প্রতিবন্ধী নারীকে ধর্ষণচেষ্টা, গ্রাম্যসালিশে অভিযুক্তকে জুতাপেটা
সাঁথিয়া (পাবনা) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৩ জুলাই ২০২৬, ০৯:৪৭ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
পাবনার সাঁথিয়ায় এক বুদ্ধি ও বাকপ্রতিবন্ধী নারীকে (৩০) ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। তবে এই গুরুতর ফৌজদারি অপরাধের বিষয়টি পুলিশকে না জানিয়ে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে গ্রাম্য সালিশে ধর্ষণচেষ্টার অভিযুক্ত ওই ব্যক্তিকে ২০টি জুতাপেটার পর মীমাংসার অভিযোগ উঠেছে।
গুরুতর অভিযোগে আইনি ব্যবস্থা না নিয়ে সালিশের মাধ্যমে নিষ্পত্তির ঘটনায় এবং এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও প্রকাশ পাওয়ার পর এলাকায় ব্যাপক সমালোচনার ঝড় উঠেছে।
ভুক্তভোগীর পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত বুধবার (৮ জুলাই) দুপুর ২টার দিকে উপজেলার গৌরীগ্রাম ইউনিয়নে এ ঘটনা ঘটে। অভিযুক্ত মহব্বত আলী খাঁ (৪৫) ওই গ্রামের মৃত তায়জাল খাঁর ছেলে।
ঘটনার দিন ওই প্রতিবন্ধী নারীকে বাড়িতে একা রেখে তার মা পাশেই তার ছেলের বাড়িতে যান। এই সুযোগে মহব্বত আলী ঘরে ঢুকে ওই নারীকে ধর্ষণের চেষ্টা করেন। এ সময় প্রতিবন্ধী নারীর গোঙানি ও চিৎকার শুনে তার মা ও প্রতিবেশীরা ছুটে এলে মহব্বত আলী পালিয়ে যান।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ঘটনাটি পুলিশকে না জানিয়ে স্থানীয় প্রভাবশালী মহল চার দিন ধরে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চালায়। সর্বশেষ গত রোববার (১২ জুলাই) সন্ধ্যায় হারিয়াকাহন এলাকার সাবেক ইউপি সদস্য মালেক মন্ডলের বাড়ির উঠানে এক গ্রাম্যসালিশের আয়োজন করা হয়।
জানা গেছে, ইউপি সদস্য মিল্টন, আরশেদ আলী ও আব্দুল মালেক মেম্বারসহ স্থানীয় মাতুব্বররা ওই সালিশে উপস্থিত ছিলেন। এতে অপরাধ স্বীকার করায় অভিযুক্ত মহব্বত আলীকে শারীরিক শাস্তি হিসেবে ‘২০টি জুতার বাড়ি’ দেওয়ার রায় দেওয়া হয়। সেখানে এই বিচারকার্য সম্পন্ন করে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ধর্ষণচেষ্টার মতো গুরুতর অপরাধকে জুতার বাড়ি দিয়ে মীমাংসা করা দেশের প্রচলিত আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোর শামিল। ভুক্তভোগী পরিবারটি সরল ও আইন সম্পর্কে কম বোঝায় জনপ্রতিনিধিরা সালিশ করেছেন।
ভুক্তভোগী প্রতিবন্ধী নারীর দুলাভাই মহরম আলী বলেন, মহব্বত এর আগেও দুই জায়গায় একই অপরাধ করেছে। আমার শ্যালিকার ঘটনায় শনিবার সালিশ বসার কথা থাকলেও আসামি আসেনি। রোববার সালিশের শুরুতে আসামিকে ৭টি জুতার বাড়ি ও জুতার মালা পরিয়ে রাস্তায় ঘোরানোর কথা বলা হয়েছিল; কিন্তু পরে শুধু ২০টি জুতার বাড়িতে রফাদফা করা হয়।
তিনি আরও বলেন, একজন অসহায় প্রতিবন্ধী নারীর ইজ্জতহানির বিচার কি শুধু ২০টি জুতার বাড়ি? আমি এই অন্যায় রায় না মেনে সালিশে থেকে চলে এসেছি। আমাদের থানায় যেতে এখনো বাধা দেওয়া হচ্ছে। আমরা কোনো টাকা-পয়সা চাই না, অন্যায়ের সঠিক বিচার চাই। সবার সঙ্গে আলোচনা করে আমরা আইনের আশ্রয় নেব।
সালিশ বোর্ডে উপস্থিত থাকার বিষয়টি স্বীকার করে ইউপি সদস্য আরশেদ আলী বলেন, আমি এই আইনটি জানি না। ওটা আমার ওয়ার্ডও না।
গৌরীগ্রাম ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল ওহাব বলেন, আমি সাঁথিয়ায় একটি অনুষ্ঠান শেষে বাড়ি ফেরার পথে আমাকে ওই সালিশে ডাকা হয়েছিল। গিয়ে দেখলাম দুইপক্ষের আত্মীয়স্বজনরা বসে সালিশের রায় করেছেন এবং বিষয়টি সমাধান করেছেন। তবে শুনেছি সালিশে ওই ছেলে তার অপরাধ স্বীকার করেছে।
এ বিষয়ে সাঁথিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আনিসুর রহমান জানান, ভুক্তভোগী ওই নারীর বড় ভাই বাদী হয়ে থানায় মামলা করেছেন। আসামি পলাতক রয়েছে এবং আসামিকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।
সাঁথিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রিজু তামান্না বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন অনুযায়ী ধর্ষণ বা ধর্ষণচেষ্টা একটি গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ। দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী, এ ধরনের অপরাধের বিচার কোনোভাবেই গ্রাম্য সালিশে করার সুযোগ নেই। আইন অমান্য করে চেয়ারম্যান ও অন্যরা কেন এটি করলেন তা জানতে চেয়ারম্যানকে ডাকা হয়েছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি আরও জানান, বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে তার নজরে এসেছে। এরপরই তিনি ওসিকে খোঁজ নিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। ভুক্তভোগী পরিবারটি যাতে সঠিক বিচার পায় তা নিশ্চিত করা হবে।
