নেত্রকোনায় ৭ বছরে বজ্রপাতে ৭৯ প্রাণহানি, অকার্যকর প্রতিরোধব্যবস্থা
নেত্রকোনা প্রতিনিধি
প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:০০ পিএম
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, এ প্রকল্পের আওতায় ৩২টি লাইটনিং অ্যারেস্টার স্থাপন করা হয়েছিল।
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
নেত্রকোনা জেলায় গত সাত বছরে বজ্রপাতে অন্তত ৭৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। বজ্রপাত থেকে রক্ষায় সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে নেওয়া বেশির ভাগ উদ্যোগই কার্যকর হয়নি। হাওরাঞ্চলে স্থাপন করা বজ্রনিরোধক দণ্ডের (লাইটনিং অ্যারেস্টার) অধিকাংশই অকার্যকর হয়ে পড়েছে। তালগাছ রোপণের প্রকল্পও থেমে আছে পরিচর্যার অভাবে।
নেত্রকোনার বিস্তীর্ণ হাওর ও বিল এলাকায় কৃষিকাজ, মাছ ধরা, গবাদিপশু চরানো ও হাঁস পালনের সঙ্গে যুক্ত মানুষ বজ্রপাতের ঝুঁকিতে থাকেন। বিশেষ করে এপ্রিল ও মে মাসে বোরো ধান কাটার মৌসুমে বজ্রপাতে প্রাণহানি বেশি ঘটে। বজ্রপাতের ঝুঁকির কারণে কৃষকেরা অনেক সময় মাঠে যেতে ভয় পান। তবে জীবিকার তাগিদে তাঁদের ঝুঁকি নিয়েই মাঠে যেতে হয়।
জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে বজ্রপাতে ৮ জন, ২০২১ সালে ১৫ জন, ২০২২ সালে ৩ জন, ২০২৩ সালে ১২ জন, ২০২৪ সালে ৮ জন এবং ২০২৫ সালে ১৬ জন মারা গেছেন। চলতি বছরের ২২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মারা গেছেন আরও ১৭ জন। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, সরকারি হিসাবের চেয়ে প্রকৃত প্রাণহানির সংখ্যা আরও বেশি।
সর্বশেষ গত ১৭ সেপ্টেম্বর সকাল ১০টার দিকে খালিয়াজুরী উপজেলার মেন্দিপুর ইউনিয়নের সাতগাঁও গ্রামের ইছাক মিয়ার ছেলে শফিকুল মিয়া বাড়ির সামনের হাওরে হাঁস চরাতে গিয়ে বজ্রপাতে মারা যান।
অকার্যকর বজ্রনিরোধক দণ্ড
হাওরাঞ্চলে বজ্রপাতজনিত মৃত্যু কমাতে ২০২২ সালে নেত্রকোনার বিভিন্ন স্থানে বজ্রনিরোধক দণ্ড স্থাপন করা হয়। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, এ প্রকল্পের আওতায় ৩২টি লাইটনিং অ্যারেস্টার স্থাপন করা হয়েছিল। প্রতিটি দণ্ড স্থাপনে ব্যয় ধরা হয়েছিল ছয় থেকে আট লাখ টাকা।
নিয়ম অনুযায়ী, এসব দণ্ড হাওর বা খোলা প্রান্তরে স্থাপন করার কথা। কিন্তু স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, অধিকাংশ দণ্ড বাজার, ইউনিয়ন পরিষদ ভবন কিংবা জনবসতিপূর্ণ এলাকায় স্থাপন করা হয়েছে। স্থাপনের দুই বছরের মধ্যেই রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অনেক দণ্ড অকার্যকর হয়ে পড়ে। কোথাও কোথাও যন্ত্রাংশ চুরি হয়ে গেছে। কোনো কোনো স্থানে দণ্ডগুলো এখন শুধু খুঁটি হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।
খালিয়াজুরী উপজেলার মেন্দিপুর গ্রামের কৃষক আরিফ চৌধুরী, মদনের গোবিন্দশ্রী গ্রামের আবুল হাসেম এবং মোহনগঞ্জের আদর্শনগর গ্রামের সবুজ মিয়া বলেন, খালিয়াজুরীর প্রবেশমুখ উচিতপুরে একটি বজ্রনিরোধক দণ্ড স্থাপন করা হয়েছে। তবে হাওরের ফাঁকা জায়গায় দণ্ড স্থাপনের কথা থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে তা জনবসতিপূর্ণ এলাকায় স্থাপন করা হয়েছে। রক্ষণাবেক্ষণ না থাকায় এসব দণ্ড এখন আর কার্যকর নয়।
তালগাছ প্রকল্পেও নেই সুফল
বজ্রপাতের ঝুঁকি কমাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেশজুড়ে তালগাছ রোপণের উদ্যোগ নিয়েছিল সরকার। ২০১৮ সালে নেত্রকোনাতেও এ প্রকল্পের আওতায় তালগাছের চারা রোপণ করা হয়।
তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, রোপণের পর চারাগুলোর যথাযথ পরিচর্যা করা হয়নি। ফলে বেশির ভাগ চারা মারা গেছে। কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ে নেওয়া এ উদ্যোগেরও এখন দৃশ্যমান কোনো সুফল নেই।
কৃষিবিদ ড. শওকত আকবর বলেন, তালগাছের উচ্চতা ও গঠনগত বৈশিষ্ট্য বজ্রপাতের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক বলে মনে করা হয়। তালগাছের বাকলে কার্বনের স্তর থাকায় বজ্রপাত থেকে সুরক্ষায় এটি ভূমিকা রাখতে পারে। ২০১৮ সালে সারা দেশের মতো নেত্রকোনাতেও তালগাছ রোপণের প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু রোপণের পর পরিচর্যা না থাকায় এখন এসব গাছের অস্তিত্বই নেই। ফলে প্রকল্পটি থেকে কোনো সুফল পাওয়া যায়নি।
খালিয়াজুরি উপজেলা সদরের বাসিন্দা শামসুল হক বলেন, মানুষের জীবন রক্ষায় স্থাপন করা বজ্রনিরোধক দণ্ডগুলো রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে নষ্ট হয়ে গেছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি বিভাগের কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। তা না হলে বজ্রপাতে প্রাণহানি আরও বাড়তে পারে।-6abcb36ef1949.jpg)
আশ্রয়কেন্দ্র তৈরির চিন্তা
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. রুহুল আমিন বলেন, খালিয়াজুরী, মদন, মোহনগঞ্জ, কলমাকান্দা, কেন্দুয়া ও নেত্রকোনা সদর উপজেলার বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ, বিল ও ফাঁকা জায়গায় ৩৪টি লাইটনিং অ্যারেস্টার স্থাপন করা হয়েছিল। এসব দণ্ডে বিশেষ ধরনের ম্যাগনেট রয়েছে, যা ৩০০ ফুট এলাকা কভার করতে পারে। তবে প্রকল্পটির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে।
রুহুল আমিন বলেন, বজ্রনিরোধক দণ্ড স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়বহুল। এ কারণে বর্ষা ও বৃষ্টির সময় হাওরের কৃষকেরা যাতে বজ্রপাত থেকে দ্রুত আশ্রয় নিতে পারেন, সে জন্য আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের কথা ভাবা হচ্ছে। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে।
জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান বলেন, বজ্রপাতে নিহতের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। কৃষক, শ্রমিকসহ হাওরাঞ্চলের মানুষকে বজ্রপাত থেকে রক্ষায় জনসচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি ঝড়-বৃষ্টির সময় যাতে তারা দ্রুত আশ্রয় নিতে পারেন, সে জন্য আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রয়োজনীয় বরাদ্দ পাওয়া গেলে হাওরাঞ্চলে পর্যাপ্ত আশ্রয়কেন্দ্র গড়ে তোলা হবে।

-6abc857c03ff1.jpg)