‘পটিয়ায় কেউ মেয়ে দেবেন না’ স্ট্যাটাস ভাইরাল
আবেদ আমিরী, পটিয়া (চট্টগ্রাম)
প্রকাশ: ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ০৯:৫৪ পিএম
চট্টগ্রামের পটিয়ায় যৌতুকের জন্য প্রাণ দেওয়া গৃহবধূরা
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
চট্টগ্রামের পটিয়ায় যৌতুকের দাবিতে একের পর এক গৃহবধূ খুনের ঘটনা ঘটছে। হত্যার ধরন একেক রকম হলেও নেপথ্যের কারণ সেই যৌতুক। গত এক দশকে এখানে অনেক গৃহবধূ নিহত হয়েছেন।
এর মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে পটিয়ায় কোনো মেয়েকে বিয়ে না দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে দেওয়া একটি স্ট্যাটাস সবার নজর কেড়েছে।
গত ২৬ অক্টোবর নাজনিন সুলতানা নামের এক ফেসবুক আইডি থেকে দেওয়া স্ট্যাটাসটি ভাইরাল হয়। স্ট্যাটাসটিতে লেখা ছিল—‘চট্টগ্রামের পটিয়ায় কেউ মেয়ে বিয়ে দেবেন না। ওরা চট্টগ্রামের মানসম্মান ডোবাচ্ছে।’
সর্বশেষ গত ২৬ অক্টোবর রাতে তানিয়া কামাল নামের এক গৃহবধূকে দেয়ালের সঙ্গে মাথা ঠুকে ও গলাটিপে হত্যা করা হয়। ৯ মাসের অন্তঃসত্ত্বা তানিয়া ওই দিন রাত ১১টায় তার মায়ের সঙ্গে ফোনে শেষবার কথা বলেছিলেন। বলেছিলেন- ‘মা, আমি কাল বাড়িতে আসব।’ কয়েক দিন পরই তার সন্তান জন্ম দেওয়ার কথা ছিল; কিন্তু বাবার বাড়িতে তিনি ফিরেছেন লাশ হয়ে। ঘটনার দুই দিন পর নিহতের স্বামী নুর উদ্দিন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। নিহত তানিয়া উপজেলার কুসুমপুরা ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের হরিণখাইন গ্রামের মোহাম্মদ কামালের মেয়ে এবং হাবিলাসদ্বীপ ইউনিয়নের চরকানাই মোনাফ হাজিরপাড়ার নুর উদ্দিনের স্ত্রী।
এর মাত্র কয়েক দিন আগে মারা যান সিফাতুন নূর সিফাত (২২) নামের আরেক গৃহবধূ। বাবার বাড়ি থেকে নাস্তা কম দেওয়ার অভিযোগে তাকে নির্যাতনের পর হত্যার অভিযোগ ওঠে। একটি ভিডিওতে দেখা যায়, নাস্তা কম দেওয়ায় বরের মা তার পুত্রবধূ ও বেয়াইনের (মেয়ের মা) সঙ্গে খারাপ আচরণ করছেন। এরপর স্বামীর বাড়ি থেকে রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হলে ২৩ অক্টোবর মারা যান তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা সিফাতুন। ১৪ অক্টোবর তাকে নির্যাতন করা হয়েছিল। কয়েক দিনের ব্যবধানে দুই অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে পটিয়াসহ চট্টগ্রামে যৌতুক প্রথা নিয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়।
স্থানীয়রা জানান, এ ধরনের ঘটনা পটিয়ায় নতুন নয়। এর আগে ২০২৪ সালের ১৪ ডিসেম্বর জঙ্গলখাইন গ্রামের সিরাজ গাজীবাড়িতে নৃশংসভাবে খুন হন শিউলী বেগম। ২০২৩ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি পিটিয়ে আহত করার ৭ দিন পর ১৩ ফেব্রুয়ারি চমেক হাসপাতালে মারা যান বেবী আকতার (৩৬)। তিনি হাইদগাঁও ইউনিয়নের পূর্ব হাইদগাঁওয়ের আমির বাড়ির লোকমান হাকিমের মেয়ে। ২০২২ সালের ১৫ এপ্রিল বিয়ের মাত্র এক মাসের মাথায় প্রিয়াংকা মল্লিক (২৫) নামের এক নববধূর রহস্যজনক মৃত্যু হয়। একই বছরের ২২ অক্টোবর শোভনদণ্ডী ইউনিয়নে রিমু চৌধুরী (২০) নামের এক গৃহবধূকে যৌতুকের দাবিতে নির্যাতনের পর হত্যা করা হয়। ২০১৮ সালের ১৪ নভেম্বর জুবাইর মোস্তফা চুমকী (২২) নামের এক গৃহবধূর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এছাড়া ২০১৭ সালের ২১ অক্টোবর স্বামীর নির্যাতনে আহত হয়ে ১৯ দিন পর ১০ নভেম্বর মারা যান কৈয়গ্রাম এলাকার গৃহবধূ পারভীন আকতার (৩৮)।
চট্টগ্রাম জজ আদালতের আইনজীবী ও পটিয়া আইনজীবী সমিতির নেত্রী শাহিনা আক্তার জানান, চট্টগ্রামে দেনাপাওনার সামাজিক প্রথা না মানলে অধিকাংশ গরিব ও মধ্যবিত্ত পরিবারের নারীদের বিয়ে হয় না। বাধ্য হয়ে সামাজিকভাবে আগাম দেনাপাওনার তালিকা করেই বিয়ে দিতে হয়। উভয়পক্ষের মান্যগণ্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে তৈরি করা ওই তালিকাকে স্থানীয় ভাষায় 'ফর্দ' বলা হয়। উচ্চবিত্তদের ক্ষেত্রে কাবিনের অঙ্ক অস্বাভাবিক থাকে। সম্মান বাড়াতে কনেপক্ষ বিয়ের সময় এককালীন তৈজসপত্র, আসবাব, ফ্ল্যাট, গাড়ি, মোটরসাইকেল এবং এক বছর ধরে নানা উপলক্ষে উপহার দিয়ে সামাজিক যৌতুক প্রথাকে ধারণ করে। এই প্রথার ফলে প্রায় প্রতিদিনই ভাঙছে বহু নারীর সংসার, নিয়মিত হচ্ছে মামলা-মোকদ্দমা।
পটিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার ফারহানুর রহমান জানান, চট্টগ্রামে যৌতুক একটি সামাজিক প্রথায় পরিণত হয়েছে। এটি একটি সামাজিক ব্যাধি। এই প্রথা থেকে উত্তরণে আইন প্রয়োগের চেয়ে সামাজিক সচেতনতা ও ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলা বেশি জরুরি।
পটিয়া থানার ওসি জিয়াউল হক বলেন, বিয়ের সময় উপহার ও পরবর্তী এক বছর কনের বাড়ি থেকে বরের পরিবারে লেনদেনের বিষয়টি খুবই খারাপ প্রথা। পটিয়াসহ পুরো চট্টগ্রামে প্রথাটি চলমান। এই প্রথা থেকে সচেতনতার মাধ্যমে উত্তরণ জরুরি।
