ভিডিও ভাইরাল থেকে বিয়ে-বহিষ্কার-মৃত্যু
পরিবারের অভিযোগের তীর মামার দিকে
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৪৯ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও জামায়াতে ইসলামী থেকে বহিষ্কৃত গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুনের সঙ্গে তার সম্পর্কের শুরু থেকে বিয়ে এবং শেষপর্যন্ত মরিয়মের মৃত্যুর ঘটনায় নতুন করে আলোচনায় এসেছে তার মামা ওবায়দুর রহমানের ভূমিকা।
নিহত মরিয়মের পরিবারের অভিযোগ, এমপির সঙ্গে মরিয়মের পরিচয়, সম্পর্ক ও বিয়ের পেছনে প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল ওবায়দুরের। এমনকি অন্য একটি পক্ষের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ নিয়ে তিনি পরিকল্পিতভাবে মরিয়মকে এমপির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন বলেও অভিযোগ পরিবারের।
মরিয়মের বাবা এসএম মাসুম বিল্লাহর দাবি, তার শ্যালক ওবায়দুর রহমান তখন গাজী নজরুল ইসলামের ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন। সেই সুবাদে এমপির সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা ছিল। ওবায়দুরই তার মেয়েকে গাজী নজরুলের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। পরে সেই পরিচয় সম্পর্ক ও বিয়েতে গড়ায়।
পরিবারের অভিযোগ, পুরো ঘটনাটিই ছিল পরিকল্পিত এবং এর পেছনে আর্থিক স্বার্থ থাকতে পারে।
মরিয়মের ফুফু রেকসোনার অভিযোগও প্রায় একই। তার ভাষ্য, গাজী নজরুলের সঙ্গে মরিয়মের সম্পর্ক স্বাভাবিকভাবে তৈরি হয়নি। ওবায়দুর পরিকল্পনা করে মরিয়মকে এমপির কাছে নিয়ে যান। টাকা-পয়সার লেনদেনের মাধ্যমে কোনো পক্ষ তাকে ব্যবহার করেছিল কিনা, সেটি তদন্ত করে বের করার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
ঘটনার মোড় ঘোরে চলতি বছরের জুলাইয়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গাজী নজরুল ইসলাম ও মরিয়ম খাতুনের ব্যক্তিগত মুহূর্তের একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর এমপির ব্যক্তিগত জীবন ও মরিয়মের সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।
পরে গাজী নজরুল জানান, ভিডিওতে থাকা নারী মরিয়ম এবং তিনি তার দ্বিতীয় স্ত্রী। মরিয়মও তাদের বিয়ের কথা প্রকাশ্যে স্বীকার করেন। তার দাবি ছিল, উভয় পরিবারের সম্মতিতে ১৭ জুন তাদের বিয়ে হয়।
এরপর সম্পর্কটির নেপথ্য ভূমিকা নিয়ে ওবায়দুর রহমানের নাম সামনে আসে। গাজী নজরুলের পক্ষ থেকে ওবায়দুরের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ করা হয়। অন্যদিকে ওবায়দুরও এমপিকে ঘিরে পাল্টা অভিযোগ তোলেন। একপর্যায়ে বিষয়টি রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্কে রূপ নেয়।
২২ জুলাই জামায়াতে ইসলামী গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কার করে। দলটির পক্ষ থেকে তার বিরুদ্ধে নৈতিক স্খলনের অভিযোগের কথা জানানো হয়। এ ঘটনার পর মরিয়ম-নজরুল সম্পর্ক আরও ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে।
এরই মধ্যে ২০ সেপ্টেম্বর রাজধানীর ন্যাম ভবনের একটি ফ্ল্যাট থেকে মরিয়মের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়। তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর ঘটনাটি নতুন মোড় নেয়। পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে আলামত সংগ্রহ করে। পরে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়।
মরিয়মের মৃত্যুর ঘটনায় তার বাবা এসএম মাসুম বিল্লাহ বাদী হয়ে আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে মামলা করেন। মামলায় গাজী নজরুল ইসলাম, তার প্রথম স্ত্রী মাকসুদা বেগম এবং মরিয়মের মামা ওবায়দুর রহমানকে আসামি করা হয়েছে।
পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, মরিয়মের সঙ্গে গাজী নজরুলের বিয়ের পেছনে ওবায়দুরের প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল এবং পরবর্তী সময়ে নানা ঘটনা প্রবাহেরও তিনি অংশ ছিলেন।
মামলার পর গাজী নজরুল ও তার প্রথম স্ত্রীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তবে ওবায়দুর রহমানকে এখনো গ্রেফতার করা যায়নি বলে পরিবারের দাবি। মরিয়মের মৃত্যুর পর থেকেই তিনি আত্মগোপনে রয়েছেন বলে অভিযোগ পরিবারের।
এদিকে মৃত্যুর আগে মরিয়ম কোনো ধরনের মানসিক চাপ, নির্যাতন বা পারিবারিক বিরোধের মধ্যে ছিলেন কিনা, সেটিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। ন্যাম ভবনের ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার হওয়া কথিত চিরকুট, মোবাইল ফোন, কল রেকর্ড, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যোগাযোগ, সিসিটিভি ফুটেজ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য—সবকিছু যাচাই করে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণের দাবি জানিয়েছে পরিবার।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন—গাজী নজরুল ও মরিয়মের সম্পর্কের শুরুটা কিভাবে হয়েছিল? কে তাদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল? বিয়ের পেছনে কারা ভূমিকা রেখেছিল? পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী ওবায়দুরের সঙ্গে কোনো আর্থিক লেনদেন হয়েছিল কিনা? আর মরিয়মের মৃত্যুর সঙ্গে সম্পর্ক তৈরির সেই প্রাথমিক ঘটনাগুলোর কোনো যোগসূত্র আছে কিনা?
এসব প্রশ্নের উত্তর মিলবে তদন্তে। বিশেষ করে ওবায়দুর রহমানকে জিজ্ঞাসাবাদ করা গেলে মরিয়ম-নজরুল সম্পর্কের শুরু, বিয়ের আয়োজন, ভিডিও ভাইরালের পেছনের ঘটনা এবং মৃত্যুর আগের পরিস্থিতি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে বলে মনে করছে পরিবার।
তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে জোর দাবি করেছেন ওবায়দুরকে আটক করা হলে এ ঘটনার শুরু থেকে শেষ অবধি সব রহস্যের উদঘাটন হবে। পরিবার শুরু থেকে অভিযোগ করে আসছে মেয়ের মামার এহেন কর্মকাণ্ডের পেছনে এমপির রাজনৈতিক শত্রুতা জড়িত- তার বলি হতে হলো নিষ্পাপ মরিয়মকে।
পরিবারের অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার জন্য ওবায়দুরের ব্যক্তিগত মোবাইল নাম্বারে কথা বলার জন্য একাধিকবার চেষ্টা করা হয়। তবে তার ব্যবহৃত মোবাইল নাম্বার বন্ধ থাকায় বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
