ডেপুটি স্পিকারের উদ্যোগে অনাথালয়ের শিশুরা পেল সুচিকিৎসা
Advertisement
দুর্গাপুর (নেত্রকোনা) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৪ জুন ২০২৬, ১১:০১ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
অথৈ, নিপা, অরন্য, লিচুয়েন, মৌমিতা, শ্রেয়া দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা অনাথ শিশুর বসবাস দুর্গাপুর উপজেলার চণ্ডীগড় গ্রামের মানবকল্যাণকামী অনাথালয়ে। নানা ধর্মের এই শিশুদের কারো মা নেই, কারো বাবা। আবার কারও পৃথিবীতে আপন বলতে কেউ নেই।
কিন্তু আশার কথা, এই অসহায়-দুঃখী শিশুরা এখানে থেকে লেখাপড়ার করে যাচ্ছে। কারিগরি শিক্ষায় দক্ষতা অর্জন করছে। স্বপ্ন দেখছে মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকার।
ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও শ্রমে গড়ে ওঠা ‘অনাথ আশ্রমের কল্যাণে অন্যান্য শিশুর মতোই বেড়ে উঠছে এরা। আশ্রমের প্রতিষ্ঠাতা নিত্যানন্দ গোস্বামী নয়ন ২০২০ সনের ৭ সেপ্টেম্বর রাতে হঠাৎ মৃত্যুবরণ করায় অকুল সাগরে ভাসছে অনাথালয়ের শিশুরা। খেয়ে না খেয়ে দিন কাটছে তাদের। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সদস্যদের প্রাপ্ত চাঁদায় চলত আশ্রমটি।
নিত্যানন্দ গোস্বামী হঠাৎ মৃত্যুবরণ করায় অনাথ শিশুদের নিয়ে খুবই কষ্টে দিনাতিপাত করছেন ওনার স্ত্রী আশ্রম মাতা নিশা দেবী।
এরই মাঝে গত কিছুদিন ধরে আশ্রমে থাকা ১২০ জন শিশুদের মাঝে দেখা দিয়েছে স্ক্যাবিস রোগ। আর্থিক সংকট থাকার পরেও ডাক্তার দেখিয়ে ওষুধ সেবন করিয়েছেন অনাথালয়ের পক্ষ থেকে। দু‘বেলা যেখানে ভালো খাবার জুটছে না, সেখানে উন্নত চিকিৎসা করানো সম্ভব হচ্ছিল না।
এ বিষয়টি স্থানীয় সাংবাদিক ও আশ্রমের পক্ষ থেকে জানতে পারেন জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ও নেত্রকোনা-১ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। পরবর্তীতে অনাথ শিশুদের সরকারিভাবে সুচিকিৎসা করানোর উদ্যোগ নেন তিনি। আশ্রমের অনাথ শিশুদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করে দিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।
এরই পরিপ্রেক্ষিতে রোববার (১৪ জুন) দুপুরে নেত্রকোনা জেলা স্বাস্থ্য দপ্তরের আয়োজনে সরকারি ভাবে অনাথ শিশুদের দেওয়া হয় বিনামূল্যে ওষুধ ও স্বাস্থ্যসেবা। এছাড়া স্বাস্থ্য পরিচর্যা বিষয়ে কিশোরীদের দেওয়া হয় নানাবিধ স্বাস্থ্য পরামর্শ। অনাথ শিশুদের এ সেবা অব্যাহত থাকলে বলে জানান সিভিল সার্জন ডা. গোলাম মাওলা।
দশম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী নিপা মারমা বলেন, হঠাৎ করে আমাদের এমন রোগ দেখা দিয়েছে। টাকার অভাবে আমাদের আগের মতো চিকিৎসা করানো হয় না। আগের মতো প্রাইভেট পড়তে পারি না। বই-খাতা-কলমও আগের মতো দেওয়া হয় না। উৎসবে নতুন জামা তো দুরের কথা ভালো-মন্দ খেতেও পারি না। টাকার অভাবেই এমন কিছু হচ্ছে, দেশের বিত্তবানদের সহায়তা চেয়েছেন এই কিশোরী।
অনাথালয়ের কো-অর্ডিনেটর সাগর দেবনাথ বলেন, বেশ কিছুদিন ধরে অনাথালয়ের কয়েকজন শিশুদের দুই হাতের আঙুলের মাঝে লাল ফোস্কার মতন উঠছে। প্রথমে বিষয়টি সহনীয় পর্যায় থাকলেও পরবর্তীতে এমন বড় আকারে ধারণ করবে বুঝতে পারি নাই। পরে উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে সামান্য ওষুধ আনলেও তা চাহিদার তুলনায় ছিল সামান্য। পরে এ নিয়ে ডেপুটি স্পীকারের সঙ্গে কথা বললে তিনি দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। আমি ও আশ্রমের শিশুরা ডেপুটি স্পিকার স্যারের প্রতি কৃতজ্ঞ।
এ নিয়ে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যক্ষ শহীদুল্লাহ খান বলেন, আজকে সরকারিভাবে অনাথ শিশুদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করিয়ে ব্যারিস্টার কায়সার কামাল যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তা সত্যিই প্রশংসার দাবী রাখে। এছাড়া তিনি ব্যক্তিগত অর্থায়নে অসচ্ছল, হতদরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের সহায়তা, শিক্ষাক্ষেত্রে আর্থিক অনুদান, কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়তা, অসুস্থ ও দুর্ঘটনাগ্রস্ত মানুষের চিকিৎসা, দৃষ্টিহীনদের চিকিৎসা করানো, আশ্রয়হীনদের জন্য ঘর বিতরণ করে সাধারণ মানুষের যে আস্থা অর্জন করেছেন তা আর কোনো সংসদ সদস্যই করতে পারেননি।
শিশুদের উদ্দ্যেশ্যে ডা. গোলাম মাওলা বলেন, ধন্যবাদ ডেপুটি স্পীকার স্যারকে আশ্রমের শিশুদের চিকিৎসার উদ্যোগ নেওয়ার জন্য।
আশ্রমের শিশুদের উদ্দ্যেশ্যে তিনি বলেন, এটা একটি চর্মরোগ। ভয়ের কিছু নেই, আমরা তোমাদের জন্য যে ওষুধগুলো দিয়ে যাচ্ছি; তা নিয়মিত সেবন করবে এবং সব বিছানাপত্র ও তোমাদের জামা-কাপড় জীবাণুমুক্ত করে ব্যবহার করবে। পরবর্তীতে দুর্গাপুর হাসপাতাল থেকে তোমাদের দেখভাল করবে। যেকোনো সমস্যায় জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ তোমাদের পাশে থাকবে।
প্রতিষ্ঠানের পরিচালক নিশা দেবী বলেন, প্রতিষ্ঠানটির চারপাশে আজও দেওয়া হয়নি নিরাপত্তা বেষ্টনী। কয়েকটি পোষা কুকুরই আমাদের নিরাপত্তা প্রহরীর দায়িত্ব পালন করছে। ছেলে-মেয়ের পড়ার ঘর, ডাইনিং রুম, নিজস্ব পরিবহন প্রভৃতি মেরামত জরুরি। ভবিষ্যতে একটি ভোকেশনাল ট্রেনিং সেন্টার করারও পরিকল্পনাও আমাদের রয়েছে। কিন্তু টাকার জন্য কোনো কিছুই করতে পারছি না।
অনাথালয়ের উন্নতি ও শিশুদের মুখে দুমুঠো খাবার তুলে দেওয়ার জন্য অত্র এলাকার কৃতিসন্তান, ডেপুটি স্পীকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল এমপিসহ দেশের বৃত্তবান ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে অনাথ শিশুদের সহায়তা করতে এগিয়ে আসার অনুরোধ জানিয়েছেন অনাথমাতা নিশা দেবী।
এ সময়, জেলা আধুনিক সদর হাসপাতালের চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. আসাদুজ্জামান, উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগের আবাসিক মেডিকেল অফিসার এএসএম তানজিরুল ইসলাম, মেডিকেল অফিসার ডা. রাকিবুল ইসলাম, সিনিয়র স্টাফ নার্স কল্যাণ কুমার বাউল, ইপিআই কর্মকর্তা সুব্রত চক্রবর্তী, স্বাস্থ্য সহকারী আনোয়ার হোসেন, অনাথালয়ের চিকিৎসক যোবায়ের হোসেন উপস্থিত ছিলেন।
