খুলনায় বেপরোয়া রাজনৈতিক হত্যা
১ বছরে প্রাণ গেল ৯ বিএনপি নেতাকর্মীর
খুলনা ব্যুরো
প্রকাশ: ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
সংগৃহীত ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
খুলনায় আন্ডারওয়ার্ল্ডের খুনোখুনির মধ্যেই রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের ওপর হামলা, গুলি ও ‘টার্গেট কিলিং’-এর ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। রাজনৈতিক বিরোধ, আধিপত্য বিস্তার, পূর্বশত্রুতা কিংবা ব্যবসায়িক দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে একের পর এক প্রাণহানির ঘটনায় জেলা ও নগরজুড়ে চরম আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত এক বছরে খুলনায় অন্তত ৯ বিএনপি নেতাকর্মী খুনের শিকার হয়েছেন। গুরুতর আহত হয়েছেন আরও পাঁচজন। আর বছরের প্রথম ১০ মাসে খুলনায় ৭৩টি হত্যাকাণ্ড হয়েছে। এর মধ্যে খুলনা মহানগরীতেই ৩৭টি এবং জেলার বিভিন্ন এলাকায় ৩৬টি হত্যা হয়েছে।
রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের ওপর ধারাবাহিক হামলার মধ্যে দৌলতপুর থানা ছাত্রদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ও যুবদল নেতা রাশিকুল আনাম রাশু হত্যা অন্যতম। চলতি বছরের ১৬ মার্চ বেলা সাড়ে ১১টার দিকে কেডিএ কল্পতরু মার্কেটের সামনে তাকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়। ঘটনার আট মাস পেরিয়ে গেলেও মূল কারণ উদ্ঘাটন করতে পারেনি পুলিশ। সাতজনকে গ্রেফতার করা হলেও কেউ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়নি। ঘটনার সময়কার গুরুত্বপূর্ণ ৪০ মিনিটের সিসিটিভি ফুটেজ গায়েব হওয়া নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নিহতের বাবা শরীফুল আনাম। তিনি বলেন, ছেলের মৃত্যুর পর কোনো তদন্ত কর্মকর্তা আমার সঙ্গে দেখা করেননি। ঘটনাস্থলের আশপাশের কারও কাছ থেকে বক্তব্য নেওয়া হয়েছে বলেও আমার জানা নেই।
এ বিষয়ে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা নগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) পরিদর্শক অমিত কুমার দাশ জানান, এ পর্যন্ত সাতজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তবে তাদের কেউই আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেননি। ফলে হত্যার সুনির্দিষ্ট কারণ নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হয়নি।
একইভাবে গত বৃহস্পতিবার ডুমুরিয়া উপজেলার আমভিটা-রামকৃষ্ণপুর জোড়া বটতলা এলাকায় গুলিতে নিহত হন ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক শেখ আব্দুস সালামের ছেলে বিএনপিকর্মী তরিকুল ইসলাম (৩৫)। এলাকায় মাদকের প্রতিবাদ করায় তাকে জীবন দিতে হয়েছে বলে অভিযোগ পরিবারের।
শেখ আব্দুস সালাম বলেন, ঘটনার দিন খুলনায় প্রধানমন্ত্রীর অনুষ্ঠানে ছিলাম। ছেলে যেতে চেয়েছিল খুলনায়। আমি যেতে দেইনি। এলাকায় মাদকের বিরুদ্ধে কথা বলত আমার ছেলে। যে কারণে খুন হতে হলো ওকে।
এর আগে ১ নভেম্বর সন্ধ্যায় নগরীর রায়েরমহল এলাকায় নিজের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ঢুকে চাপাতি ও চাইনিজ কুড়াল দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয় খুলনা মহানগর তাঁতিদলের যুগ্ম আহ্বায়ক সৈয়দ হুমায়ুন কবিরকে। এ ঘটনায় করা হত্যা মামলার তিন নম্বর আসামি ফায়েক শেখকে মঙ্গলবার রাতে রাজধানীর পল্লবী থেকে গ্রেফতার করেছে এসআরবি-৬। এছাড়া ৭ ফেব্রুয়ারি রেলওয়ে হাসপাতাল রোডে পিটুনিতে বিএনপিকর্মী বাবুল মোল্লা, ২৭ ফেব্রুয়ারি দিঘলিয়ায় যুবদল নেতা মুরাদ খান, ৪ মার্চ নগরীর ডাকবাংলো মোড়ে রূপসা উপজেলা শ্রমিক দলের সাবেক সভাপতি মাসুম বিল্লাহ এবং ১২ জুন লবণচরা এলাকায় বটিয়াঘাটা উপজেলা বিএনপির সদস্য রফিকুল ইসলাম ওরফে ঢাকাইয়া রফিক গুলিতে নিহত হন। ২৫ আগস্ট রূপসায় বিএনপিকর্মী জয় ঢালীকে হত্যা করা হয়। এর ৫০ দিন পর ৫ অক্টোবর তার বাবা বিএনপিকর্মী আক্তার ঢালীকেও একইভাবে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।
এক সপ্তাহে একাধিক স্থানে গুলি ও তাণ্ডব : অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে জেলাজুড়ে একের পর এক গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে। ২৪ অক্টোবর তেরখাদার পারহাজীগ্রামে ভ্যানে থাকা অবস্থায় ৩ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের সভাপতি রামীম বিশ্বাসকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে দুর্বৃত্তরা। ২৬ অক্টোবর রাতে বটিয়াঘাটায় গুলিবিদ্ধ হন যুবদলকর্মী সোহেল শেখ এবং ২৭ অক্টোবর চক্রাখালী বাজারে জেলা যুবদলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠান শেষে ফেরার পথে গুলিবিদ্ধ হন যুবদল নেতা ওহিদুল ইসলাম বাদল। ২৬ অক্টোবর দিঘলিয়ার পানিগাতী গ্রামে জামায়াত নেতা আজিজুর রহমান ও শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন নেতা তাসনিম হাসানের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর চালানো হয়। এছাড়া ১৭ অক্টোবর নগরীর ক্লে রোডে প্রকাশ্যে কুপিয়ে জখম করা হয় হকার ইউনিয়নের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. আলমকে।
এ বিষয়ে কেএমপি কমিশনার মো. সাজ্জাদুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, টার্গেট কিলিং বেড়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছি। পুলিশ কিন্তু নিয়মিত অপরাধীদের গ্রেফতার করছে। এখন প্রয়োজন মানুষের সচেতনতা। সবাই মিলে চেষ্টা করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে।
খুলনার পুলিশ সুপার ওমর ফারুক বলেন, মানুষের মধ্যে সামাজিক ও রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সামান্য বিরোধ তৈরি হলেই মানুষ খুনের মতো অপরাধের দিকে ধাবিত হচ্ছে। এই প্রবণতা ও অপরাধ রুখতে পুলিশের পাশাপাশি সমাজের সচেতন মহলকেও এগিয়ে আসতে হবে।
