স্থান দখল ও হাজার কোটি টাকার বকেয়া
গলার কাঁটা ১৩ উড়োজাহাজ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
দেশের দুই বিমানবন্দরে এক দশক ধরে পড়ে আছে ১৩টি পরিত্যক্ত উড়োজাহাজ। এগুলো বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) জন্য বড় প্রশাসনিক ও ব্যবস্থাপনাগত বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রপ্তানি কার্গো অ্যাপ্রোনে প্রায় ১ লাখ ৯২ হাজার ১০০ বর্গফুট জায়গা দখল করে পড়ে আছে ইউনাইটেড, রিজেন্ট, জিএমজি ও অ্যাঞ্জেল এয়ারলাইন্সের ১২টি উড়োজাহাজ। অন্যদিকে কক্সবাজার বিমানবন্দরের আবাসিক এলাকায় খোলা আকাশের নিচে পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে ইউনাইটেড এয়ারওয়েজের একটি এটিআর-৭২ মডেলের উড়োজাহাজ। এগুলোর কারণে মূল্যবান রানওয়ে ও অ্যাপ্রোন এলাকা দখল হয়ে থাকায় বিমান ল্যান্ডিং, কার্গো হ্যান্ডলিং এবং স্বাভাবিক পরিচালন সক্ষমতা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
তবে শুধু অবকাঠামোগত প্রতিবন্ধকতাই নয়, এসব উড়োজাহাজের বিপরীতে বেবিচকের বকেয়া পাওনার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার কোটি টাকার ওপরে। শুধু শাহজালালেই চার এয়ারলাইন্সের কাছে বকেয়া ৯০২ কোটি টাকা এবং কক্সবাজারের উড়োজাহাজটির বিপরীতে কর্তৃপক্ষের পাওনা প্রায় ১৪৫ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। বেবিচকের তথ্যমতে, অকেজো উড়োজাহাজগুলো সরিয়ে ১২টি নতুন পার্কিং বে চালু করা গেলে দৈনিক প্রায় ২ কোটি ৮৮ লাখ টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব আয় সম্ভব। দীর্ঘ আইনি নোটিশের পর ২০২৪ সালে শাহজালালের ১২টি উড়োজাহাজ বাজেয়াপ্ত করা হলেও ভিত্তিমূল্য ও মূল্যায়নের জটিলতায় এত দিন বিক্রি আটকে ছিল। অবশেষে সর্বোচ্চ দরদাতার সুপারিশের ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে উড়োজাহাজগুলো স্ক্র্যাপ (ভাঙারি) হিসাবে বিক্রির প্রশাসনিক অনুমোদন চেয়ে বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠিয়েছে বেবিচক।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম যুগান্তরকে বলেন, বিমানবন্দরের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় বছরের পর বছর পরিত্যক্ত উড়োজাহাজ পড়ে থাকা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এসব উড়োজাহাজ শুধু মূল্যবান জায়গা দখল করে রাখছে না; বরং বিমানবন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনাতেও প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের অ্যাপ্রোন ও কার্গো এলাকায় এ ধরনের উড়োজাহাজ পড়ে থাকা পরিচালন সক্ষমতার জন্য বড় বাধা। বেবিচকের উচিত প্রতিটি উড়োজাহাজের মালিকানা ও আইনি জটিলতা দ্রুত নিষ্পত্তি করে অপসারণের উদ্যোগ নেওয়া। পাশাপাশি এত দিন ধরে এসব উড়োজাহাজ অপসারণ না হওয়ার জন্য দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা জরুরি।
বেবিচকের সদস্য (পরিচালনা ও পরিকল্পনা) এয়ার কমোডর আবু সাঈদ মেহবুব খান বলেন, পরিত্যক্ত উড়োজাহাজগুলো নিলামে বিক্রির অনুমোদন চেয়ে মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন পাওয়া গেলে দরপত্র আহ্বান করা হবে।
সূত্রমতে, শাহজালালে পড়ে থাকা ১২টি উড়োজাহাজের মধ্যে ইউনাইটেড এয়ারওয়েজের ৮টি, রিজেন্ট এয়ারওয়েজের ২টি এবং জিএমজি ও অ্যাঞ্জেল এয়ারলাইন্সের একটি করে উড়োজাহাজ রয়েছে। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া ও একাধিক নোটিশের পর ২০২৪ সালের ২৬ মে এই ১২ উড়োজাহাজ বাজেয়াপ্ত করে বেবিচক। কিন্তু এরপরও সেগুলো সরানো যায়নি। সচল উড়োজাহাজ হিসাবে উপযুক্ত ক্রেতা না পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত স্ক্র্যাপ বা ভাঙারি হিসাবে বিক্রির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে দেশীয় পর্যায়ে উপযুক্ত মূল্যায়নকারী প্রতিষ্ঠান না থাকায় আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী ভিত্তিমূল্য নির্ধারণে জটিলতা তৈরি হয়। পরে বেবিচকের ৩২০তম বোর্ড সভায় উন্মুক্ত দরপ্রস্তাবের ভিত্তিতে সর্বোচ্চ দরদাতা ‘অ্যারোফরিয়া এয়ারস্পেস’র প্রস্তাব অনুযায়ী ভ্যাট ও আইটি ছাড়া ৩ লাখ ৫০ হাজার মার্কিন ডলার ভিত্তিমূল্য নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়। ১৯ অক্টোবর বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মোহা. মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে উড়োজাহাজগুলো নিলামে বিক্রির জন্য বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক অনুমোদন চেয়ে চূড়ান্ত প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।
যুগান্তরের হাতে আসা চিঠিতে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে বারবার চিঠি দিয়েও পরিত্যক্ত উড়োজাহাজগুলো সরানো সম্ভব হয়নি। এতে রপ্তানি কার্গো এলাকায় নিয়মিত ও অনিয়মিত কার্গো ফ্লাইটের পার্কিং সংকট তৈরি হয়েছে। ব্যাহত হচ্ছে বিমানবন্দরের স্বাভাবিক অপারেশনাল কার্যক্রম ও দেশের রপ্তানি কার্যক্রম। পাশাপাশি বিমানবন্দরের মূল্যবান অবকাঠামো ও সুযোগ-সুবিধার যথাযথ ব্যবহার না হওয়ায় সরকার দীর্ঘদিন ধরে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ও রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
কক্সবাজারে এক যুগ ধরে পড়ে আছে একটি : কক্সবাজার বিমানবন্দরের আবাসিক এলাকায় ১২ বছর ধরে খোলা আকাশের নিচে পড়ে আছে ইউনাইটেড এয়ারওয়েজের একটি এটিআর ৭২-২১২ মডেলের অকেজো উড়োজাহাজ। ২০১৪ সালের ২০ জুলাই ৪৩ জন যাত্রী নিয়ে অবতরণের সময় এর নোজ গিয়ার ভেঙে পড়ে। ২০১৬ সালে তদন্ত শেষে এয়ারলাইন্সের কাছে এটি হস্তান্তর করা হলেও তারা আর সরিয়ে নেয়নি। বর্তমানে এটি মরিচা ধরে মারাত্মক পরিবেশ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে। কক্সবাজার বিমানবন্দরের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক মো. গোলাম মোর্তোজা হোসেন ২ নভেম্বর বেবিচক চেয়ারম্যানের কাছে এটি দ্রুত অপসারণের জন্য দাপ্তরিক আবেদন জানিয়েছেন। ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত হিসাব অনুযায়ী, এই একটি উড়োজাহাজের বিপরীতে বেবিচকের বকেয়া পাওনা দাঁড়িয়েছে ১৪৫ কোটি ৭৩ লাখ টাকা।

