রহস্যজনক ভূমিকায় বিআইডব্লিউটিএ
পদ্মার ছয় মৌজায় অবাধে বালু ও মাটি লুট
ঝুঁকিতে আন্তর্জাতিক নৌবন্দর * সাবেক ইজারাদার বালু তুলছেন-জেলা প্রশাসন * হাইকোর্টের আদেশ নিয়েই করছি-অভিযুক্ত মান্নাফ
রাজশাহী ব্যুরো
প্রকাশ: ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
রাজশাহীর গোদাগাড়ীর সুলতানগঞ্জে পদ্মা-মহানন্দা নদীর মোহনায় অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহণ কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) আন্তর্জাতিক নদীবন্দর বা নৌপ্রটোকল রয়েছে। এই বন্দরের সঙ্গে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের ময়া নৌবন্দরের যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছে কয়েক বছর আগে। সুলতাগঞ্জ-ময়া পথে বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য চালু হয় ২০২৪ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি। নৌবন্দরটির কার্যক্রম সচল আছে।
আশপাশের উজান ভাটির ২০ কিলোমিটার নদী এলাকা সুলতানগঞ্জ নৌবন্দরটির সীমানা হিসাবে গেজেটভুক্ত। এই সীমানার সংরক্ষক বিআইডব্লিউটিএ। এখানকার ছয় মৌজায় (বালুমহাল) অবাধে বালু ও মাটি লুট হচ্ছে। আর এর নেপথ্যে রয়েছেন বালুমহালটির সাবেক ইজারাদার মাম এন্টারপ্রাইজের মালিক আব্দুল মান্নাফ ও তার সহযোগীরা। রাজশাহী জেলা মাটি ও বালু ব্যবস্থাপনা কমিটি বালুমহাল বন্ধ ঘোষণা করলেও তা উপেক্ষা করেই এই লুট চলছে।
জানা যায়, বিআইডব্লিউটিএ সুলতানগঞ্জ নৌবন্দর সন্নিহিত পদ্মা নদীর এলাকা নৌবন্দর সীমানাভুক্ত নদী থেকে বালু উত্তোলনকে ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনা করে নৌপরিবহণ ও ভূমি মন্ত্রণালয়সহ রাজশাহী জেলা প্রশাসনকে বালুমহালের ইজারা কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দেয়। ফলে চলতি বছরে পদ্মার ছয় মৌজা বালুমহালের ইজারা কার্যক্রম বন্ধসহ বালুমহালটি স্থায়ীভাবে বন্ধ ঘোষণা করে রাজশাহী জেলা মাটি ও বালু ব্যবস্থাপনা কমিটি তথা জেলা প্রশাসন।
রোববার সকালে সরেজমিন দেখা যায়, আব্দুল মান্নাফ ও তার সিন্ডিকেট বালু উত্তোলন বন্ধ করেনি। বরং বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর থেকেই নদী তীরবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকায় ভেকু দিয়ে উর্বর পলিমাটি কেটে সাবাড় করছেন তারা। পদ্মার উজানে সুলতানগঞ্জ থেকে ভাটিতে ফুলতলা পর্যন্ত ১০ কিলোমিটার নদী এলাকায় ড্রেজার নামিয়ে লাখ লাখ ঘনফুট বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। অথচ এক্ষেত্রে বিআইডব্লিউটিএ নীরব ভূমিকা পালন করছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গোদাগাড়ীর ফুলতলা থেকে উজানে রেলবাজার পর্যন্ত বিস্তীর্ণ নদীতট এলাকায় এবার উর্বর পলিমাটি পড়ে জমিগুলো উঁচু হয়েছে। এসব জমি নদীপারের মানুষের। তারা কয়েক বছর ধরে বালুমহালটি বন্ধের দাবিতে আন্দোলন করছেন। নতুন পলিবাহিত উর্বর মাটিতে ফসল আবাদের পরিকল্পনা ছিল তাদের। কিন্তু মান্নাফের সিন্ডিকেট বালুমহাল দখলে নিয়ে উজাড় করছে পলি মাটি।
ফুলতলাসহ চার-পাঁচটি পয়েন্ট দিয়ে প্রতিদিন কয়েক লাখ ঘনফুট বালু ও শতাধিক ট্রাক মাটি লোপাট হচ্ছে। এলাকাবাসী অবিলম্বে মাটি ও বালু লুট বন্ধের দাবি জানিয়েছেন। তাদের অভিযোগ, গত বছরও এই মান্নাফ ইজারার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও তিন মাস বালু ও মাটি লুট করেছিলেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, আব্দুল মান্নাফ গত জুলাইয়ে নিজেকে ক্ষতিগ্রস্ত দাবি করে হাইকোর্টে রিট করেন। ৬ আগস্ট শুনানিতে পরবর্তী তিন মাসের জন্য বালুমহালের কার্যক্রম পরিচালনার অনুমতি দেন আদালত। এই আদেশের সময়সীমা ৬ নভেম্বর শেষ হওয়ার কথা।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, ওই আদেশের কপি পেয়ে রাজশাহী জেলা মাটি ও বালু ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম নৌপরিবহণ ও ভূমি মন্ত্রণালয়, বিআইডব্লিউটিএ-এর চেয়ারম্যান, আইন মন্ত্রণালয়ের সলিসিটরসহ সংশ্লিষ্টদের কাছে জরুরি চিঠি পাঠান। এই চিঠিতে জেলা প্রশাসক স্পষ্ট করে লেখেন, চুক্তি অনুযায়ী সাবেক ইজারাদার মান্নাফ ২০২৫ সালের ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত বালুমহালটি ভোগ-দখল করেছেন।
বালুমহালের ওপর তার কোনো অধিকার বহাল নেই। হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে দ্রুত আপিল দাখিলের জন্য নৌপরিবহণ মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ সংশ্লিষ্টদের প্রতি অনুরোধ করেন জেলা প্রশাসক।
জানা যায়, জেলা প্রশাসন চিঠি পাঠানোর পর রাজশাহীর একজন নেতার হস্তক্ষেপে বিআইডব্লিউটিএ আপিল দাখিল থেকে পিছিয়ে আসে। ওই নেতা বিআইডব্লিউটিএ-এর সদর দপ্তরে হাজির হয়ে কর্মকর্তাদের চাপ দেন বলেও তথ্য মিলেছে। শেষ পর্যন্ত বালু উত্তোলন অব্যাহত রাখার দ্বিতীয় আদেশ আবদুল মান্নাফের পক্ষে যায়। পদ্মার ছয় মৌজা বালুমহাল এলাকার বাসিন্দা শরিফুল ইসলামের অভিযোগ, সাবেক এই ইজারাদার গত বছর ইজারা মেয়াদ শেষ হওয়ার পর আরও তিন মাস অবৈধভাবে বালু ও মাটি লোপাট করেছিল। এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাজশাহীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. বেলায়েত হোসেন জানান, জেলা মাটি ও বালু ব্যবস্থাপনা কমিটির সিদ্ধান্তে বালুমহালটি বিলুপ্ত করা হয়েছে। এটির ওপর এখন জেলা প্রশাসনের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।
হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে আপিল দাখিলে রহস্যজনক গড়িমসির বিষয়ে বিআইডব্লিটিএ-এর সদস্য ও যুগ্মসচিব (পরিকল্পনা ও অপারেশন) মো. সাজেদুর রহমান রোববার বলেন, দ্রুত আপিল দাখিল করা হবে। সব নথিপত্র প্রস্তুত।
অভিযুক্ত সাবেক ইজারাদার আব্দুল মান্নাফ জানান, তিনি আদালতের আদেশ নিয়ে কাজ চালাচ্ছেন। হাইকোর্ট বালু উত্তোলন ও পরিবহণসহ সব কার্যক্রম পরিচালনার অনুমতি দিয়েছেন।
