প্রকৌশলী-বিসিএস ক্যাডারের চাকরি ছেড়ে প্রান্তিক শিশুদের পড়ান নায়লা
Advertisement
নেত্রকোনা প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৫৫ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে প্রকৌশলে পড়াশোনা শেষ করে সরকারি চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন নায়লা শারাফ। পরে জনতা ব্যাংকের কর্মকর্তা হন।
৩৪তম বিসিএসে উত্তীর্ণও হয়েছিলেন। প্রচলিত অর্থে ভালো বেতন, পদমর্যাদা ও সামাজিক প্রতিষ্ঠার সুযোগ ছিল তার সামনে। কিন্তু এসবের কোনোটিই তাকে ধরে রাখতে পারেনি।
শেষ পর্যন্ত নায়লা শারাফ বেছে নিয়েছেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকতা। গত সাত বছর ধরে নেত্রকোনা সদর উপজেলার পঞ্চাননপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে কাজ করছেন তিনি। প্রান্তিক পরিবারের শিশুদের পড়ানো ও তাদের মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাকেই জীবনের বড় অর্জন মনে করেন বুয়েটের এই সাবেক শিক্ষার্থী।
নায়লার শিক্ষাজীবনের শুরু ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজে। এরপর বুয়েট থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন। পড়াশোনা শেষে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরে (এলজিইডি) সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। তবে কাজের পরিবেশ ও কিছু অনিয়মের সঙ্গে আপস করতে না পেরে অল্প সময়ের মধ্যেই চাকরি ছেড়ে দেন।
এরপর যোগ দেন জনতা ব্যাংকে এক্সিকিউটিভ অফিসার পদে। কিন্তু ব্যাংকের চাকরির যান্ত্রিকতাও তাকে টানেনি। পরে ৩৪তম বিসিএসে উত্তীর্ণ হলেও সেই চাকরিতে যোগ দেননি। শেষ পর্যন্ত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকতাকেই নিজের পেশা হিসেবে বেছে নেন।
উচ্চ বেতন ও সামাজিক মর্যাদার সুযোগ ছেড়ে শিক্ষকতা বেছে নেওয়ার কারণ জানতে চাইলে নায়লা শারাফ বলেন, অর্থ বা খ্যাতির প্রতি তার কোনো মোহ নেই। অল্পতেই তিনি সুখী।
নায়লা বলেন, অর্থ বা খ্যাতির প্রতি কোনো মোহ নেই। আমি সাধারণ জীবন পছন্দ করি। দিন শেষে একটা নিশ্চিন্ত ও পরিতৃপ্তির ঘুম চাই।
শুধু পাঠ্যবইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় নায়লার পাঠদান। শিক্ষার্থীদের সত্যবাদী, সাহসী ও দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে চেষ্টা করেন তিনি। কোনো কাজ সঠিক কি না, সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নিজের বিবেককে প্রশ্ন করার অভ্যাস গড়ে তুলতে শিশুদের উৎসাহিত করেন।
পাঠদানকে আনন্দময় ও সহজ করতে বিদ্যালয়ের সময়ের বাইরেও কাজ করেন নায়লা। নিজের হাতে ছবি আঁকার পাশাপাশি ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি করে শিক্ষার্থীদের জন্য বিভিন্ন ধরনের শিক্ষা উপকরণ তৈরি করেন।
নায়লার এই সিদ্ধান্ত স্বজন ও পরিচিত অনেকের কাছে একসময় ‘পাগলামি’ মনে হয়েছিল। তবে নিজের সিদ্ধান্ত নিয়ে কোনো আক্ষেপ নেই তার। বরং শৈশবে ভিকারুননিসায় যে মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ পেয়েছেন, প্রান্তিক পরিবারের শিশুরাও যেন সেই সুযোগ পায়—এটাই তার প্রত্যাশা।
এ প্রসঙ্গে নায়লা বলেন, অন্য বিভাগে থাকলে হয়তো অনেক টাকার মালিক হতাম, সবাই মেধাবী বলত। কিন্তু এখানে আমি ভালোবাসা পাই। আমি এই ভালোবাসার কাঙাল। বাচ্চারা যখন এসে ভালোবাসা জানায়, এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর হতে পারে না।
দেশের মেধাবী তরুণদের প্রাথমিক শিক্ষায় আসার আহ্বান জানিয়ে নায়লা শারাফ বলেন, প্রতিদানের আশা না করে শুধু দেওয়ার মানসিকতা থাকলেই প্রাথমিক শিক্ষায় আসা উচিত। তার মতে, বিশ্বজুড়ে প্রাথমিক শিক্ষকতা সম্মানজনক একটি পেশা। বাংলাদেশেও এই পেশাকে আরও মর্যাদাপূর্ণ করা সম্ভব, যদি মেধাবী ও আন্তরিক তরুণেরা এতে এগিয়ে আসেন।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক লীলা রানী ভৌমিক বলেন, বুয়েটে পড়েও তিনি যেভাবে প্রান্তিক শিশুদের নিজের সন্তানের মতো ভালোবেসে পড়াচ্ছেন, তা সত্যিই বিরল। তিনি আমাদের বিদ্যালয়ের অমূল্য সম্পদ।
