‘মোর মাক কোটে ফেলে দেইম’, ফুটো টিনের ঘরে দুই বিধবার দিন
Advertisement
রাজারহাট (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:০৯ পিএম
দুই পরিবারের ঘর থেকে বের হওয়ার জন্য নিজস্ব কোনো রাস্তা নেই।
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ঘরের এক কোণে মাটির চুলা। পাশে রান্নার সামান্য কিছু সামগ্রী। টিনের বেড়াজুড়ে অসংখ্য ছিদ্র। কোথাও টিন বেঁকে গেছে, কোথাও মরিচা ধরে ক্ষয়ে গেছে। ফুটো অংশে পুরোনো কাপড় কিংবা পলিথিন দিয়ে কোনোভাবে বন্ধ রাখার চেষ্টা। ঘরের ভেতরেই বাঁধা একটি ছাগল।
এই ছোট্ট জীর্ণ ঘরটিই ৮০ বছরের সালেহা বেগমের পৃথিবী। এক শতাংশ জমির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা ঘরটিতে তার সঙ্গে থাকেন মেয়ে শাহিদা বেগম।
বৃষ্টি নামলে টিনের ফুটো দিয়ে পানি পড়ে ঘরের মেঝেতে। ভিজে যায় ঘরের ভেতরের জিনিসপত্রও। রান্না, খাওয়া আর ঘুম—সবই চলে একই জায়গায়। মানুষ ও পশুর বসবাসও একই ঘরে।
কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার নাজিমখান ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের রাঘব মৌজার ঝাড়িঝাড় গ্রামের এই চিত্র। একই গ্রামের আরেক প্রান্তে ৭০ বছরের ফাতেমা বেগমও বসবাস করছেন প্রায় একই রকম সংকট নিয়ে।
‘মোর মাক কোটে ফেলে দেইম’
বয়সের ভারে সালেহা বেগম এখন আর কাজ করতে পারেন না। মেয়ে শাহিদা অন্যের বাড়িতে কাজ করেন। আর সালেহা মানুষের কাছে হাত পেতে খাবারের ব্যবস্থা করেন। এভাবেই চলে তাদের সংসার।
শাহিদা বেগম বলেন, ভিক্ষা করি খাই। কল নাই, টয়লেট নাই। মানুষের বাড়িতে যাই, মানুষ চৌদ্দকুড়ি কথা কয়। আবাদ-সুবাদ নাই, কী করি খাই। মোর মাক কোটে ফেলে দেইম, বুক ধরিয়া থাকোং।
মায়ের বয়স ও অসহায়তার কথা বলতে গিয়ে তার কণ্ঠে ফুটে ওঠে অসহায়তা। নিজের আয় সীমিত হলেও বৃদ্ধ মাকে ছেড়ে থাকার সুযোগ নেই।
সালেহা বেগম বলেন, এই ঘরোত দুই মায়-ছায় থাকি। আন্দি-বাড়ি খাই। ছাগল থাকে, হমরাও থাকি একসাথে।
একা ফাতেমার দিন কাটে অনিশ্চয়তায়
সালেহার ঘর থেকে খুব দূরে নয় ফাতেমা বেগমের বসতঘর। এক শতাংশ জমির ওপর জীর্ণ টিনের সেই ঘরে তিনি একাই থাকেন।
ফাতেমার ঘরে নেই বিদ্যুৎ, নলকূপ কিংবা শৌচাগার। পানির প্রয়োজন হলে যেতে হয় অন্যের বাড়িতে। জীবিকার জন্য কখনো মানুষের বাড়িতে কাজ করেন। কাজ না পেলে ভিক্ষা করে খাবার জোগাড় করেন।
কথা বলতে গিয়ে জীবনের অনিশ্চয়তার পাশাপাশি মৃত্যুর পরের সময় নিয়েও উদ্বেগের কথা জানান তিনি।
ফাতেমা বেগম বলেন,মাইষের বাড়িত কর্ম করি। কাম না করবার পাইলে ভিক্ষা করি আনি খাই। মুই মরলে মোর জাগা নাই মাটি দিবার। পানি খাওয়াইয়া মানুষ নাই। মোর দুঃখ কোন মাইষোক কোইম।
দুই নারীর জীবন সম্পর্কে জানেন তাদের প্রতিবেশীরাও। তাদের ভাষ্য, অভাবের কারণে প্রতিদিনের খাবার জোগাড় করাও অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে।
প্রতিবেশী মজিদ মিয়া বলেন, তারা এক ঘরেই রান্না করে, ওখানেই খায়, ওখানেই থাকে। সঙ্গে একটি ছাগলও থাকে। মানুষের বাড়িতে কাজ করে করে খায়।
দোলেনা বেগম বলেন, মানুষ যখন খেতে দেয়, তখন খেতে পায়; না দিলে না খেয়ে থাকে।
প্রতিবেশী মো. সাইদুল ইসলাম বলেন, তাদের নিজস্ব কেউ নাই। ছোট্ট একটি ঘরে থাকে। টিউবওয়েল নেই, টয়লেট নেই। খুব কষ্টে আছে তারা।
নিজের রাস্তা নেই, নির্ভরতা অন্যের ওপর
বাসস্থানের পাশাপাশি তাদের চলাচলেরও রয়েছে সংকট। দুই পরিবারের ঘর থেকে বের হওয়ার জন্য নিজস্ব কোনো রাস্তা নেই। প্রতিবেশীর বাড়ির ভেতরের পথ ব্যবহার করেই তাদের যাতায়াত করতে হয়।
প্রতিবেশী সেমা বেগম বলেন, এনাদের যাতায়াতের জন্য কোনো রাস্তা নেই। আমাদের বাড়ির ভিতরের রাস্তা ব্যবহার করে যাতায়াত করেন।
সালেহা ও ফাতেমার চাওয়া বড় কোনো স্বপ্ন নয়। তারা চান মাথা গোঁজার মতো নিরাপদ একটি ঘর, খাবার পানির ব্যবস্থা, একটি শৌচাগার এবং চলাচলের জন্য একটি রাস্তা। তারা জানান, তারা কোনো সরকারি ভাতা বা সহায়তা পাচ্ছেন না।
এ বিষয়ে রাজারহাট উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা এস এম হাবিবুর রহমান বলেন, সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে যদি কোনো গৃহনির্মাণের বরাদ্দ পাওয়া যায়, তাহলে তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। তারা যদি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আবেদন করে থাকেন, তবে তাদের বিষয়টি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিবেচনা করব।


