সমুদ্রে বিলীন হাফেজ সায়েমের স্বপ্ন
Advertisement
মো. আবু তালেব, হাটহাজারী
প্রকাশ: ২৮ জুন ২০২৬, ০৭:৫১ পিএম
মোহাম্মদ নূর প্রকাশ সায়েম চৌধুরী
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
স্বপ্ন ছিল সফল ব্যবসায়ী হয়ে পরিবারের হাল ধরবেন। সেজন্য লেখাপড়ার পাশাপাশি ব্যবসাও করতেন কুরআনে হাফেজ মোহাম্মদ নূর প্রকাশ সায়েম চৌধুরী; কিন্তু তার সেই স্বপ্ন বিলীন হয়ে গেছে সমুদ্রের লোনা পানিতে।
২০২২ সালে চট্টগ্রামের সিআরবিতে (সেন্ট্রাল রেলওয়ে বিল্ডিং) বাইসাইকেল রাইডিংয়ে গিয়ে মোহাম্মদ নূর প্রকাশ সায়েম চৌধুরীর সঙ্গে মো. আরমানের পরিচয়। সময়ের ব্যবধানে তাদের পরিচয় বন্ধুত্বে রূপ নেয়। একসঙ্গেই চলাফেরা ও বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে ঘোরাঘুরি করতেন তারা।
এর মধ্যে শনিবার (২৭ জুন) দুপুর সাড়ে ১২টায় দুই বন্ধু মিলে একসঙ্গে মোটরসাইকেলযোগে কক্সবাজার পৌঁছান। তারা মেরিন ড্রাইভ হয়ে উখিয়া ইনানী সৈকতের দক্ষিণ পাশে নৌবাহিনীর জেটি সংলগ্ন (পালংকী রেস্তোরাঁর সামনে) সৈকতে গোসলে নামেন। এ সময় উত্তাল সাগরে ঢেউয়ের ধাক্কায় সায়েম নিখোঁজ হলেও অপর বন্ধু আরমান প্রাণে রক্ষা পান। প্রায় ২২ ঘণ্টা পর মেরিন ড্রাইভের রেজু ব্রিজের উত্তর পাশের একটি খাল থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।
রোববার (২৭ জুন) দুপুরে গণমাধ্যমকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পান্না আক্তার। তিনি জানান, রোববার সকাল ১০টার দিকে উপজেলার সোনারপাড়ার রেজু খাল ব্রিজ এলাকার প্যারাবন থেকে ইনানী সমুদ্র সৈকতে গোসলে নেমে নিখোঁজ হওয়া সায়েমের লাশ উদ্ধার করা হয়।
তিনি আরও বলেন, স্থানীয় ফায়ার সার্ভিস, কোস্টগার্ড এবং বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির কর্মীরা যৌথভাবে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করে লাশটি উদ্ধার করেন। পরে লাশটি আইনগত প্রক্রিয়ার জন্য রামু থানার পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তারা প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে নিহতের পরিবারের কাছে লাশটি হস্তান্তর করেছে।
নিহত মো. সায়েম (২২) চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার শিকারপুর ইউনিয়নের কুয়াইশ ভরাপুকুর রাহাত খান চৌধুরী বাড়ির বাসিন্দা মো. ইকবালের একমাত্র পুত্র। সায়েম চার ভাইবোনদের মধ্যে দ্বিতীয়। এছাড়া প্রাণে রক্ষা পাওয়া নিহত সায়েমের বন্ধু আরমান রাউজান উপজেলার নোয়াপাড়া ইউনিয়নের কচুখাইন এলাকার ইন্না আমিনের বাপের বাড়ির মো. কামালের পুত্র। তিনি চট্টগ্রাম শহরে ষোলশহর দুই নম্বর গেট এলাকায় অনলাইন খাবার অর্ডারের প্ল্যাটফর্ম ফুডপান্ডায় কাজ করেন।
নিহত সায়েমের বন্ধু মো. আরমান বলেন, আমার বন্ধু সায়েম ভ্রমণ পিপাসু ছিল। ২০২২ সালে চট্টগ্রামের সিআরবিতে তার সঙ্গে আমার পরিচয়। গত শুক্রবার ভোরে আমরা ৫টি মোটরসাইকেলযোগে ১০ বন্ধু বান্দরবান ভ্রমণে গিয়েছিলেন। এর মধ্যে ৮ জন ওই দিন ফিরে গেলেও আমি ও সায়েম কক্সবাজার বেড়াতে যাই। দুপুরের দিকে পালংকী রেস্তোরাঁর সামনে সৈকতে গোসল করতে নামি।
এর আগে দুইজনে সমুদ্রের তীরে দাঁড়িয়ে মোবাইল ফোনে বেশ কিছু ছবি ধারণ করে। এরপর বন্ধু সায়েম সৈকতে গোসলে নামলে হঠাৎ বড় একটি ঢেউয়ের ধাক্কায় সায়েম গভীর সাগরের দিকে ভেসে যায়। নির্জন সৈকতে তখন লাইফগার্ড, পুলিশ কিংবা লোকজনের তেমন উপস্থিতিও ছিল না। পরে আরমানের চিৎকার ও কান্নাকাটি শুনে আশপাশের লোকজন ছুটে আসেন।
নিহতের চাচা মো. আলমগীর চৌধুরী অশ্রুসিক্ত নয়নে বলেন, আমার ভাইপো সায়েম খুবই পরিশ্রমী, কর্মঠ এবং ভ্রমণ পিপাসু ছিল। সে একজন কুরআনে হাফেজ। পড়াশোনার পাশাপাশি সে চট্টগ্রামের চান্দগাঁও মৌলভী পুকুরপাড় এলাকায় নূর মেডিকো নামে একটি ওষুধের ফার্মেসির ব্যবসা করত। সে বুড়িশ্চর জিয়াউল উলুম কামিল মাদ্রাসা থেকে আগামী মাসের দুই তারিখ থেকে অনুষ্ঠিতব্য আলিম পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার কথা ছিল। অথচ সে কক্সবাজার বেড়াতে গিয়ে সমুদ্র সৈকতে গোসল করতে নেমে আজ লাশ হয়ে বাড়ি ফিরছে; যা কখনও মেনে নিতে পারছি না।
এদিকে কক্সবাজারে বেড়াতে গিয়ে সমুদ্র সৈকতে গোসল করতে নেমে মৃত একমাত্র পুত্রসন্তান সায়েমকে হারিয়ে তার মা শিরিন আক্তার পাগলপ্রায়। নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে দিয়ে প্রিয় পুত্রের শোকে বিলাপ করতে করতে মুহ্যমান হয়ে পড়েছেন। মাঝে মাঝে তিনি সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়েছেন। জ্ঞান ফিরলে তিনি স্তব্ধ ও বিষণ্ণ হয়ে পুত্র বড় হয়ে একজন সফল ব্যবসায়ী হওয়ার স্বপ্নের কথা বলে বিলাপ করতে দেখা গেছে।
সায়েমের মারা যাওয়ার খবর তার গ্রামের বাড়িতে ছড়িয়ে পড়লে কান্নায় ভেঙে পড়ে পুরো পরিবার। এর মধ্যে তার লাশ উদ্ধার হওয়ার পর মৃতদের বাড়িতে আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা ভিড় করতে দেখা গেছে।
