Logo
Logo
×

Advertisement

শেষ পাতা

আইসিসিডিআর,বি-স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা

প্রতি কেজি সাদা ভাতে ৩০৫ মাইক্রোগ্রাম সিসা

Icon

জাহিদ হাসান

প্রকাশ: ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

প্রতি কেজি সাদা ভাতে ৩০৫ মাইক্রোগ্রাম সিসা

Advertisement

স্থানীয়ভাবে তৈরি অ্যালুমিনিয়ামের রান্নার হাঁড়ি-পাতিলের খাবারে সিসার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এ ক্ষেত্রে নতুন পাত্র প্রথমে কয়েকবার ব্যবহারের সময়ই খাবারে সিসার পরিমাণ বেশি মিলেছে। আইসিসিডিআর,বি ও স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় এমন তথ্য উঠে এসেছে।

এতে দেখা যায়, গবেষণায় পরীক্ষা করা প্রতিটি পাত্র থেকেই খাবারে সিসা নির্গত হয়েছে। নতুন পাত্রে প্রথমবার রান্নার সময় প্রতি কেজি সাদা ভাতে সর্বোচ্চ ৩০৫ মাইক্রোগ্রাম এবং খিচুড়িতে সর্বোচ্চ ৪২০ মাইক্রোগ্রাম সিসা পাওয়া গেছে। সিসায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হয় শিশুরা। শিশুদের খাবারে সিসার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফডিএ) নির্ধারিত সীমা প্রতি কেজিতে ১০ মাইক্রোগ্রাম। বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে শিশুরা সাধারণত যে পরিমাণ ভাত খায়, তা বিবেচনায় নিয়ে গবেষকরা একটি হিসাব করেছেন।

তাদের হিসাব অনুযায়ী, এ ধরনের পাত্রে রান্না করা ভাত খেলে একটি শিশু খাবারের মাধ্যমে দৈনিক সিসা গ্রহণের ক্ষেত্রে এফডিএর নির্ধারিত রেফারেন্স মাত্রার পাঁচ গুণেরও বেশি সিসা গ্রহণ করতে পারে। বাংলাদেশে ঘটছে তার উলটো। অ্যালুমিনিয়ামের পাত্র বারবার ব্যবহারের ফলে খাবারে সিসার মাত্রা কমে আসে বলে গবেষণায় বলা হলেও তা নিরাপদ মাত্রার নিচে নামে না। গবেষণায় পূর্ব ব্যবহৃত সাতটি পাত্রের মধ্যে ছয়টিতে রান্না করা ভাতেও সিসার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। পাত্র থেকে খাবারে কি পরিমাণে সিসা মিশে তা নির্ভর করে খাবারের পাত্র কীভাবে ধোয়া হয়েছে তার ওপর।

গবেষণায় দেখা গেছে, নতুন পাত্র স্টিলের তারের মাজনি দিয়ে ঘষে পরিষ্কার করলে, না ঘষে ব্যবহারের তুলনায় প্রায় পাঁচ গুণ বেশি সিসা খাবারে মিশেছে। ধাতব খুন্তি দিয়ে খাবার নাড়লেও সিসা মিশে যাওয়ার পরিমাণ বেড়েছে। সিসা একটি বিষাক্ত ধাতু, যা শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করতে পারে। এ ঝুঁকি কমাতে নিরাপদ রান্নার পাত্র তৈরি এবং পরিবার পর্যায়ে এ বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন গবেষকরা।

গবেষকদের ভাষ্য, বাংলাদেশে পুরোনো অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়ি-পাতিলের বদলে নতুন পাত্র নেওয়া কিংবা পুরোনো কাপড়ের সঙ্গে পাত্র বিনিময় করার প্রচলন রয়েছে। গবেষণাটিতে সরাসরি এই বিনিময়প্রথা নিয়ে কাজ না হলেও এর ফলাফল থেকে বোঝা যায়, নতুন বা দেখতে চকচকে হলেই একটি রান্নার পাত্র নিরাপদ, এমনটি ভাবার সুযোগ নেই। স্থানীয়ভাবে তৈরি অনেক অ্যালুমিনিয়ামের পাত্র পুরোনো স্ক্র্যাপ ধাতু গলিয়ে তৈরি করা হয়।

এসব ধাতু ঠিকভাবে পরীক্ষা না করলে তৈরি পাত্রে সিসা থেকে যেতে পারে। সিসার সংস্পর্শ শিশুদের শেখার ক্ষমতা ও আচরণের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, রক্তে সিসার এমন কোনো মাত্রা নেই, যাকে সম্পূর্ণ নিরাপদ বলা যায়।

গবেষণাটি ন্যাচারের জার্নাল অব এক্সপোজার সায়েন্স অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল এপিডেমিওলজিতে প্রকাশিত হয়েছে। এতে স্থানীয়ভাবে তৈরি অ্যালুমিনিয়ামের পাত্র থেকে রান্না করা খাবারে কতটা সিসা মিশতে পারে, তা পরীক্ষা করা হয়েছে।

পাশাপাশি সিসা মিশে যাওয়ার পরিমাণে খাবারের অম্লতা (অ্যাসিডিটি), পাত্র পরিষ্কার করার পদ্ধতি এবং রান্নার ধরন কী ধরনের প্রভাব ফেলে, সেটিও দেখা হয়েছে। গবেষকরা বাংলাদেশের পরিবার থেকে সংগ্রহ করা সাতটি ব্যবহৃত পাত্র এবং বাজার থেকে কেনা ২০টি নতুন পাত্র পরীক্ষা করেন। প্রথমে পাত্রগুলোর ধাতুতে সিসার উপস্থিতি ও পরিমাণ পরীক্ষা করা হয়। এরপর পাত্রগুলো গরম করে তাতে সাদা ভাত ও খিচুড়ি রান্না করা হয়।

সবশেষে পরীক্ষাগারে বিশেষ পরীক্ষার মাধ্যমে পানি ও রান্না করা খাবারে সিসার পরিমাণ মাপা হয়। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় হিউম্যান অ্যান্ড প্ল্যানেটারি হেলথের প্রজেক্ট আনলেডেডের পরিচালক ড. জেনা ফরসিথ বলেন, ‘আমরা রান্নার পাত্র এবং সেই পাত্রে রান্না করা খাবার-দুটোতেই সিসার পরিমাণ পরীক্ষা করেছি। এর মাধ্যমে বোঝার চেষ্টা করেছি, প্রতিদিনের রান্নায় ব্যবহৃত একটি সাধারণ পাত্র কীভাবে মানুষের সিসার সংস্পর্শে আসার কারণ হতে পারে।’

আইসিসিডিআর,বির এনভায়রনমেন্টাল হেলথ অ্যান্ড ওয়াশ এর অ্যাসিস্ট্যান্ট সায়েন্টিস্ট ড. জেসমিন সুলতানা বলেন, ‘পরিবারগুলো অনেক যত্ন নিয়ে প্রতিদিন ভাত ও খিচুড়ি রান্না করে। সেই খাবারে রান্নার পাত্র থেকেই সিসা মিশছে কিনা, তা নিয়ে তাদের দুশ্চিন্তা করতে দেওয়া উচিত নয়।

বিশেষ করে ছোট শিশুদের খাবার তৈরির জন্য খাদ্য নিরাপত্তার দিক থেকে পরীক্ষিত রান্নার পাত্র ব্যবহার করা উচিত। এসব পাত্র ব্যবহার করতে হলে স্টিলের তারের স্ক্রাবার দিয়ে ঘষা এড়িয়ে চলা এবং তাতে টক বা অম্লীয় খাবার রান্না না করাই ভালো। তবে মনে রাখতে হবে, এসব সতর্কতা দূষিত পাত্রকে পুরোপুরি নিরাপদ করে না।’

ড. জেনা ফরসিথ আরও বলেন, ‘সিসা দেখা যায় না, এর কোনো গন্ধ বা স্বাদও নেই। তাই দেখতে একদম ভালো একটি পাত্র থেকেও পরিবারের খাবারে সিসা মিশতে পারে। কিন্তু সাধারণভাবে দেখে পরিবারের পক্ষে বোঝার কোনো উপায় নেই কোন পাত্রটি নিরাপদ।’

গবেষকদের মতে, নিরাপদ রান্নার পাত্র নিশ্চিত করতে বিদ্যমান মান ও নীতিমালা পর্যালোচনা করা, স্ক্র্যাপ ধাতু পরীক্ষা করা এবং তৈরি পাত্র থেকে খাবারে সিসা মিশছে কিনা, তা যাচাই করার ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। পাশাপাশি ক্ষুদ্র উৎপাদকদের নিরাপদ কাঁচামাল ব্যবহার ও পরীক্ষার সুযোগ করে দেওয়াও জরুরি।

আইসিসিডিআর,বির এনভায়রনমেন্টাল হেলথ অ্যান্ড ওয়াশ এর প্রজেক্ট কো-অর্ডিনেটর ড. মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষকে রান্নার পাত্র থেকে খাবারে সিসা মিশে যাওয়ার বিষয়ে স্পষ্ট নিরাপত্তা মান নির্ধারণের আহ্বান জানাচ্ছি।

একই সঙ্গে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনকে (বিএসটিআই) রান্নার পাত্রের জন্য সিসা-সংক্রান্ত নিরাপত্তা মান তৈরি ও কার্যকর করার অনুরোধ করছি।’ তিনি আরও বলেন, উৎপাদন প্রক্রিয়ার উন্নয়ন এবং যথাযথ তদারকির মাধ্যমে পরিবারগুলোকে এ ধরনের প্রতিরোধযোগ্য ঝুঁকি থেকে সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব। গবেষকরা জানিয়েছেন, এটি পরীক্ষাগারে পরিচালিত একটি ছোট পরিসরের গবেষণা।

গবেষণায় শিশুদের সিসা গ্রহণের যে পরিমাণ উল্লেখ করা হয়েছে, তা সরাসরি শিশুদের পরীক্ষা করে পাওয়া নয়; বরং একটি হিসাবের মডেলের মাধ্যমে অনুমান করা হয়েছে। তাই বিভিন্ন ধরনের রান্নার পাত্র এবং দৈনন্দিন রান্নার অভ্যাস নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন। গবেষণাটি স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কিং সেন্টার অন গ্লোবাল ডেভেলপমেন্টের সহায়তায় পরিচালিত হয়েছে।

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

আইসিসিডিআর,বি-স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা প্রতি কেজি সাদা ভাতে ৩০৫ মাইক্রোগ্রাম সিসা

প্রতি কেজি সাদা ভাতে ৩০৫ মাইক্রোগ্রাম সিসা

কচুরিপানার নতুন পরিচয়

কচুরিপানার নতুন পরিচয়

রহস্যজনক ভূমিকায় বিআইডব্লিউটিএ পদ্মার ছয় মৌজায় অবাধে বালু ও মাটি লুট

পদ্মার ছয় মৌজায় অবাধে বালু ও মাটি লুট

ঢাকা জেলা পরিষদ টাওয়ার নির্মাণে দুর্নীতি তদন্তে দুদককে সুপারিশ

নির্মাণে দুর্নীতি তদন্তে দুদককে সুপারিশ

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম