চক্রবর্তী পরিবারের ৪ খুন
দুই আসামির ডোপ টেস্টে মাদকের অস্তিত্ব মেলেনি, জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদ
Advertisement
রংপুর ব্যুরো
প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৬, ০৯:০৩ পিএম
দুই আসামির ডোপ টেস্টে মাদকের অস্তিত্ব মেলেনি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
রংপুর নগরীর দাসপাড়ায় (মাছুয়াপাড়ায়) অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চারজন হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গ্রেফতার দুই আসামি সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসের ডোপ টেস্টে কোনো ধরনের মাদকের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ।
যুগান্তরের অনুসন্ধানে ও প্রকাশিত খবরের সূত্রেই বলা হয়েছিল ডোপ টেস্টে কোনো মাদকের আলামত পাওয়া যাবে না। তাই শেষ পর্যন্ত সেটাই প্রমাণিত হলো।
এদিকে মামলায় গ্রেফতার দুই আসামিকে রিমান্ডের আবেদন জানালে আদালত কারাগারের গেটে দুই দিন জিজ্ঞাসাবাদের জন্য অনুমতি দিয়েছেন।
সোমবার দুপুরে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন রংপুর মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) উপ-পুলিশ কমিশনার সনাতন চক্রবর্তী। তিনি জানান, আদালতের অনুমতি নিয়ে আসামিদের নিরাপত্তাজনিত কারণে কারাগারে বাইরে না এনে কারাগার থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়। পরে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করা হয়। তাদের শরীরে মাদকজাতীয় কোনো উপাদানের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি।
সনাতন চক্রবর্তী বলেন, রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের একটি টেকনিক্যাল টিমের সহযোগিতায় রোববার জেলগেট থেকে তাদের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। পরে সেই নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। পরীক্ষায় এমফিটামিনের কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ ডোপ টেস্টে তাদের শরীরে মাদকের উপস্থিতি মেলেনি।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, রোববার (৩০ আগস্ট) দুপুর সোয়া ১টার দিকে রংপুর মহানগর ডিবি পুলিশের একটি দল রংপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে যায়। সেখানে কারাবন্দি দুই আসামি সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসের ডোপ টেস্টের জন্য প্রয়োজনীয় নমুনা সংগ্রহ করা হয়।
আসামিদের কাছ থেকে নমুনা সংগ্রহের সময় রংপুর মেডিকেল কলেজের ল্যাবের একজন টেকনোলজিস্ট ও একজন সহকারী উপস্থিত ছিলেন। পুলিশের পক্ষ থেকে নিরাপত্তার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কারাগারের ভেতরেই পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়।
এদিকে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা রংপুর মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের ওসি জিন্নাত আলী আসামিদের পুনরায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডের আবেদন জানালে আদালত তাদের জেলগেটে ২ দিনের জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দিয়েছে।
এ তথ্য জানিয়েছেন রংপুর মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) উপ-পুলিশ কমিশনার সনাতন চক্রবর্তী।
আদালত সূত্র জানায়, সোমবার রংপুরের মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট-২য় (পুলিশ ফাইল) আদালতে এ বিষয়ে শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। শুনানি শেষে মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. রফিকুল ইসলাম প্রত্যেক আসামিকে আগামী তিন দিনের মধ্যে যে কোনো দুই দিন তিন ঘণ্টা করে জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেন।
উল্লেখ্য, যুগান্তরে খবর প্রকাশের পর রংপুরে আলোচিত চার খুনের মামলায় অভিযুক্ত দুই আসামি সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসের ডোপ টেস্টের জন্য প্রস্রাবের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। যুগান্তরে একাধিকবার খবরে বলা হয়েছিল- হত্যার অভিযোগে গ্রেফতার দুই যুবক ইয়াবা আসক্ত ছিল- তাই সেখানে নেশার ঘোরে ৪টি খুনের ঘটনা ঘটায়। কিন্তু পুলিশ তাদের এ সম্পর্কে কোনো তথ্য প্রমাণের নমুনা সংগ্রহ করেনি। এমনকি কোনো ফিঙ্গার প্রিন্ট সংগ্রহ করেনি। এ খবরের সূত্র ধরে তাদের প্রস্রাবের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছিল।
এ সম্পর্কে রংপুর মেডিকেল কলেজের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের প্রধান প্রফেসর ডা. মোস্তাকিমুর রহমান যুগান্তরকে জানিয়েছিলেন, কোনো মাদকাসক্ত ব্যক্তির ইউরিন স্পেসিমেন (প্রস্রাবের নমুনা) মাদক সেবনের পর ৭২ ঘণ্টার মধ্যে পরীক্ষা করলে তার প্রমাণ পাওয়া যায়। এরপর যত বিলম্ব হবে ইউরিন স্পেসিমেন (প্রস্রাবের নমুনা) পরীক্ষায় মাদকের উপস্থিতি পাওয়ার সম্ভাবনা কমে যাবে। তবে যারা নিয়মিত সেবন করেন তাদের ৫ থেকে ৭ দিনের মধ্যে ইউরিন স্পেসিমেনে (প্রস্রাবের নমুনা) ইয়াবার উপস্থিতি পাওয়া যাবে। এরপর পাওয়া সম্ভব নয়। এই পরিস্থিতিতে ঘটনার ১০ দিন পরে ইউরিন স্পেসিমেন (প্রস্রাবের নমুনা) পরীক্ষায় করা নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠেছে। অবশেষে তাই সত্য বলে প্রমাণিত হলো- গ্রেফতার অভিযুক্ত দুই আসামির দেহে মাদকের নমুনা পাওয়া যায়নি।
যেভাবে সামনে আসে চার হত্যাকাণ্ড
গত ২২ আগস্ট রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়া এলাকার নিজ বাড়ি থেকে রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী ও দুই সন্তানের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। একই পরিবারের চারজনের লাশ উদ্ধারের ঘটনায় পুরো এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।
ঘটনার পর হত্যাকাণ্ডের কারণ ও এর সঙ্গে কারা জড়িত—তা জানতে তদন্তে নামে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তদন্তের একপর্যায়ে প্রতিবেশী সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ ও পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া তারা আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিলে কারাগারে পাঠানো হয়। তাদের দেওয়া জবানবন্দি হত্যাকাণ্ডের তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হিসেবে বিবেচনা করছে পুলিশ।
তবে ডোপ টেস্টের ফলাফলে দুই আসামির শরীরে মাদকের কোনো অস্তিত্ব না পাওয়ায় হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে মাদকের সম্পৃক্ততা ছিল কিনা, সেই বিষয়ে নতুন করে বিভিন্ন প্রশ্ন সামনে এসেছে। তদন্তের অন্যান্য বিষয়ও খতিয়ে দেখছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। কেন বিলম্বে প্রস্রাবের নমুনা সংগ্রহ করা হলো তা নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠেছে।
মামলা ও তদন্ত
এ ঘটনায় নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী বাদী হয়ে রংপুর নগরীর কোতোয়ালি থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। মামলায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করা হয়।
মামলার পর তদন্তের ধারাবাহিকতায় সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসকে গ্রেফতার করা হয়। পরে আদালতে তাদের জবানবন্দিও নেওয়া হয়। বর্তমানে মামলাটির তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
চারজনকে হত্যার মতো চাঞ্চল্যকর এ ঘটনায় হত্যার প্রকৃত কারণ, ঘটনার সঙ্গে আরও কেউ জড়িত ছিল কিনা এবং হত্যাকাণ্ডের পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল কিনা এসব বিষয় খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তদন্তের স্বার্থে বিভিন্ন আলামত ও তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। ডোপ টেস্টের ফলাফলও তদন্তের অন্যান্য তথ্য-উপাত্তের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হবে।
এদিকে একই পরিবারের চারজনের মৃত্যুতে এলাকায় এখনো শোক ও উদ্বেগ বিরাজ করছে। স্থানীয়দের মধ্যে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য দ্রুত উদ্ঘাটন এবং জড়িতদের আইনের আওতায় আনার দাবি রয়েছে।
এ মামলার বাদী নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তীসহ তাদের পরিবারের ৩ সদস্যকে ডিবি অফিসে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করেন রংপুর মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) উপ-পুলিশ কমিশনার সনাতন চক্রবর্তী।
তিনি এ সম্পর্কে জানান, এ মামলায় পরিবারের সদস্যদের কোনো তথ্য জানা আছে কিনা তা জানাতে অনুরোধ করেছি। এজন্য ডেকে আনা হয়েছে মামলাটির তদন্তের কাজে সহযোগিতার জন্য।
