রসিক নির্বাচন ঘিরে সরগরম
ফাঁকা মাঠে জাপা-জামায়াত দ্বৈরথ, দৌড়ে বিএনপির তিন নেতা
Advertisement
মাহবুব রহমান, রংপুর ব্যুরো
প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৫১ পিএম
ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
রংপুর সিটি করপোরেশন (রসিক) নির্বাচনের দিনক্ষণ এখনো ঘোষণা করেনি নির্বাচন কমিশন। তবে সম্ভাব্য নির্বাচনকে ঘিরে মেয়র প্রার্থীদের তৎপরতা পুরোদমে শুরু হয়ে গেছে। নির্বাচনি মাঠে জাতীয় পার্টি (জাপা), জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির একক প্রার্থীর অবস্থান দেখা গেলেও বিএনপিতে রয়েছে একাধিক মনোনয়নপ্রত্যাশীর দৌড়ঝাঁপ।
সব মিলিয়ে আওয়ামী লীগ বিহীন একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে জাতীয় পার্টি ও জামায়াত প্রার্থীর মধ্যেই মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ দ্বিমুখী লড়াইয়ের প্রবল সম্ভাবনা দেখছেন স্থানীয় ভোটাররা। তবে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে কোনোভাবে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেলে সেই হিসাব সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারে।
রংপুর পৌরসভাকে ২০১২ সালে সিটি করপোরেশনে উন্নীত করা হয়। প্রথম নির্বাচনে মেয়র নির্বাচিত হন প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা সরফুদ্দিন আহমেদ ঝন্টু। এরপর ২০১৭ সাল থেকে ২০২৪ সালের আগস্টে অপসারণের আগ পর্যন্ত দীর্ঘ ৬ বছর ৮ মাস মেয়রের দায়িত্ব পালন করেন জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা। বিগত নির্বাচনগুলোর নেপথ্য সমীকরণ ছিল— জাতীয় রাজনীতির গোপন সমঝোতার অংশ হিসেবে আওয়ামী লীগ প্রায়ই রংপুরের সংসদীয় আসন ও সিটির মেয়র পদে জাতীয় পার্টিকে ছাড় দিত। ফলে বিগত নির্বাচনগুলোতে সুবিধাজনক অবস্থানে ছিল জাতীয় পার্টি।
তবে এবার আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থী দেওয়ার সুযোগ না থাকলে ভোটের সমীকরণ বদলে যাবে বলে মনে করছেন স্থানীয় সাধারণ ভোটাররা। নগরীর গুপ্তপাড়ার ভোটার হারুন অর রশিদ ও সেনপাড়ার ভোটার হাসান আলীসহ একাধিক ভোটারের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র উঠে এসেছে।
৫ আগস্ট পট পরিবর্তনের পর দেশের অন্যান্য সিটি করপোরেশনের মতো রংপুরেও নির্বাচিত প্রতিনিধিদের অপসারণ করে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়। বর্তমানে দ্বিতীয় দফায় প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করছেন রংপুর মহানগর বিএনপির সদস্যসচিব অ্যাডভোকেট মাহফুজ-উন-নবী চৌধুরী ডন। তিনিও আসন্ন নির্বাচনে মেয়র প্রার্থী হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। সে লক্ষ্যে সিটির ৩৩টি ওয়ার্ডেই নানা সামাজিক ও উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ভোটারদের সঙ্গে সম্পৃক্ততা বাড়াচ্ছেন তিনি।
অ্যাডভোকেট মাহফুজ-উন-নবী ডন বলেন, দীর্ঘদিন ধরে দমন-পীড়ন ও প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে মাঠে আছি। আসন্ন নির্বাচনে দলের কাছে মনোনয়ন চাইব। দল আমাকে মনোনয়ন দিলে বিজয়ী হতে পারব বলে শতভাগ বিশ্বাস করি।
এদিকে মহানগর বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক শহিদুল ইসলাম মিজু এবং যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি ও রংপুর জেলা সভাপতি নাজমুল আলম নাজুও মেয়র পদে মনোনয়ন পেতে ওয়ার্ড পর্যায়ে গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন।
শহিদুল ইসলাম মিজু বলেন, ছাত্রজীবন থেকেই বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে আছি। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জেল খেটেছি, অবর্ণনীয় নির্যাতন সহ্য করেছি। দল নিশ্চয়ই ত্যাগীদের মূল্যায়ন করবে। আমাকে মনোনয়ন দেওয়া হলে বিজয় নিশ্চিত করতে পারব।
যুবদল নেতা নাজমুল আলম নাজুও আশাবাদী। তিনি জানান, দলের দুঃসময়ে মাঠে থেকে লড়াই করেছেন, ফলে কেন্দ্র তাকে প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করবে বলে তিনি প্রত্যাশা করছেন।
অন্যদিকে জামায়াতের পক্ষ থেকে একক মেয়র প্রার্থী হিসেবে রংপুর মহানগর আমির এটিএম আজম খানের নাম দলীয়ভাবে ঘোষণা করা হয়েছে।
এছাড়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের রংপুর মহানগর সাধারণ সম্পাদক আমিরুজ্জামান পিয়াল এবং জাতীয় ছাত্র সমাজের কেন্দ্রীয় সাবেক সভাপতি ও এনসিপির জেলা আহ্বায়ক আল মামুনও জনসংযোগ চালাচ্ছেন।
তবে পিয়াল ও মামুন জানিয়েছেন, ১১ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে একক প্রার্থী চূড়ান্ত করা হলে তারা জোটের সিদ্ধান্ত মেনে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াবেন।
এমন প্রেক্ষাপটে শেষ পর্যন্ত লড়াইটা জাতীয় পার্টির সাবেক মেয়র মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা এবং জামায়াতের এটিএম আজম খানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। সেখানে মোস্তফার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ও লাঙলের ভোটব্যাংক যেমন ভারী, তেমনি জামায়াতের নির্বাচনি ছকও ভিন্ন। গত সংসদ নির্বাচনে জামায়াতের সুনির্দিষ্ট নির্বাচনি কৌশলের কাছে পরাজিত হয়েছিলেন মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক সামসুজ্জামান সামু।
সামসুজ্জামান সামুও মেয়র পদে লড়তে পারেন বলে তার ঘনিষ্ঠজনরা জানিয়েছেন। তবে এ বিষয়ে তিনি বলেন, নির্বাচনে অংশ নেওয়া পুরোপুরি দলের হাইকমান্ডের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে। দল যাকে যোগ্য মনে করবে, তিনিই প্রার্থী হবেন।
রাজনৈতিক মহলের মতে, জাতীয় পার্টি ও আওয়ামী লীগ বিহীন সংসদ নির্বাচনে জামায়াত সহজে জিতলেও সিটি নির্বাচনে চিত্র এক না-ও হতে পারে। তবে জামায়াত একটি সুসংগঠিত দল হওয়ায় তাদের সমর্থকদের শতভাগ উপস্থিতি ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলবে। পাশাপাশি ১১ দলীয় জোটের সমমনা ভোটও জামায়াত প্রার্থীর পক্ষে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে স্থানীয় রাজনৈতিক দলগুলোর ধারণা, সাবেক মেয়র মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চলমান অনুসন্ধান সক্রিয় হলে কিংবা তিনি কোনো মামলায় গ্রেফতার হলে নির্বাচনি দৃশ্যপট দ্রুত পাল্টে যাবে। সে ক্ষেত্রে বিএনপির একক প্রার্থীই হয়ে উঠবেন জামায়াতের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী; আর তখন বর্তমান সিটি প্রশাসক মাহফুজ-উন-নবী ডনের পাল্লাই ভারি হতে পারে।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের ২৭ ডিসেম্বরের রসিক নির্বাচনে মোট ভোটার ছিল ৪ লাখ ২৬ হাজার ৪৬৯ জন। ৩৩টি ওয়ার্ডের ২২৯টি কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ করা হয়। সাধারণ ও সংরক্ষিত মিলে ২৪৬ জন কাউন্সিলর প্রার্থীর মধ্যে আওয়ামী লীগের ১৪ জন, জাতীয় পার্টির ৬ জন, বিএনপির ২ জন, বাসদের ১ জন এবং ১০ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী নির্বাচিত হয়েছিলেন।
বিগত সময়ের কাউন্সিলর নির্বাচনের পরিসংখ্যান বিবেচনা করলে মাঠে আওয়ামী লীগ থাকলে ফলাফল যেকোনো দিকে যেতে পারত। কিন্তু আওয়ামী লীগের শূন্যতা এবং তাদের নির্বাচিত ১৪ জন কাউন্সিলরের বিরুদ্ধে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মামলা থাকায় তাদের বেশির ভাগই এখন পলাতক কিংবা কারাগারে।
ফলে এই উন্মুক্ত ও ফাঁকা রাজনৈতিক মাঠে শেষ পর্যন্ত রংপুরের নগরপিতা কে হচ্ছেন, সেদিকেই তাকিয়ে আছে রংপুরবাসী।


