Logo
Logo
×

Advertisement

শেষ পাতা

টেকনাফের পাহাড়ে মানব পাচারকারীদের বন্দিশালা

কাজের প্রলোভনে ডেকে নেওয়া হয় তরুণদের * পালানোর চেষ্টা করলে নেমে আসত নির্মম নির্যাতন

Icon

জসিম উদ্দিন, কক্সবাজার

প্রকাশ: ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

টেকনাফের পাহাড়ে মানব পাচারকারীদের বন্দিশালা

সংগৃহীত ছবি

Advertisement

পাহাড়ের ভেতরে ছোট ছোট ঝুপড়ি ঘর। চারপাশে অস্ত্রধারীদের পাহারা। লোহার শিকলে বাঁধা মানুষ। দিনে খাবার জুটত মাত্র দুই বেলা। কখনো দেওয়া হতো কাঁচা কদু, সঙ্গে সামান্য ডাল। কেউ পালানোর চেষ্টা করলে নেমে আসত নির্মম নির্যাতন। এভাবেই টেকনাফের দুর্গম পাহাড়ে বন্দিজীবন কাটছিল ৫৬ জনের। তাদের কারও আট দিন, কারও কয়েক দিন ধরে সেখানে আটকে রাখা হয়েছিল। সুযোগ বুঝে চলছিল তাদের সাগরপথে পাচারের প্রস্তুতি।

কক্সবাজারের টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের রঙ্গীখালীর দুর্গম পাহাড়ে এমন সশস্ত্র মানব পাচারকারীদের বন্দিশালার সন্ধান পেয়েছে যৌথ বাহিনী। বৃহস্পতিবার সেখানে অভিযান চালিয়ে ৫৬ জনকে উদ্ধার করা হয়। আটক করা হয় মানব পাচারকারীচক্রের পাঁচ সদস্যকে। উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের শুক্রবার সকালে টেকনাফ মডেল থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। তবে এ অভিযানে চরম মূল্য দিতে হয়েছে এক সেনাসদস্যকে। জিম্মিদের উদ্ধারে গিয়ে মানব পাচারকারীদের গুলিতে নিহত হয়েছেন সেনাসদস্য সৈনিক মো. তিতাস শেখ (২৭)। তার মৃত্যুর ঘটনায় টেকনাফজুড়ে ক্ষোভ ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। পাহাড়ে গড়ে ওঠা সশস্ত্র মানব পাচারকারীদের আস্তানা নির্মূলে একযোগে সাঁড়াশি অভিযানের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও জনপ্রতিনিধিরা। এ ঘটনার প্রতিবাদে শুক্রবার জুমার নামাজের পর বিভিন্ন স্থানে মানববন্ধন করেছে ছাত্র প্রতিনিধিরা।

এদিকে উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের বর্ণনায় উঠে এসেছে পাহাড়ে মানবপাচারকারীদের ভয়ংকর বন্দিশালার চিত্র। কাজের প্রলোভন দেখিয়ে মানুষ সংগ্রহ, দালালের মাধ্যমে তাদের পাচারকারীদের হাতে তুলে দেওয়া, জিম্মি করে রাখা, নির্যাতন এবং সাগরপথে পাঠানোর প্রস্তুতি-সব মিলিয়ে সেখানে একটি সংঘবদ্ধ নেটওয়ার্ক সক্রিয় থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

উদ্ধার হওয়া ফরিদপুরের আসাদুজ্জামান আট দিন ধরে পাহাড়ের একটি ঝুপড়ি ঘরে বন্দি ছিলেন। তিনি দুবার পালানোর চেষ্টা করেও পারেননি। তিনি বলেছেন, পাহাড়ে ৪০ থেকে ৫০ জনের একটি সশস্ত্র পাহারাদল ছিল। তাদের নজর এড়িয়ে পালানোর সুযোগ ছিল না। টেকনাফ থানা হেফাজতে থাকা আসাদুজ্জামান বলেন, কক্সবাজারের একটি ব্রিজে চাকরি করার সুবাদে উখিয়ার কুতুপালং ক্যাম্পের রোহিঙ্গা ইমামুলের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। পরে তাদের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে ওঠে। একপর্যায়ে ক্যাম্পে কাজ দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে আট দিন আগে তাকে ডেকে নেওয়া হয়। সেখানে যাওয়ার পর মোবাইল ফোনসহ সঙ্গে থাকা সবকিছু কেড়ে নেওয়া হয়। রাতে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে তাকে পাহাড়ে নিয়ে মানব পাচারকারীদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। আসাদুজ্জামান বলেন, পাহাড়ে গিয়ে দেখেন, তার মতো আরও অর্ধশতাধিক মানুষকে আটকে রাখা হয়েছে। তখনই বুঝতে পারেন, তিনি মানব পাচারকারীদের ফাঁদে পড়েছেন। তিনি বলেন, দুই দিন আগে শতাধিক নৌকাসহ একটি ট্রলার সাগরপথে যাত্রার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। আমাকে আরও পাঁচজনের সঙ্গে সেখানে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু জায়গা না থাকায় সেদিন ট্রলারে তোলা হয়নি। সর্বশেষ বৃহস্পতিবার আমাদের পাচারের পরিকল্পনা ছিল। ভাগ্যিস, সেনাবাহিনী এসে আমাদের উদ্ধার করেছে।

উদ্ধার হওয়া উখিয়ার সেবতখালীর বাসিন্দা মো. সাইফুল ও মিজানুর রহমান সাগর বলেন, কাজ দেওয়ার কথা বলে নূরালী নামে এক দালাল তাদের মানব পাচারকারীদের হাতে তুলে দেন। পরে পাচারকারীদের কাছ থেকেই তারা জানতে পারেন, দুজনকে এক লাখ টাকায় কিনে নেওয়া হয়েছে। সাইফুল ও সাগর বলেন, পাঁচ দিন ধরে তারা ওই পাহাড়ি আস্তানায় বন্দি ছিলেন। প্রতিদিন চার-পাঁচজন করে নতুন মানুষ এনে সেখানে জড়ো করা হতো। কেউ কথা বলতে চাইলে ব্যাপক মারধর করা হতো। পালানোর চেষ্টা করায় তারাও নির্যাতনের শিকার হন। পরে তাদের লোহার শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়। তারা জানান, দিনে মাত্র দুই বেলা খাবার দেওয়া হতো। খাবার হিসাবে দেওয়া হতো কাঁচা কদু ও ডাল। বৃহস্পতিবার তাদের ট্রলারে তুলে সাগরপথে পাচারের পরিকল্পনা ছিল। এর আগেই যৌথ বাহিনী অভিযান চালিয়ে তাদের উদ্ধার করে। শুধু রঙ্গীখালী নয়, টেকনাফের বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় সশস্ত্র মানব পাচারকারী ও অপরাধীচক্রের তৎপরতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ রয়েছে স্থানীয়দের। বাহারছড়া, হ্নীলা ও হোয়াইক্যংয়ের পাহাড়ে অস্ত্রধারীদের আস্তানা গড়ে ওঠার অভিযোগ রয়েছে। পাহাড়ে প্রায়ই গুলির শব্দ শোনা যায়। অপরাধীদের ভয়ে অনেক সময় স্থানীয়রা মুখ খুলতে সাহস পান না।

হ্নীলার বাসিন্দা নুর আলম বলেন, মানব পাচারকারীদের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক ভাঙা সম্ভব হবে না। প্রতিদিনই পাহাড়ে গুলির শব্দ শোনা যায়। সশস্ত্র পাচারকারীদের কারণে পুরো এলাকা অনিরাপদ হয়ে উঠেছে। বাহারছড়া, হ্নীলা ও হোয়াইক্যংয়ের পাহাড়ে অস্ত্রধারীদের আস্তানা গড়ে উঠেছে। এসব আস্তানা নির্মূলে একযোগে সাঁড়াশি অভিযানের বিকল্প নেই।

টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী বলেন, পাহাড়কেন্দ্রিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা দিন দিন বাড়ছে। বিশেষ করে শীত মৌসুমে মানব পাচারকারীদের আনাগোনা চোখে পড়ার মতো। এমন পরিস্থিতিতে পাচারকারীদের আস্তানায় গোলাগুলিতে একজন সেনাসদস্য নিহত হওয়ার ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তিনি বলেন, ‘এখানে সাধারণ মানুষ অপরাধীদের কাছে অনেকটা অসহায়। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে পাহাড়ে সাঁড়াশি অভিযান অত্যন্ত জরুরি।

টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম বলেন, পাহাড়ে মানব পাচারকারীদের আস্তানা থেকে উদ্ধার হওয়া ৫৬ জনকে শুক্রবার সকালে থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। তাদের পরিচয় ও অন্যান্য তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। সেনাসদস্য নিহতের ঘটনায় আইনগত প্রক্রিয়া চলছে।

টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম অনীক চৌধুরী বলেন, পাহাড়ে অবস্থানরত সশস্ত্র মানব পাচারকারীদের গ্রেফতারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাজ করছে। অপরাধ করে কেউ পার পাওয়ার সুযোগ নেই। মানববন্ধনের বিষয়েও প্রশাসন খোঁজখবর রাখছে। তিনি বলেন, সশস্ত্র মানব পাচারকারীদের গুলিতে সেনাসদস্য নিহত হওয়ার ঘটনায় আমরা গভীরভাবে মর্মাহত ও শোকাহত। এ ধরনের অপরাধ নির্মূলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের সম্মিলিত সহযোগিতা প্রয়োজন।

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

স্থান দখল ও হাজার কোটি টাকার বকেয়া গলার কাঁটা ১৩ উড়োজাহাজ

গলার কাঁটা ১৩ উড়োজাহাজ

খুলনায় বেপরোয়া রাজনৈতিক হত্যা

খুলনায় বেপরোয়া রাজনৈতিক হত্যা

টেকনাফের পাহাড়ে মানব পাচারকারীদের বন্দিশালা

টেকনাফের পাহাড়ে মানব পাচারকারীদের বন্দিশালা

হিমালয় থেকে উড়ে রাজারহাটে বিরল প্রজাতির শকুন

বিরল প্রজাতির শকুন

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম