সীতাকুন্ডে শিপব্রেকিং ইয়ার্ডে দুর্ঘটনা
ছোট ভাইকে বাঁচাতে গিয়ে মৃত্যুর কোলে বড় ভাইও
এম এ কাউসার, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬, ১০:৫২ পিএম
ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
মনসুর আলী (৫৫) ও নাছির উদ্দিন (৫১) আপন দুই ভাই। দুজনই কাজ করতেন একই জাহাজভাঙা কারখানায়। মনসুর ছিলেন ফোরম্যানের দায়িত্বে আর ছোট ভাই নাছির ছিলেন কাটারম্যান। শুক্রবার সকালে নাছির জাহাজের যে অংশে কাটছিলেন, সেখানেই গ্যাস বিস্ফোরণে বিষক্রিয়া ছড়িয়ে পড়ে। ছোট ভাইকে ঢলে পড়তে দেখে ছুটে আসেন মনসুর। এরপর মনসুরও ঢলে পড়েন মৃত্যুর কোলে।
দুই সহোদর ছাড়াও একই ঘটনায় প্রাণ হারান আরও সাত জন। সবাইকে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে নেওয়ার পর জরুরি বিভাগের চিকিৎসক সবাইকে মৃত ঘোষণা করেন।
মনসুর আলী ও নাছির উদ্দিন চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডু উপজেলার ভাটিয়ারি ইউনিয়নের আকবর আলীর হাটের মোহাম্মদ সেকান্দরের ছেলে। ভাটিয়ারির ফেরদৌস স্টিল শিপব্রেকিং ইয়ার্ড ও রিসাইক্লিং কারখানায় একটি এলএনজি জাহাজ কাটার সময় এ দুর্ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে নিহতদের স্বজনরা ভিড় করেন চমেক হাসপাতালের লাশ ঘরের সামনে। এ সময় স্বজনদের বুকফাটা আর্তনাদ ও বিলাপে ভারি হয়ে উঠে চারপাশের পরিবেশ।
সরেজমিন চমেক হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, লাশ ঘরে পাশাপাশি রয়েছে মনসুর ও নাছিরের লাশ। বাইরে কাঁদছেন তাদের স্বজনরা। কেউ কেউ আত্মীয়দের ফোন করে জানাচ্ছেন তাদের মৃত্যুর খবর। ফোনের অপর প্রান্তের মানুষের কান্নায় এ প্রান্তের মানুষটিও কাঁদছেন বিলাপ করে।
মুনসুর ও নাছিরের চাচাতো ভাই পরিচয় দেওয়া মো. মহিউদ্দিন বলেন, প্রতিদিনের মতো শুক্রবারও মনসুর ও নাছির একসঙ্গে জাহাজ ভাঙার কাজে গিয়েছিল। কিন্তু কে জানতো, তারা মারাও যাবে একসঙ্গে। ছোট ভাই নাছিরকে বাঁচাতে গিয়ে নিজেও মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন মনসুর। তারা চার ভাই, দুই বোন। মনসুরের দুই মেয়ে এবং নাছিরের এক মেয়ে রয়েছে।
এদিকে হাসপাতালে কারখানার মালিকপক্ষের কেউ হতাহতদের দেখতে না যাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন স্বজনরা। এক সুপারভাইজারকে ঘিরে ধরে বিক্ষোভ করতে দেখা যায়।
ভাটিয়ারি ইউনিয়নের সেকান্দর বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, মনসুর ও নাছিরের লাশের জন্য অপেক্ষা করছেন স্বজনরা। আহাজারি করছিলেন মনসুরের স্ত্রী, বড় মেয়ে রুনা আক্তার ও ছোট মেয়ে রেশমা। এ সময় অভিযোগ করে রুনা আক্তার বলেন, আমার বাবার সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত ডিউটি ছিল। কিন্তু জাহাজ এলে দিনে-রাতে কাজ করাতো। কারখানা থেকে বার বার ফোন করতো। শুক্রবার ছুটির দিনেও তারা (কারাখানা কর্তৃপক্ষ) ফোন করে নিয়ে যায়। আমাদের কোনো ভাই নেই। এখন কে আমাদের দেখবে?
এদিন সেকান্দর বাড়ির পুরো এলাকা সেনাবাহিনীর সদস্যদের ঘিরে রাখতে দেখা যায়। কেউ যেন বিশৃঙ্খলা করতে না পারে, সেদিকে নজর রাখছিলেন সেনা সদস্যরা। বিকালে সেনা সদস্যরা গ্যাসের বিষক্রিয়া বন্ধ করতে শিপ ইয়ার্ডে কাজ শুরু করেন।
চমেক হাসপাতালে দায়িত্বরত চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) আলাউদ্দিন তালুকদার যুগান্তরকে বলেন, বিষক্রিয়ায় গুরুতর অবস্থায় ৯ জনকে আনা হয়েছে। এর মধ্যে জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ৮ জনকে মৃত ঘোষণা করেন। অপর একজনকে ওয়ার্ডে ভর্তি দেওয়া হয়েছে। এছাড়া বেসরকারি ন্যাশনাল হাসপাতাল প্রাইভেট লিমিটেডে একজন মারা গেছেন।
আহতদের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, সেখানে গ্যাস লিকেজ দেখতে পেয়ে শিফট ইনচার্জসহ তিনজন কর্মকর্তা এগিয়ে গেলে তারা অসুস্থ হয়ে যান। তাদের দেখে আরো চারজন এগিয়ে গেলে তারাও অজ্ঞান হয়ে পড়েন। এভাবেই একে একে মৃতের সংখ্যা বাড়তে থাকে। নিহতদের মধ্যে একজন সেইফটি অফিসারও রয়েছেন।

