কচুরিপানার নতুন পরিচয়
তৈরি হচ্ছে সুতা, ব্যাগ, ঝুড়ি, টেবিল ম্যাট, পর্দাসহ নানা পরিবেশবান্ধব পণ্য * প্রযুক্তির অভাবে আটকে বাণিজ্যিক উৎপাদন
জামতলায় গ্রিন আর্থ কটেজে কচুরিপানা দিয়ে পণ্য তৈরিতে ব্যস্ত কর্মীরা। বৃহস্পতিবার তোলা -যুগান্তর
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
নদীনালা ও জলাশয়ে অনাদরে ছড়িয়ে থাকা কচুরিপানাকে সাধারণত আগাছা হিসাবেই দেখা হয়। এই কচুরিপানা থেকেই তৈরি হতে হচ্ছে সুতা, দড়ি, ব্যাগ, ঝুড়ি, টেবিল ম্যাট, পর্দাসহ নানা ধরনের পরিবেশবান্ধব পণ্য। প্রাকৃতিক এই উদ্ভিদের তন্তু দিয়ে সফলভাবে এসব পণ্য তৈরি করছেন গ্রিন আর্থ কটেজের প্রধান নির্বাহী (সিইও) ড. মো. তরিক হোসাইন। তবে বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও শুধু সূক্ষ্ম সুতা ও বুননের উপযোগী আধুনিক প্রযুক্তির অভাবে বড় পরিসরে বাণিজ্যিক উৎপাদনে যেতে পারছেন না তিনি।
কচুরিপানা থেকে তন্তু তৈরির পেছনের গল্প জানাতে গিয়ে ড. তরিক যুগান্তরকে জানান, ভেন্ডি, কলা ও আনারসের প্রাকৃতিক তন্তু নিয়ে গবেষণা করতে করতেই নিজের বাড়ির পাশের কপোতাক্ষ নদের বিপুল কচুরিপানা দেখে এটি নিয়ে কাজ শুরু করেন। প্রথমে কচুরিপানার ডাঁটা কেটে প্রেসের মাধ্যমে ভেতরের সব পানি বের করে দেওয়া হয়।
এরপর অবশিষ্ট অংশ ভালো করে শুকিয়ে সেখান থেকে তন্তু আলাদা করা হয়। কচুরিপানার এই তন্তুগুলোর দারুণ স্থায়িত্ব, দৃঢ়তা ও নমনীয়তা রয়েছে। এই তন্তু প্যাঁচিয়ে দড়ি বানিয়ে ব্যাগের হাতলে ব্যবহার করার পাশাপাশি ডেকোরেটিভ ঝুড়ি, টেবিল ম্যাট ও পর্দা তৈরি করা হচ্ছে। জুট লেদারের সঙ্গে এই তন্তু মিলিয়ে উচ্চমূল্যের নতুন নতুন ফ্যাশন অনুষঙ্গ তৈরির কাজও চলছে।
তবে এই তন্তু দিয়ে পোশাক তৈরির ক্ষেত্রে বড় বাধা হচ্ছে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি। গবেষকের ভাষ্য, কচুরিপানার তন্তু থেকে পাঞ্জাবি, ফতুয়া, শাড়ি বা অন্যান্য পোশাক তৈরির জন্য যে ধরনের সূক্ষ্ম সুতা প্রয়োজন, তা উৎপাদনের উপযোগী যন্ত্রপাতি এখনো দেশে সহজলভ্য নয়। প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সংগ্রহ এবং সেগুলো দিয়ে পরীক্ষামূলক উৎপাদন বা পাইলটিং করা সম্ভব হলে পোশাকশিল্পেও এই তন্তুর ব্যবহার বাড়ানো যাবে।
নিজের তৈরি পণ্যের বাজারজাতকরণ প্রসঙ্গে ড. তরিক জানান, তার কিছু পণ্য সরকারি শোরুমে (জেপিডিসিতে) বিক্রি হচ্ছে। একটি পণ্য ২৫০ টাকায় বিক্রি হলেও একই ধরনের পণ্য অন্যরা ৫০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করছেন। জাপানে এসব পণ্যের প্রতি আগ্রহ রয়েছে। যুক্তরাজ্যেও কিছু পণ্য যাচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয় (বুটেক্স) ও ফ্যাশন বিশ্ববিদ্যালয়ে তার তৈরি পণ্য নিয়ে গবেষণা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
কচুরিপানা ছাড়াও পাটের তন্তু নিয়ে কাজ করছেন এই গবেষক। পাট থেকে সুতা তৈরি করে তা দিয়ে শার্ট ও প্যান্টের কাপড়, নারীর পোশাকসহ বিভিন্ন পণ্য তৈরি করছেন। তার দাবি, প্রচলিত পাটপণ্যের বাইরে নিজস্ব নকশা ও সৃষ্টিশীলতার মাধ্যমে পণ্য তৈরি করাই তার কাজের বিশেষত্ব। তার তৈরি কিছু পণ্য শিল্প মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ট্রেডমার্ক পেয়েছে বলে জানান তিনি।
তিনি অভিযোগ করেন, পাটভিত্তিক বিকল্প পণ্য উৎপাদনে বড় প্রকল্প নেওয়া হলেও বাস্তবে প্রয়োজনের সময় বাজারে পর্যাপ্ত পণ্য সরবরাহ করা যায়নি। পলিথিনের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগের সময় তার কাছে দুই লাখ ব্যাগের কাপড় প্রস্তুত ছিল এবং তিনি ব্যাগ সরবরাহ করেছিলেন। কিন্তু সরকারি পর্যায়ে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা ও সমন্বয়ের অভাব রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
বৃহস্পতিবার নারায়ণগঞ্জের জামতলায় ড. তারিকের গ্রিন আর্থ কটেজে গিয়ে দেখা যায়, কর্মীরা কচুরিপানার তন্তু দিয়ে বিভিন্ন ধরনের পণ্য তৈরির কাজ করছেন। এই গবেষকের মতে, কচুরিপানা থেকে পণ্য তৈরির সম্ভাবনা শুধু পরিবেশবান্ধব বিকল্প তৈরির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর মাধ্যমে নতুন শিল্প ও কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হতে পারে।
কিন্তু সেই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে পরীক্ষামূলক গবেষণা থেকে বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, অর্থায়ন ও সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। তিনি আরও জানান, কচুরিপানার তন্তু দিয়ে প্রাথমিক পর্যায়ে পণ্য তৈরি সম্ভব হলেও সূক্ষ্ম সুতা উৎপাদন, পোশাক তৈরির উপযোগী প্রযুক্তি এবং বৃহৎ পরিসরে উৎপাদনের অবকাঠামো না থাকায় উদ্যোগটি এখনো সীমিত পর্যায়ে রয়েছে।

