Logo
Logo
×

Advertisement

সারাদেশ

‘আমি একটি স্থায়ী কাজ চাই, যাতে আর জীবন বাজি রেখে গাছে উঠতে না হয়’

Advertisement

Icon

বাসস

প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৩৬ এএম

‘আমি একটি স্থায়ী কাজ চাই, যাতে আর জীবন বাজি রেখে গাছে উঠতে না হয়’

Advertisement

শারীরিক প্রতিবন্ধিতা ও পদে পদে দুর্ঘটনার ঝুঁকি জয় করে অদম্য সাহসে ছয় সদস্যের পরিবারের হাল ধরেছেন ৩২ বছর বয়সী যুবক একরামুল হক।

রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার দক্ষিণ মাধামোড়ন গ্রামের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মো. আব্দুল করিমের ছেলে একরামুল। তার এক পা পুরোপুরি অকেজো এবং অন্য পা-ও বেশ দুর্বল। বগলে ক্রাচ গুঁজে কয়েক কদম হাঁটা যেখানে তার জন্য এক কঠিন যুদ্ধ, সেখানে জীবনের তাগিদে তিনি প্রতিদিন উঠে যান উঁচু উঁচু গাছের মগডালে। 

কখনো গাছের ডালপালা ছাঁটেন, আবার কখনো এক গাছ থেকে অন্য গাছে লাফিয়ে গিয়ে কাজ করেন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে। সামান্য উপার্জনের জন্য প্রতিদিন এভাবেই মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন তিনি।

শারীরিক সীমাবদ্ধতাকে অজুহাত না বানিয়ে বা কারও কাছে হাত না পেতে নিজের হাড়ভাঙা খাটুনি দিয়ে জীবিকা নির্বাহের পথ বেছে নিয়েছেন একরামুল।

বাসসের সঙ্গে আলাপকালে একরামুলের স্ত্রী হাসনা বানু (২৮) জানান, একরামুল জন্মগতভাবে সুস্থ ও স্বাভাবিক হাত-পা নিয়েই জন্মেছিলেন। তবে চার বছর বয়সে এক ভয়াবহ জ্বরে আক্রান্ত হয়ে তার একটি পা ধীরে ধীরে অবশ ও অকেজো হয়ে যায়। তা সত্ত্বেও পড়াশোনা থামাননি তিনি, পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা চালিয়ে যান।

ছোটবেলায় সহপাঠী, বন্ধু ও প্রতিবেশীদের সহজে সুপারিসহ নানা গাছে উঠতে দেখে একরামুলের মনেও ইচ্ছে জাগত গাছে ওঠার। কিন্তু প্রতিবন্ধিতার কারণে সেই সাধ পূরণ না হওয়াটা তার মনে গভীর বেদনার জন্ম দেয়।

হাসনা বানু বলেন, ‘অবশেষে সেই আফসোসই তাঁর জেদে পরিণত হয়। এক পায়ে ভর দিয়েই তিনি গাছে ওঠা শেখেন। আজ সেই দক্ষতাই তার ও পরিবারের একমাত্র জীবিকার মাধ্যম।’

একরামুলের বাবা দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী এবং বোন বিধবা। ফলে পুরো পরিবারের ভরণপোষণের মূল দায়িত্ব এসে পড়েছে তার একার কাঁধেই। প্রতিদিন ক্রাচে ভর দিয়ে বেরিয়ে পড়েন তিনি, আর গাছ ছাঁটাইয়ের মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নেমে পড়েন।

হাসনা বানু আরও বলেন, ‘সমতল ভূমিতে হাঁটাই যার জন্য এক বিরাট চ্যালেঞ্জ, সে কীভাবে গাছের মগডালে গিয়ে কাজ করে—তা নিজের চোখে না দেখলে কেউ কল্পনাও করতে পারবে না।’

একরামুলের বিশ্বাস, যদি তিনি ভয়, অজুহাত কিংবা নিজের শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে জয় করতে না পারতেন, তবে জীবনে কিছুই অর্জন করতে পারতেন না।

তিনি স্বীকার করেন যে, এই কাজটিতে শারীরিক কষ্ট অনেক বেশি এবং গাছে চড়া একই সঙ্গে ভীতিজনক ও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

তবুও তিনি জানেন যে, ভয়ের কাছে হার মানার কোনো সুযোগ তার নেই। দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করা একটি সংসারে কাজের একটি দিন বন্ধ থাকা মানেই চুলো না জ্বলার উপক্রম। তার আশঙ্কা, গাছ ছাঁটার কাজে মাত্র একদিন অনুপস্থিত থাকলেই পরিবারের জন্য রান্নার মতো চাল-ডালও জুটবে না। প্রিয়জনদের মুখে দু-মুঠো ভাত ও পরিধেয় বস্ত্র তুলে দিতেই তিনি এই চরম ঝুঁকি নিচ্ছেন।

ঝুঁকিপূর্ণ এই কাজ থেকে দিনে মাত্র ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা আয় হয় একরামুলের। সম্প্রতি ডাল কাটতে গিয়ে গাছ থেকে পড়ে আহতও হয়েছিলেন তিনি। কিন্তু বাবা ও বিধবা বোনসহ ক্ষুধার্ত পরিবারের মুখগুলোর কথা ভেবে আঘাতের তোয়াক্কা না করে পরদিনই আবার কাজে ফিরেছেন তিনি।

নিজের আকুতি জানিয়ে একরামুল বাসসকে বলেন, ‘আমি একটি স্থায়ী কাজ চাই, যাতে আর জীবন বাজি রেখে গাছে উঠতে না হয়। সরকার কিংবা সমাজের বিত্তবান মানুষেরা যদি একটু সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেন, তবে আমার পরিবারটি বেঁচে যায়।’

একরামুলের বয়োবৃদ্ধ ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী বাবা আব্দুল করিম আবেগজড়িত কণ্ঠে বাসসকে বলেন, ‘আমার পৃথিবীটা অন্ধকারে ঢাকা। আমি নিজে তো কিছু করতে পারি না। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও আমার ছেলেকে বাধ্য হয়ে প্রতিদিন গাছে উঠতে হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘বাবা হিসেবে ছেলের এই কষ্ট দেখা অত্যন্ত অসহনীয়। একটি স্থায়ী আয়ের ব্যবস্থা থাকলে একরামুলকে এমন জীবনঘাতী যুদ্ধে নামতে হতো না। প্রতিদিন ছেলে যখন কাজের উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হয়, কখন কোন দুর্ঘটনা ঘটে যায়—সেই ভয়ে বুকটা দুরুদুরু করে কাঁপে। কিন্তু আমাদের তো অন্য কোনো উপায়ও নেই।’

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

আবু সাঈদ এ দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মূল পথিকৃৎ: ত্রাণমন্ত্রী

আবু সাঈদ এ দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মূল পথিকৃৎ: ত্রাণমন্ত্রী

আলামতের সঙ্গে গ্রেফতার দুজনের ডিএনএর মিল পাওয়া গেছে

রংপুরে ৪ খুন আলামতের সঙ্গে গ্রেফতার দুজনের ডিএনএর মিল পাওয়া গেছে

রংপুরে এলপিজি স্টেশনে কৃত্রিম সংকটের অভিযোগ, মজুত থাকলেও মিলছে না গ্যাস

রংপুরে এলপিজি স্টেশনে কৃত্রিম সংকটের অভিযোগ, মজুত থাকলেও মিলছে না গ্যাস

দেশের ৪ বিভাগে বজ্রবৃষ্টির পূর্বাভাস

দেশের ৪ বিভাগে বজ্রবৃষ্টির পূর্বাভাস

যৌন হয়রানির অভিযোগে বেরোবির তিন শিক্ষকের পদাবনতি

যৌন হয়রানির অভিযোগে বেরোবির তিন শিক্ষকের পদাবনতি

বেরোবির তিন শিক্ষকসহ ১১ জন স্থায়ী বহিষ্কার

আবু সাঈদ হত্যা বেরোবির তিন শিক্ষকসহ ১১ জন স্থায়ী বহিষ্কার

আরও পড়ুন

তাজমীন হত্যাকাণ্ড: সিসিটিভি ফুটেজে যা দেখা গেল

তাজমীন হত্যাকাণ্ড: সিসিটিভি ফুটেজে যা দেখা গেল

তাজমীন হত্যাকাণ্ডেও জড়িত আইফোন, তদন্তে বেরিয়ে এলো চাঞ্চল্যকর তথ্য

তাজমীন হত্যাকাণ্ডেও জড়িত আইফোন, তদন্তে বেরিয়ে এলো চাঞ্চল্যকর তথ্য

ধর্ষণের পর তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী অন্তঃসত্ত্বা, অতঃপর...

ধর্ষণের পর তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী অন্তঃসত্ত্বা, অতঃপর...

শীতের আগমনী বার্তা, যে জেলায় তাপমাত্রা সবচেয়ে কম

শীতের আগমনী বার্তা, যে জেলায় তাপমাত্রা সবচেয়ে কম

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম