গুলির মুখে কার্নিশে ঝুলে থাকা সেই আমিরের মানবেতর জীবন
Advertisement
মো. ফজলে রাব্বি, ব্রাহ্মণবাড়িয়া
প্রকাশ: ১৯ জুলাই ২০২৬, ০৯:০৪ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর রামপুরায় একটি নির্মাণাধীন ভবনের কার্নিশে ঝুলে থাকা তরুণ আমির হোসেনকে একের পর এক গুলি করেছিল পুলিশ। ৬টি গুলি পায়ে লাগে তার। ভাগ্যক্রমে প্রাণে বেঁচে গেলেও পায়ে গুলি লাগায় এখনো স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি আমির হোসেন। সেই ভয়াল ঘটনার পর দুই বছর পেরিয়ে গেছে। তখন কিছু আর্থিক সহযোগিতা ও অনেকে খোঁজখবর নিলেও এখন আর তার খোঁজ নেয় না কেউ।
গণঅভ্যুত্থানে আমির হোসেনের গুলিবিদ্ধ হওয়ার সেই ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর অনেকেই তাকে দেখতে গিয়েছিলেন। কেউ কেউ তাকে আর্থিক সহায়তাও করেছিলেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাকে সবাই ভুলতে বসেছে। ওই সময় চায়ের দোকানে কাজ করা সেই তরুণ এখন মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন। ভয়াল সেই স্মৃতি এখনো তাকে তাড়া করে বেড়ায়। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে দেশের অনেক কিছু বদলেছে, কিন্তু ভাগ্য বদলায়নি আমির হোসেনের। চরম দারিদ্র্য ও শারীরিক দুর্বলতায় তাকে অসহায় করে তুলেছে।
চব্বিশের জুলাইয়ে যখন ছাত্র-জনতার আন্দোলন চলছিল, তখন ১৯ জুলাই রামপুরার বনশ্রী-মেরাদিয়া এলাকায় প্রাণভয়ে আমির হোসেন একটি নির্মাণাধীন ভবনের ৪ তলায় আশ্রয় নেন। সেখানে পুলিশ তাকে ঘিরে ফেলে এবং ছাদ থেকে নিচে ঝাঁপ দিতে বলে।
তিনি অস্বীকৃতি জানালে পুলিশ তাকে লক্ষ্য করে পরপর ছয়টি গুলি চালায়। গুলিগুলো তার দুই পায়ের ঊরু, হাঁটু, ও গোড়ালি ভেদ করে বেরিয়ে যায়। অলৌকিকভাবে বেঁচে ফিরলেও আমির হোসেনের দুই পা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন থাকতে হয় তাকে। তার পায়ের হাড় ও মাংসপেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় তিনি নিজের পায়ে ভর দিয়ে বেশিক্ষণ দাঁড়াতে পারেন না। রেস্তোরাঁকর্মী আমিরকে প্রতিনিয়ত তাড়া করছে সেদিনের ভয়াল স্মৃতি।
এ ঘটনায় দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল চলতি বছরের জুনে রায় ঘোষণা করেছেন। রায়ে সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ তিনজনের মৃত্যুদণ্ড এবং অন্য আসামিদের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
জুলাইয়ের মাঝামাঝিতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে গোটা দেশ যখন উত্তাল, তেমন সময় সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে ভয়াবহ একটি ভিডিও। একটি নির্মাণাধীন ভবনের কার্নিশে ঝুলে জীবন বাঁচানোর মরিয়া চেষ্টা করছে এক তরুণ। তার দিকে গুলি ছুড়ছে দুই পুলিশ সদস্য। পরপর চালানো হয় কয়েক রাউন্ড গুলি। সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয় ১৯ জুলাইয়ের সেই ফুটেজ।
আমির বলেন, ভয়ে আমি ছাদের ওপর উঠে গিয়েছিলাম। আমার পেছন পেছন পুলিশও গিয়েছে। তারা বারবার বলেন নিচে ঝাঁপ দেওয়ার জন্য। তবে আমি ঝাঁপ দেই নাই। এরইমধ্যে আরেকজন পুলিশ তিন তলা থেকে গুলি করেন, তারই একটি গুলি আমার পায়ে লাগে।
গুলিবিদ্ধ হয়ে তিন তলায় প্রায় তিন ঘণ্টা পড়ে ছিলেন আমির। পরে তাকে উদ্ধার করেন বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী।
আমিরের গ্রামের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুরে। ঢাকায় ফুফুর বাসায় থেকে কাজ করতেন রামপুরার একটি রেস্তোরাঁয়। সুস্থ হলেও পুরোপুরি স্বাভাবিক জীবনে ফেরা নিয়ে শঙ্কা কাটেনি এখনও।
আমির হোসেন আরও বলেন, আমাকে ছয় রাউন্ড গুলি করা হয়েছে। গুলি লাগার পর আমি যেখানে পড়ে যাই, সেখানে অনেকক্ষণ ছটফট করছিলাম। আমাকে যে সময়ের মধ্যে উদ্ধার করে হাসপাতালে আনা হয়, ওই সময়ের ১০ থেকে ১৫ মিনিট বেশি হয়ে গেলেই আমাকে মৃত উদ্ধার করতে হতো।
