লোহাগাড়ায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়
শিক্ষার্থী ৭৮, নিয়মিত উপস্থিত ১১, উপবৃত্তি পায় ৩৮ জন
Advertisement
লোহাগাড়া (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৪ জুন ২০২৬, ০২:৩৩ পিএম
ছবি: যুগান্তর
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
চট্টগ্রামের লোহাগাড়ার একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৭৮ শিক্ষার্থীর মধ্যে নিয়মিত উপস্থিতির সংখ্যা মাত্র ১০ থেকে ১২ জন। নিয়মিত উপস্থিতি কম হলেও সরকার প্রদত্ত মাসিক উপবৃত্তি পাচ্ছে ৩৮ শিক্ষার্থী।
সম্প্রতি উপজেলার কলাউজান ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের পশ্চিম কলাউজান এলাহী মোহাম্মদী (স.) সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এ চিত্র দেখা গেছে। এছাড়া ১৯৭০ সালে প্রতিষ্ঠিত উপজেলার অন্যতম প্রাচীন এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটিতে অব্যবস্থাপনা ও নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।
সোমবার (২২ জুন) বিদ্যালয়টিতে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, চার শিক্ষকের মধ্যে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক খালেদা আক্তারসহ দুজন অনুপস্থিত। পাঁচটি শ্রেণিকক্ষের মধ্যে তিনটিতে ঝুলছে তালা। একটি কক্ষ পরিত্যক্ত আসবাবপত্রের গুদাম। ভবনের বিভিন্ন স্থানের পলেস্তারা খসে পড়ছে, এমনকি অফিস কক্ষে সাত বীরশ্রেষ্ঠের ছবিও পড়ে আছে অযত্নে।
মধ্যাহ্ন বিরতির পর দ্বিতীয় শিফটের ক্লাস শুরু হওয়ার নির্ধারিত সময় দুপুর ২টা হলেও ২টা ৪৫ মিনিটে বিদ্যালয়ে আসে মাত্র চার শিক্ষার্থী। পরে সহকারী শিক্ষক রেজাউল হক তিন শ্রেণির শিক্ষার্থীদের একত্র করে একটি কক্ষে পাঠদান শুরু করেন।
বিদ্যালয়ের পাশে লাগোয়া বাড়ির এক নারী বাসিন্দা জানান, দ্বিতীয় শিফটে প্রায়শই কোনো শিক্ষার্থীই আসে না। প্রথম শিফটেও উপস্থিতি ৮ থেকে ১০ জনের বেশি হয় না। অনেক সময় একজন শিক্ষক ছাড়া অন্য কাউকে বিদ্যালয়ে দেখা যায় না।
বেলা ৩টার দিকে বিদ্যালয়ে আসেন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক খালেদা আক্তার। তিনি শিক্ষা অফিসে যাওয়ার কথা বললেও উপজেলা শিক্ষা অফিসের একটি সূত্র জানায়, সেদিন তিনি শিক্ষা অফিসে যাননি। বিস্ময়কর বিষয় হলো, বিদ্যালয়ে মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা সম্পর্কেও স্পষ্ট তথ্য দিতে পারেননি তিনি।
তার দাবি, শিক্ষার্থী প্রায় ৭৮ জন, যার মধ্যে উপবৃত্তি পাচ্ছে ৩৮ জন। অথচ স্থানীয়দের দাবি, দৈনিক উপস্থিতি গড়ে ১০ থেকে ১২ জনের বেশি নয়। ফলে উপবৃত্তির তালিকায় এতো শিক্ষার্থীর অন্তর্ভুক্তি নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নীতিমালা অনুযায়ী, ‘নিয়মিত উপস্থিতি ও শ্রেণি কার্যক্রমে অংশগ্রহণ’ উপবৃত্তি পাওয়ার অন্যতম শর্ত। দীর্ঘদিন অনুপস্থিত বা ঝরে পড়া শিক্ষার্থীরা এ সুবিধা পাওয়ার যোগ্য নয়।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১৫ সালে সহকারী শিক্ষক হিসেবে এ বিদ্যালয়ে যোগদান করেন খালেদা আক্তার। ২০২৪ সালে তিনি ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পান। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সঙ্গে যোগসাজশে বিভিন্ন বরাদ্দের অর্থে অনিয়ম করা হচ্ছে। প্রতিবাদ করতে গেলে তার ছেলে ও অনুসারীদের মাধ্যমে ভয়ভীতি প্রদর্শনেরও অভিযোগ রয়েছে।
এর মধ্যে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের স্লিপ বরাদ্দের হিসাব পর্যালোচনায় বেশকিছু অসঙ্গতি পাওয়া গেছে। কাগজে-কলমে ১২টি এলইডি বাল্ব কেনা দেখানো হলেও বিদ্যালয়ে তার কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। ৯৫ টাকার হারপিকের দাম দেখানো হয়েছে ৩০০ টাকা, ৬০ টাকার সাবান দেখানো হয়েছে ২০০ টাকা। একই হাতের লেখায় তৈরি করা হয়েছে একাধিক ক্যাশ মেমো।
আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, যে প্রতিষ্ঠান থেকে দুই দফায় কম্পিউটার মেরামতের বিল দেখানো হয়েছে, সেখানে আদৌ কম্পিউটার মেরামতের কোনো ব্যবস্থা নেই বলে জানা গেছে। এমনকি বিদ্যালয়ের জন্য বরাদ্দ পাওয়া কম্পিউটার, প্রিন্টার ও প্রজেক্টরের কোনো অস্তিত্ব বিদ্যালয়ে পাওয়া যায়নি। অথচ এসব যন্ত্রপাতি মেরামতের জন্য গত বছর প্রায় ৭ হাজার টাকার বিল দেখানো হয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, উপজেলার অন্যতম প্রাচীন এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে বাঁচাতে অবিলম্বে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় এনে শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা জরুরি।
ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক খালেদা আক্তার জানান, কম্পিউটারসহ সরকারি মালামাল তার বাড়িতে রাখা আছে। তবে সরকারি সম্পদ ব্যক্তিগত বাসভবনে সংরক্ষণের কোনো বিধান আছে কি না, সে বিষয়ে তিনি কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি জানান, একসময় এ বিদ্যালয়ে দুই থেকে তিন শতাধিক শিক্ষার্থী ছিল। নিয়মিত পাঠদান না হওয়া ও নানা অনিয়মের কারণে অভিভাবকরা সন্তানদের অন্য বিদ্যালয়ে ভর্তি করাচ্ছেন। ফলে ধীরে ধীরে শিক্ষার্থীশূন্য হয়ে পড়ছে প্রতিষ্ঠানটি।
এ বিষয়ে আরও তথ্যের জন্য খালেদা আক্তারের মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে তার ছেলে পরিচয়ে এক ব্যক্তি ফোন রিসিভ করে প্রতিবেদককে শাসিয়ে শিক্ষা অফিসের অনুমতি নিয়ে কথা বলতে বলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
এ বিষয়ে লোহাগাড়া উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ইবনে মাসুদ রানা বলেন, অভিযোগগুলো তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। উপবৃত্তির বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হবে।
লোহাগাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বায়েজিদ বিন আখন্দ বলেন, বিদ্যালয়ের অনিয়ম সংক্রান্ত তথ্য বা অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
