন এবং রাজউকের অনুমোদনসংক্রান্ত তথ্যসহ নানা বিষয় জানতে চেয়েছে।
ঢাকা জেলা পরিষদের এক অফিস আদেশে জানানো হয়, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তমা কনস্ট্রাকশনের সম্পন্ন কাজের যৌথ পরিমাপ শুরু হয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) কারিগরি যাচাই ও প্রত্যয়ন কার্যক্রম চলছে। কারিগরি যাচাই শেষে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন পাঠানো হবে। প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক অনুমোদনের পর বাকি কাজের জন্য নতুন করে দরপত্র আহ্বান করা হবে।
রাজস্ব তহবিলের ৪৪ কোটি টাকার হিসাব নেই : ঢাকা জেলা পরিষদ টাওয়ার নির্মাণে তমা কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেডের সঙ্গে ১৬০ কোটি ২৬ লাখ ২২ হাজার ৪৭০ টাকার চুক্তি হয়। ২০১২ সালের ১৮ নভেম্বর কার্যাদেশ দেওয়া হয়। কাজ শেষ করার সময়সীমা ছিল ২০১৫ সালের ১৭ মে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রকল্পের ৩০ শতাংশ অর্থ জেলা পরিষদের রাজস্ব তহবিল থেকে দেওয়া হবে। পরে দোকান বরাদ্দের সালামি থেকে ওই অর্থ সমন্বয় করার কথা ছিল।
ভবনটির ৮৫টি দোকান বরাদ্দ দিয়ে সালামি বাবদ পাওয়া যায় ৯ কোটি ২৪ লাখ ১১ হাজার ৫৫৩ টাকা। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে আটটি বিলের মাধ্যমে মোট ৫৩ কোটি ৫৬ লাখ ৪৮ হাজার ৬১৭ টাকা পরিশোধ করা হয়। এর মধ্যে জেলা পরিষদের রাজস্ব তহবিল থেকে দেওয়া হয় ৪৪ কোটি ৩২ লাখ ৩৭ হাজার ৬৪ টাকা। কিন্তু এ অর্থ ফেরত বা সমন্বয় করা হয়েছে-এমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। এছাড়া ঠিকাদার নবম চলতি বিল বাবদ ৯ কোটি ৫১ লাখ ৪০ হাজার ৯৯০ টাকা দাবি করে।
একটিমাত্র দরপত্রে কাজ পায় তমা কনস্ট্রাকশন : প্রকল্পের দরপত্রে একমাত্র তমা কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড কোম্পানি অংশ নেয়। প্রতিষ্ঠানটির দরপত্রকে গ্রহণযোগ্য বিবেচনা করা হয়। ২০১২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত কমিটি কাজটি দেওয়ার সুপারিশ করে। পাবলিক ওয়ার্কস ডিপার্টমেন্টের (পিডব্লিউডি) ২০১১ সালের রেট শিডিউল অনুসরণ করে দরপত্র মূল্যায়ন করা হয়।
তবে নির্মাণসামগ্রী ও শ্রমের দর এবং সম্ভাব্য মূল্যবৃদ্ধির বিষয় বিবেচনায় নিয়ে ১০ দশমিক ১৬ শতাংশ বাড়তি মূল্য প্রস্তাব করা হয়। এতে সংশোধিত চুক্তিমূল্য দাঁড়ায় ১৬০ কোটি ২৬ লাখ ২২ হাজার ৪৭০ টাকা। তদন্ত কমিটির পর্যবেক্ষণ, দরপত্রে মাত্র একটি প্রতিষ্ঠান অংশ নেওয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত হয়েছে কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
নকশা নেই, নেওয়া হয়নি প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র : ২০১৯ সালের ১২ জুনের এক চিঠিতে জানানো হয়, ভবনটির ২০ তলা পর্যন্ত ছাদ ঢালাইয়ের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু ভবন নির্মাণে রাজউকের নকশা অনুমোদন নেওয়া হয়নি। পরিবেশগত ছাড়পত্র, ফায়ার সার্ভিসের অনাপত্তিপত্র, উচ্চতাসংক্রান্ত অনাপত্তি ও ট্রাফিক ছাড়পত্রও নেওয়া হয়নি। রাজউকের অনুমোদন ছাড়াই নির্মাণকাজ এগিয়ে নেওয়া হয়।
প্রকল্পের পরামর্শক হিসাবে ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনসালট্যান্ট বাংলাদেশ লিমিটেডকে (ইসিবিএল) নিয়োগে ২০০৭ সালের ৫ নভেম্বর স্থানীয় সরকার বিভাগের অনুমোদন পাওয়া যায়। প্রতিষ্ঠানটিকে ৪১ লাখ ৮৩ হাজার ৮৬৪ টাকা পরিশোধ করা হয়। তবে এ অর্থের উৎস সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য নেই।
যা বললেন জেলা পরিষদ প্রশাসক : বর্তমান ঢাকা জেলা পরিষদের প্রশাসক ইয়াসিন ফেরদৌস মুরাদ যুগান্তরকে বলেন, নির্মাণকাজ বন্ধ থাকায় আগের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া ৪৪ কোটি টাকা এখনো সমন্বয় করা হয়নি। ঠিকাদারি চুক্তি বাতিলের পর হিসাব-নিকাশ করে কীভাবে কাজটি এগিয়ে নেওয়া যায়, তা নির্ধারণ করা হবে। এজন্য তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
দোকান বরাদ্দের বিষয়ে তিনি বলেন, নিয়ম অনুযায়ী কিস্তির টাকা পরিশোধ করা হলে বরাদ্দ বহাল রাখা হবে। তা না হলে বরাদ্দ বাতিল করা হবে। ঢাকা জেলা পরিষদের সম্পত্তিতে জেলার প্রত্যেক নাগরিকের অধিকার রয়েছে। কাউকে বঞ্চিত করা হবে না।

