ভাসমান হাটে চার ঘণ্টায় বিক্রি কোটি টাকা
Advertisement
পিরোজপুর প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:৪১ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
পিরোজপুরের নাজিরপুরের বৈঠাকাটার ভাসমান হাট। এখানে কেনাবেচা সবই চলছে নৌকায়। প্রতি হাটে চার ঘণ্টায় বেচাবিক্রি হয় প্রায় কোটি টাকা। শত শত নৌকা আর ক্রেতা-বিক্রেতার ভিড়। উপর থেকে দেখে মনে হচ্ছে নদীর বুকে ছোট একটি গ্রাম।
পূর্বাকাশে সূর্যের আলো ফোটার আগেই সারি সারি নৌকার দৃশ্য দেখে যে কারো নজর কাড়ে। এখানকার মানুষের পরম যত্নে উৎপাদিত বিভিন্ন প্রকার ফসল ও সবজি তুলে নৌকায় করে ভোরের সূর্যের আলো ফোটার আগেই নিয়ে যান উপজেলার বেলুয়া নদীর বৈঠাকাটার ভাসমান হাটে।
এখানে যেমন বিক্রি হয় টাটকা সবজি, তেমনি হয় সবজির চারাও। হাটে পাবেন তৃপ্তিদায়ক মিষ্টি পান থেকে সকালের নাস্তা। এমনকি ভাতও পাচ্ছেন ক্ষুধা নিবারণে। ভৌগোলিক কারণে এখানকার সার্বজনীন বাহন হচ্ছে নৌকা। আশপাশের মানুষ সবজি আর নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস বিক্রি করতে হাটে আসেন নৌকা করে, ঠিক তেমনি ক্রেতারাও কিনতে আসেন নৌকা নিয়ে।
এখানে শুধু সবজি কিংবা চারা নয়, কেনাবেচা চলে বিভিন্ন শস্য সামগ্রীও। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত শস্য সামগ্রী নিয়ে সপ্তাহের প্রতি শনি ও মঙ্গলবার চাষীরা আসেন ছোট ছোট নৌকা করে এ ভাসমান হাটে। এরপর সেগুলো পাইকারি ক্রেতারা কিনে নিয়ে যায় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। সবজির দাম তুলনামূলক সস্তা হওয়ায় ক্রেতাদের ভিড়ে এ হাটটি সর্বদা সরব থাকে।
ভোরের আলো ফুটতেই নদীর বুকে ভিড়তে শুরু করে একের পর এক নৌকা। কোনো নৌকায় শাকসবজি, কোনো নৌকায় কৃষিপণ্য আবার কোনো নৌকাই যেন হয়ে ওঠে ভাসমান দোকান। নৌকা থেকে নৌকায় চলে দরদাম আর কেনাবেচা। কয়েক ঘণ্টার জন্য নদীর বুকেই জমে ওঠে ব্যতিক্রমী এক বাজার।
পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার বেলুয়া নদীতে সপ্তাহের শনিবার ও মঙ্গলবার বসে এই ভাসমান বাজার। এই জলকেন্দ্রিক বাজারব্যবস্থা ও নদী-নৌকানির্ভর জীবনযাত্রার সঙ্গে ইতালির ভেনিস শহরের জলপথকেন্দ্রিক জীবনের মিল খুঁজে পান স্থানীয়রা। সেই কারণেই বৈঠাকাটা বাজারকে উপমা হিসেবে ‘বাংলার ভেনিস’ বলা হয়।
নাজিরপুর, নেছারাবাদ ও বরিশালের বানারীপাড়ার বিভিন্ন এলাকার কৃষক ও ব্যবসায়ীরা নৌকায় করে এখানে নিয়ে আসেন তাদের পণ্য।
ক্রেতা-বিক্রেতারা জানান, শুধু স্থানীয় কৃষক নন, দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকেও পাইকাররা আসেন এই বাজারে। কেনা কৃষিপণ্য নৌপথে পৌঁছে যায় বিভিন্ন অঞ্চলের বাজারে। ব্যবসায়ীদের মতে, প্রতি হাটে প্রায় কোটি টাকার পণ্য কেনাবেচা হয়। তরমুজের মৌসুমে সেই বেচাকেনা বেড়ে দাঁড়ায় দেড় থেকে ২ কোটি টাকা পর্যন্ত।
কৃষিপণ্য বিক্রেতা ৫৬ বছর বয়সি জালাল উদ্দিন বলেন, এই বাজারে মানুষ দূর-দূরান্ত থেকে ব্যবসা করতে আসে। সপ্তাহে দুদিন হাট বসে ভোর ৫টা থেকে ১০টা পর্যন্ত চলে। কৃষকেরা নৌকায় করে বিভিন্ন সবজি নিয়ে আসে আর পাইকাররা কৃষকের কাছ থেকে বিভিন্ন পণ্য কিনে ট্রলারে করে বিভিন্ন অঞ্চলে নিয়ে যায়।
অন্য আরেক ব্যবসায়ী হুমায়ুন কবির বলেন, ভাসমান এই হাটে কাঁচামাল হইতে সবকিছু পাওয়া যায়। আমি অনেক সবজি কিনছি ট্রলারে করে নিয়ে আমার বাড়ির কাছে একটা হাট আছে সেইখানে বিক্রি করব।
ভাসমান এই হাটে শ্যাওলা বিক্রি করেন রাজীব শেখ। তিনি বলেন, এই শ্যাওলা পার্শ্ববর্তী মোল্লারহাট এলাকা দিয়া আনছি। শ্যাওলার কুরি বিক্রয় করি দেড়শ টাকা। মোটামুটি বেচাবিক্রি করে সংসার চালাতে পারি।
ভাসমান হাটে নৌকা ভর্তি মিষ্টি কুমড়া বিক্রি করতে এসেছেন কৃষক রুহুল আমিন। তিনি বলেন, আমি অনেকগুলো মিষ্টি কুমড়া নিয়ে আসছি বিক্রির জন্য। বেশ কয়েকজনে দাম বলছে কিন্তু দেয় নাই। যার কাছে ভালো দাম পাব তার কাছে বিক্রি করব। এর আগের হাটে কচু নিয়ে আসছিলাম। এই হাটে প্রায় কোটি টাকা বেচাবিক্রি হয়।
স্থানীয় বাসিন্দা জালিস হাওলাদার বলেন, এই বাজার বাংলার ভেনিস খ্যাত। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পর্যটকেরা এখানে ঘুরতে আসে এবং বিদেশি পর্যটকেরাও ঘুরতে আসে। এখানে যারা ঘুরতে আসে তারা অনেক ভোগান্তিতে পড়ে। রাস্তাঘাট একদমই ভালো না। রাস্তাঘাটসহ আবাসন সুবিধা যদি ভালো করা হয় আরও বেশি পর্যটক আসবে। স্থানীয় মানুষদের কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে।
পিরোজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক সৌমিত্র সরকার বলেন, ভাসমান এই হাটকে কেন্দ্র করে কোটি কোটি টাকার বেচাকেনা হয়। এমনকি বিদেশি পর্যটকরাও এখানে ঘুরতে আসে। এই বাজারে নারকেল, তরমুজ, শাকসবজি, সবজির চারাসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য বেচাবিক্রি হয়। এছাড়াও সবজি উৎপাদনে ব্যবহৃত শ্যাওলা, দুলালী লতাসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র বিক্রি হয়। খুব সকালে এসে পাইকাররা পণ্যগুলো কিনে নিয়ে বিভিন্ন অঞ্চলে নিয়ে যায়।
এ ভাসমান হাটকে কেন্দ্র করে বৈঠাকাটায় গড়ে উঠেছে প্রায় এক কিলোমিটার দীর্ঘ একটি বাজার। ভাসমান এই হাট দেখতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পর্যটকদের পাশাপাশি বিদেশি পর্যটকেরাও ছুটে আসে।
