আদালতে মামলা করায় বৃদ্ধাকে সন্ত্রাস বিরোধী আইনে কারাগারে পাঠাল পুলিশ
Advertisement
কুষ্টিয়া প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:৪৮ পিএম
বৃদ্ধা নুর জাহান বেগম (৬৫)। ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
কুষ্টিয়া সদর উপজেলায় ইবি থানার পাটিকাবাড়ি ইউনিয়নের নলখোলা গ্রামের বেশ কিছু বাড়িতে ১২দিন ধরে হামলা, ভাঙচুর ও আগুন দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কৃষকদল নেতা আবদুর রহমানের নেতৃত্বে গ্রামে শুরু হয়েছে ত্রাসের রাজত্ব। পুলিশের সহযোগীতায় এসব তাণ্ডবলীলা চলছে বলে জানান ভুক্তভোগীরা।
বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুর করে আগুন দেওয়ার ঘটনায় কয়েকদিন আগে নলখোলা গ্রামের মৃত সেলিম আহমেদের স্ত্রী বৃদ্ধা নুর জাহান বেগম (৬৫) আদালতে মামলা করেন। পরে রোববার সকাল ৭টার দিকে পুলিশ এসে বৃদ্ধা নুর জাহান বেগমকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায়।
পুলিশের ভাষ্য, সন্ত্রাস বিরোধী আইনের সন্দেহভাজন আসামি হিসেবে তাকে আটক করা হয়েছে।
একাধিক সূত্রে জানা গেছে, এলাকার আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিনের সামাজিক বিরোধ সংঘাতের রূপ নিয়েছে। সেই সামাজিক দ্বন্দ্বকে রাজনৈতি রং দিয়ে একটি পক্ষ প্রতিপক্ষের বাড়িঘরে হামলা চালাচ্ছে। হামলার পাশাপাশি বিভিন্ন বাড়িতে গিয়ে চাঁদা দাবি এবং মালামাল লুটের অভিযোগও উঠেছে।
সূত্রে জানা যায়, গত ১৫ সেপ্টেম্বর রাতে মসজিদ-গোরস্থানের কমিটিসহ সামাজিক দ্বন্দ্বে নলকোলা বাজারে অবস্থিত ইউনিয়ন কৃষকদলের আহবায়ক আবদুর রহমানের কার্যালয়ে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এ হামলার ঘটনায় ইউনিয়ন যুবলীগের সহ-সভাপতি রুহুলকে দায়ী করেন কৃষক দলের নেতারা। ঘটনার পর পরই ইউনিয়ন যুবলীগের সহ-সভাপতি রুহুলের বাড়িসহ বেশ কিছু বাড়ি, দোকান এবং পাট-পেঁয়াজের গুদামে হামলা, ভাঙচুর ও আগুন দেয় আবদুর রহমানের সমর্থকরা। এ ঘটনার পর থেকে গত ১২ দিনে আবদুর রহমানের নেতৃত্বে ২১ বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও আগুন দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। লুটপাট করা হয়েছে বাড়ির বিভিন্ন মালামাল।
রোববার সকালে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ভাঙচুর করা বাড়িতে কোনো পুরুষ মানুষ নেই। বাড়ির মহিলারা কথা বলতে ভয় পাচ্ছেন। একাধিক বাড়িতে দেখা গেছে ভাঙচুরের চিহ্ন। এরমধ্যে নলখোলা গ্রামের স্টিল ব্রীজ এলাকার বেশ কয়েকটি বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের চিহ্ন রয়েছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, হামলাকারীরা কখনো দলবদ্ধ হয়ে, আবার কখনো রাতের আঁধারে বিভিন্ন বাড়িতে প্রবেশ করছে। বাড়িঘরে ভাঙচুরের পাশাপাশি লুটপাট ও আগুন দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। মামলার খরচ হিসেবে পরিবার প্রতি এক হাজার টাকা চাঁদা দাবি করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয়দের দাবি, পাটিকাবাড়ি ইউনিয়ন কৃষকদলের আহবায়ক আবদুর রহমানের নেতৃত্বে এসব হামলা ও তান্ডব চালানো হচ্ছে। তার লোকজন এলাকায় প্রভাব বিস্তাার করতে গিয়ে সাধারণ মানুষের বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালাচ্ছে।
তারা জানান, কৃষকদলের আহবায়ক আবদুর রহমান ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে কোনো সময় বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলো না। হঠাৎ বিএনপি সেঁজে কৃষকদলের আহবায়কের পদ পেয়ে যান। নেতা হয়ে আওয়ামী লীগের লোকজনকে সঙ্গে
নিয়ে তৈরী করেন নিজস্ব বাহিনী। শুরু করেন এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব। বর্তমানে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এনামুল মুন্সি, ওয়ার্ড স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ হোসেন, ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক সাইফুল ইসলাম লাল্টু ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সদস্য জুলফিকার আলী পল্টু কৃষকদলের আহবায়ক আবদুর রহমানের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত।
আওয়ামী লীগের এসব নেতাদের নিয়ে বিশাল বাহিনী গড়ে তুলে নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়েছে কৃষকদলের এই নেতা। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে কৃষকদল নেতা আবদুর রহমান বলেন, আওয়ামী লীগের পালিয়ে থাকা নেতারা এলাকায় ফিরে নানা
তৎপরতা চালাচ্ছে। কয়েকদিন আগে আমার অফিসে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করেছে। তারাই আমার বিরুদ্ধে এসব অপপ্রচার চালাচ্ছে।
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধে। একটি দলের পক্ষ নিয়ে অপর পক্ষের মামলার বাদী বৃদ্ধা নুর জাহান বেগমকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গেছে পুলিশ।
মামলার বাদী হওয়ায় থানার ওসি তার সঙ্গে কথা বলবেন জানিয়ে পুলিশের একটি দল তাকে নিয়ে যায় বলে জানিয়েছেন স্বজনেরা। তবে এ ব্যাপারে কোনো তথ্য দিতে পারেনি পুলিশ।
নুর জাহানের মেয়ে সেলিনা আক্তার জানান, সপ্তাহ দুয়েক আগে সামাজিক ও জমি-সংক্রান্ত বিরোধের জেরে তাদের বাড়িতে ও গুদামে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট করে এলাকার একদল লোক। পরে কৃষক দলের স্থানীয় কার্যালয় ভাঙচুর করে এলাকার আরও
কয়েকজনের বাড়িঘরে হামলা ও লুটপাট চালানো হয়। এ ঘটনায় বিএনপির পাশাপাশি আওয়ামী লীগের কিছু লোক জড়িত। তার মা নুর জাহান বেগম এ ঘটনায় বাদী হয়ে ২১ সেপ্টেম্বর কুষ্টিয়ার আদালতে একটি মামলা করেন। মামলাটি পিবিআইকে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
সেলিনা আক্তার অভিযোগ করে বলেন, ‘মামলা করার পর থেকে বিভিন্নভাবে হুমকি দেওয়া হচ্ছিল। রোববার সকালে মা বাড়িতে কাজ করছিলেন। সাড়ে ৭টার দিকে দুটি গাড়িতে করে পুলিশের একটি দল আসে। বাড়ির ভেতর তিনজন নারী পুলিশ সদস্যসহ পুরুষ পুলিশ প্রবেশ করেন। তারা মাকে বলেন, ‘আপনি মামলার বাদী, ওসি স্যার কথা বলবেন, গাড়িতে ওঠেন।’ এরপর তাকে গাড়িতে তুলে নিয়ে যায় পুলিশ।
এ বিষয়ে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থানার ওসি এস এম মামুনুর রশীদ বলেন, ‘আমি ব্যস্ত, বাইরে আছি। একটি হত্যা মামলা নিয়ে অভিযানে আছি। থানায় গিয়ে খোঁজ নিয়ে পরে বলতে পারব।’
তবে কুষ্টিয়া জেলা পুলিশের মুখপাত্র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অবস) ফয়সাল মাহমুদ বলেন, সন্ত্রাসবিরোধী আইনে সন্দেহভাজন আসামি হিসেবে তাকে আটক করা হয়েছে।


