বাকলিয়া এখন ‘ক্রাইম জোন’, দাপিয়ে বেড়াচ্ছে মোরশেদ ও সোবহান গ্রুপ
Advertisement
আহমেদ মুসা, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: ০৫ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:২৯ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
চট্টগ্রামের বাকলিয়া এখন ‘ক্রাইম জোনে’ পরিণত হয়েছে। দিনদুপুরে চলে গোলাগুলি, হামলা-পাল্টা হামলা। বিশেষ করে দক্ষিণ বাকলিয়া এলাকাটি আঁধার নামার সঙ্গে সঙ্গে অপরাধীদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। এলাকাটিতে গ্রুপের সদস্যদের বেশিরভাগই বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নানা-পদপদবি ধারণ করে।
বালু মহাল দখল-বেদখল, আধিপত্য বিস্তার, মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ, ডিস ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ, ইন্টারনেট সংযোগ নিয়ে বিরোধ, বিরোধপূর্ণ জায়গা দখল-বেদখল নিয়েই মূলত গ্রুপগুলো প্রায়ই দ্বন্দ্ব-সংঘাতে জড়াচ্ছে।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের তালিকাভুক্ত এক সময়ের শীর্ষ সন্ত্রাসী মোরশেদ খান এবং তার শিষ্য সোবহান গ্রুপে বিভক্ত হয়ে এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা চালাচ্ছে। তাদের অত্যাচারে সাধারণ মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন।
সর্বশেষ এই দুই গ্রুপ শনিবার রাতে বাকলিয়া থানার ময়দার মিল এলাকায় গোলাগুলিতে লিপ্ত হয়। এতে এক শিশুসহ অন্তত ৫ জন গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হয়েছেন। পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে অভিযান চালিয়ে গ্রুপের ৫ সদস্যকে আটক করেছে। একটি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করেছে। তবে এর পরও এলাকায় বিরাজ করছে আতঙ্ক।
পুলিশ ও স্থানীয়রা জানান, ২১ বছর আগেও মোরশেদ খান ছিলেন এলাকার মূর্তিমান আতঙ্ক। র্যাব পুলিশের অভিযানে ২০২৪ সালে ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর আবারও তিনি এলাকায় ফিরে এসেছেন। এরপর থেকে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও মাদক-বাণিজ্য করছেন। ব্যবসায়ীরা তার কাছ থেকে নিস্তার পাচ্ছেন না। প্রতিপক্ষ গ্রুপের সঙ্গে সংঘাত-সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছেন।
পুলিশের তথ্যমতে, মোরশেদ খান ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা। তার পিতার নাম মহসিন খান (প্রয়াত)। বাকলিয়া ছাত্রদলের আহ্বায়ক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯২ সালে বাকলিয়া ছাত্রলীগ নেতা আছু হত্যাকাণ্ডে প্রথম তার নাম আসে। সরাসরি এ হত্যাকাণ্ডে অংশ নেওয়ার ঘটনায় তার বিরুদ্ধে মামলা হয়। এতে তার যাবজ্জীবন সাজাও হয়। কেবল এই মামলাই নয়; দক্ষিণ বাকলিয়ার রুবেল সেন হত্যা, শমসের আলী হত্যা মামলাও ছিল তার বিরুদ্ধে। সন্ত্রাস দমনে করা একটি মামলায় ৫ বছর, জননিরাপত্তা আইনের মামলায় ১৫ বছরসহ বিভিন্ন মামলায় তার সাজা হয়। ছাত্রদল ও বিএনপির রাজনীতি করে বিএনপি সরকারের সময়েই সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, অপহরণসহ বেপরোয়া অপকর্মের কারণে একাধিকবার জেল খাটেন মোরশেদ খান।
সর্বশেষ ২০০৩ সালে অপারেশন ক্লিনহার্টের সময় যৌথবাহিনীর হাতে গ্রেফতার হয়ে এক বছরের মতো জেল খাটেন। জেল থেকে বের হয়ে আবারও অপকর্ম করার কারণে তাকে গ্রেফতারে অভিযান চালায় র্যাব। ২০০৪ সালের শেষের দিকে বাকলিয়ায় র্যাবের অভিযানের সময় কচুরিপানাভর্তি পুকুরে ডুব দিয়ে র্যাবের হাত থেকে রক্ষা পান মোরশেদ খান।
ওই সময় ছাত্রদল ক্যাডার ইকবাল ওরফে পাথরঘাটা ইকবাল, ছাত্রলীগ ক্যাডার মহিম উদ্দিন, শিবির ক্যাডার হুমায়ুনসহ শীর্ষ একাধিক সন্ত্রাসী র্যাবের ক্রসফায়ারে নিহত হওয়ার পর ভয়ে মোরশেদ খান শহর ছেড়ে আত্মগোপনে চলে যান।
২০২৪ সালের আগস্টে সরকার পরিবর্তনের পর আবার এলাকায় আসেন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় কিছুটা নিয়ন্ত্রিত থাকলেও বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। এখন আবারও শুরু করেন চাঁদাবাজি। বহদ্দারহাট থেকে কর্ণফুলী শাহ আমানত সেতু পর্যন্ত যেসব গার্মেন্টস রয়েছে সেসব গার্মেন্টসের ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
কর্ণফুলী সেতু এলাকার বাস টার্মিনাল ছাড়াও দক্ষিণ বাকলিয়া, পূর্ব বাকলিয়া, পশ্চিম বাকলিয়া, কোতোয়ালি ও চান্দগাঁওয়ের কিছু অংশে আধিপত্য বিস্তার করেন। এসব এলাকায় নতুন বাড়ি করলে, জমি বেচাকেনা হলে তাকে দিতে হয় চাঁদা। এই কয়েক মাসে বেপরোয়া চাঁদাবাজির মাধ্যমে কয়েক কোটি টাকার মালিক বনে যান মোরশেদ খান। তুলাতলি এলাকায় অবস্থিত নিড গার্মেন্টসের দক্ষিণ বাকলিয়ার তক্তারপোল, চর চাক্তাই স্কুল গলি, বাদামতলী মোড়, জামাই বাজার, ইছহাকের পোল, চাক্তাই নয়া মসজিদ, খাজুরতলীসহ ১০-১২টি স্পটে হয় জমজমাট মাদক ব্যবসা।
একইভাবে বাকলিয়া থানা পুলিশের তালিকাভুক্ত সোবহান এলাকার শীর্ষ সন্ত্রাসীদের মধ্যে একজন। এক সময় মোরশেদ খানেরই শিষ্য ছিলেন তিনি। তার বিরুদ্ধে হত্যা, মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি, আধিপত্য বিস্তার নিয়ে গোলাগুলিসহ একাধিক অভিযোগ রয়েছে। তার পিতার নাম মৃত নুরুল ইসলাম। বাকলিয়া থানায় দুইটি হত্যা মামলাসহ ১৭টি মামলা রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
গত বছরের আগস্ট মাসে বাকলিয়া থানার কল্পলোক আবাসিক এলাকা থেকে মহিউদ্দিন নামে এক মাদক ব্যবসায়ীর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এরপর সুমন ও আসিফ নামে দুইজনকে গ্রেফতার করে। এ মামলার দুই আসামি আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন। তাদের জবানবন্দিতেই হত্যার পরিকল্পনা, অর্থ জোগানদাতা ও অস্ত্র সরবরাহকারী হিসেবে সন্ত্রাসী আবদুস সোবহানের নাম উঠে আসে। এরপর পুলিশ অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেফতার করে। গত কয়েক মাস আগে কারাগার থেকে জামিনে বেরিয়ে এসে আবারও নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়েছে সন্ত্রাসী সোবহান।
বাকলিয়া থানার ওসি মোহাম্মদ সোলাইমান যুগান্তরকে জানান, সন্ত্রাসীদের কোনো দল নেই। দলের নাম ব্যবহার করলেও পুলিশ তাদের সন্ত্রাসী হিসেবেই বিবেচনা করে। এলাকায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে গোলাগুলিতে লিপ্ত হচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসা, দখল ও চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। ময়দার মিলে শনিবার রাতে দুই গ্রুপ গোলাগুলি করে। পুলিশ অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রুপের ৫ জনকে আটক করেছে। একটি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করেছে। তাদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।
