নাক-মুখ দিয়ে বাড়ছে মাংস, রিকশাচালক বাবাকে বাঁচাতে শিশুর আকুতি
গৌরীপুর (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ০৯:৪১ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
শুষ্ক মৌসুমে অসংখ্য ছিদ্র দিয়ে আলোকরশ্মি উঁকি দেয়, আর বর্ষায় ভাঙা ঘরে অঝরে পড়ে বৃষ্টির পানি। কোথাও পলিথিন, কোথাও বস্তা, আবার কোথাও জনসভার নষ্ট ব্যানারের নিচে মাথা গোঁজার চেষ্টা।
সেই ঘরেই এক ছেলে আর মেয়েকে নিয়ে চলছিল আব্দুল আলীর (৩২) নিরানন্দের সংসার। অভাবের এ সংসারে হানা দিয়েছে ‘মাংসবৃদ্ধি’ রোগ।
চিকিৎসকদের ভাষ্যমতে, তিনি ‘বাইল্যাটারাল নাসাল মাস’ ও ‘রাইনোস্পোরিডিওসিস’ নামের বিরল রোগে আক্রান্ত। এ রোগের কারণে তার নাক, মুখ, কান দিয়ে মাংস বাড়ছে; চোখের ভেতরে ও বাইরেও মাংস বেড়ে যাচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে জাতীয় নিউরোসায়েন্স ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ডা. আয়েশা খাতুন জানান, চোখের কোটর, নাকের ও মুখের গহ্বরে অতিরিক্ত মাংসপিণ্ড হওয়ায় ধমনি ও শিরার মধ্যকার সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। কানের মধ্যেও একই সমস্যা রয়েছে।
জানা যায়, এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার আগে রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন আব্দুল আলী। তিনি ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার পৌর শহরের সতিষা গ্রামের প্রয়াত আব্দুস সোবহানের ছেলে। দাম্পত্য জীবনে তার দুই সন্তান রয়েছে। বড় ছেলে রুহান মিয়া সতিষা পৌর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণিতে অধ্যয়নরত আর মেয়ে রোকিয়া আক্তারের বয়স মাত্র এক বছর দুই মাস। মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকু ছাড়া ওদের সহায়-সম্পদ বলতে কিছুই নেই।
এ রোগে আক্রান্ত হয়ে গত ৯ এপ্রিল থেকে ৩ অক্টোবর পর্যন্ত তিনি ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। বর্তমানে তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি আছেন। এছাড়া জাতীয় চক্ষু ইনস্টিটিউটেও চোখের চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।
বাবার দুঃসময়ে ছোট্ট রুহান অসহায় চোখে পথ চেয়ে আছে, কখন তার বাবা বাড়ি ফিরবেন। বাড়ির সামনে রিকশার বেল কখন বেজে উঠবে। বাবার ডাক শুনবে ‘রুহান, রুহান!’ ফ্যালফ্যাল চোখে বাবার কথা বলতেই নিঃশব্দে গড়িয়ে পড়ছে পানি।
অসহায় রুহান বলল- ‘আমার বাবাকে বাঁচান, আব্বা কখন আসবে! আমি ও ছোট্ট বোনটাকে বাঁচিয়ে রাখতে, প্লিজ বাবাকে সহযোগিতা করুন।’
আব্দুল আলীর বড় ভাই মঞ্জুরুল ইসলাম জানান, তিনি দিনমজুরি করে চলেন। কাজ থাকলে পেটে ভাত জোটে। এখন ভাইকে নিয়ে এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ছুটছেন। নিজের জমানো ৩০-৪০ হাজার টাকা ছিল, সব শেষ। নিজের বলতে আর কিছু নেই। ভাইকে বাঁচাতে তার রিকশাটাও বিক্রি করে দিয়েছেন।
তিনি আরও জানান, হাসপাতাল থেকে শুধু আব্দুল আলীকে খাবার দেয়। তিনি আর আব্দুল আলীর স্ত্রী দৈনিক যে খাবারটা বাইরে থেকে কিনে খাবেন, সেই সামর্থ্যটুকুও নেই। অন্য রোগীদের দেওয়া বাড়তি খাবার খেয়ে তারা বেঁচে আছেন।
মঞ্জুরুল ইসলাম বলেন, ভাইটাকে বাঁচাতে চাই। ও না বাঁচলে ওর দুটো সন্তান এতিম হয়ে যাবে। আমার তো আর কিছু নেই। ডাক্তার বলছেন অপারেশনে ২-৩ লাখ টাকা লাগবে, সেই টাকা কোথায় পাব? আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীরাও সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছেন। আমাদের চেষ্টা অব্যাহত আছে। অপারেশন করতে পারলে সে সুস্থভাবে বাড়ি ফিরতে পারবে। তার জন্য মহান সৃষ্টিকর্তা ও সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।
