নির্যাতনে হাসপাতালে কাতরাচ্ছে মাদ্রাসাছাত্র, শিক্ষককে ছাড়াতে থানায় মা
নবীনগর (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:০৫ পিএম
অভিযুক্ত শিক্ষককে উদ্ধার করে থানা হেফাজতে নিয়েছে পুলিশ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে ছুটি শেষে মাদ্রাসায় ফেরামাত্রই ১২ বছরের এক শিক্ষার্থীকে বেধড়ক পিটুনি ও অমানবিক নির্যাতন করার অভিযোগ উঠেছে এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ জনতার হাত থেকে অভিযুক্ত শিক্ষককে উদ্ধার করে থানা হেফাজতে নিয়েছে পুলিশ।
তবে গুরুতর আহত সন্তান যখন হাসপাতালে ব্যথায় কাতরাচ্ছে, তখন তার পাশে না থেকে অভিযুক্ত শিক্ষককে ছাড়িয়ে নিতে মা থানায় গিয়ে অবস্থান ও তদবির করায় এলাকায় চরম তোলপাড় ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর নাম মো. আব্দুল্লাহ (১২)। সে নবীনগর উপজেলার কৃষ্ণনগর আশরাফুল উলুম হাফিজিয়া মাদ্রাসার হেফজ বিভাগের ছাত্র এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার সাদেকপুর গ্রামের মৃত রুমান মিয়ার ছেলে। অন্যদিকে অভিযুক্ত শিক্ষক মো. ইব্রাহিম সদর উপজেলার বিরামপুর গ্রামের বাসিন্দা। তিনি ওই গ্রামের মো. মুজিবুর রহমানের ছেলে।
স্থানীয় ও মাদ্রাসাসূত্রে জানা যায়, আব্দুল্লাহ ছুটি নিয়ে বাড়িতে যায়। পরবর্তীতে পারিবারিক একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে তাকে আবারও মাদ্রাসায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়; কিন্তু মাদ্রাসায় ফেরার পরপরই দীর্ঘদিন অনিয়মিত ও অনুপস্থিত থাকার অজুহাতে শিক্ষক ইব্রাহিম ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন এবং শিশুটিকে লাঠি দিয়ে নির্মমভাবে পেটাতে শুরু করেন। একপর্যায়ে আব্দুল্লাহর বুকফাটা চিৎকার শুনে আশপাশের লোকজন দ্রুত মাদ্রাসায় ছুটে আসেন। সেখানে রক্তাক্ত ও গুরুতর আহত অবস্থায় শিশুটিকে উদ্ধার করা হয় এবং উত্তেজিত জনতা অভিযুক্ত শিক্ষককে অবরুদ্ধ করে ফেলেন।
খবর পেয়ে কৃষ্ণনগর আশরাফুল উলুম হাফিজিয়া মাদ্রাসার মুহতামিম মুফতি মহিউদ্দিন আশরাফী সকাল সাড়ে ৮টার দিকে ঘটনাস্থলে পৌঁছান। তিনি আহত ছাত্রের রক্তাক্ত ও ক্ষতবিক্ষত অবস্থা দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং তাৎক্ষণিকভাবে তাকে চিকিৎসার জন্য স্থানীয় একটি হাসপাতালে নিয়ে যান।
মুহতামিম মুফতি মহিউদ্দিন আশরাফী বলেন, আব্দুল্লাহ অত্যন্ত ভালো ও শান্ত স্বভাবের একটি ছেলে। তার সঙ্গে এ ধরনের জঘন্য ও অমানবিক আচরণ কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। আমি নিজে তাকে দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছি।
বর্তমানে আব্দুল্লাহ কৃষ্ণনগর পপুলার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে। তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে লাঠির আঘাত ও কালশিটের গুরুতর চিহ্ন রয়েছে বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন।
এদিকে শিক্ষককে মারমুখী জনতার হাত থেকে বাঁচাতে খবর দেওয়া হয় নবীনগর থানা পুলিশকে। পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং শিক্ষক ইব্রাহিমকে উদ্ধার করে থানা হেফাজতে নিয়ে যায়।
তবে ঘটনার পর সবচেয়ে রহস্যজনক ও বিতর্কিত পরিস্থিতি তৈরি হয় আহত শিশুটির মায়ের ভূমিকাকে কেন্দ্র করে।
সরেজমিন নবীনগর থানায় গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতালে যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকা সন্তানের পাশে না থেকে মা আফরোজা বেগম অভিযুক্ত শিক্ষককে ছাড়িয়ে নিতে থানায় অবস্থান করছেন এবং দেন-দরবার চালাচ্ছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, আব্দুল্লাহর বাবা মারা যাওয়ার পর তার মা তার আপন চাচাকে বিয়ে করেন। এমন পরিস্থিতিতে গুরুতর আহত সন্তানের পাশে না থেকে অভিযুক্ত শিক্ষকের পক্ষ নিয়ে থানায় মায়ের এমন আচরণ উপস্থিত লোকজনের মাঝে চরম সন্দেহ ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
এ বিষয়ে নবীনগর থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) রাজীব কান্তি নাথ জানান, পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে শিক্ষককে উত্তেজিত জনতার হাত থেকে উদ্ধার করে থানা হেফাজতে নিয়ে আসা হয়েছে। তবে এ ঘটনায় শিশুটির পরিবারের পক্ষ থেকে এখনো পর্যন্ত কোনো লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়নি। লিখিত অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে স্থানীয় সচেতন মহল বলছে- শিক্ষার্থীদের সংশোধনের জন্য শাসন করার প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু সেই শাসন যদি পাশবিক ও অমানবিক নির্যাতনের রূপ নেয়- তবে তা গোটা শিক্ষক সমাজ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি ধ্বংস করে দেয়। তারা এ ধরনের বর্বরোচিত নির্যাতনের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত এবং অভিযুক্তের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
