Logo
Logo
×

Advertisement

সারাদেশ

নয়ন বন্ড ভয়ঙ্কর অপরাধী হয়ে উঠে প্রশাসন ও রাজনৈতিক প্রশ্রয়ে

Advertisement

Icon

যুগান্তর রিপোর্ট

প্রকাশ: ০১ আগস্ট ২০১৯, ০২:০০ পিএম

নয়ন বন্ড ভয়ঙ্কর অপরাধী হয়ে উঠে প্রশাসন ও রাজনৈতিক প্রশ্রয়ে

Advertisement

বরগুনায় চাঞ্চল্যকর রিফাত শরীফ হত্যা মামলার প্রধান আসামি সাব্বির আহমেদ ওরফে নয়ন বন্ড কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে। সে এ হত্যার পরিকল্পনা থেকে শুরু করে হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নেয়। সে তার লোকজন নিয়ে স্ত্রীর সামনেই রিফাতকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করে।

নয়ন বন্ডের মৃত্যুর পর তার সম্পর্কে বহু চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে আসছে। সাব্বির আহমেদ থেকে নয়ন বন্ড হয়ে উঠার পেছনে কাজ করেছে বরগুনার রাজনৈতিক শক্তি ও প্রশাসন। এ দুটির প্রশ্রয়েই ছিঁচকে চোর থেকে ভয়ঙ্কর অপরাধী হয়ে উঠেন নয়ন বন্ড। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে এসব তথ্য।  

নয়ন বন্ড বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে- প্রশাসনের পক্ষ থেকে এমন দাবি করা হলেও স্থানীয়রা সেটি মানতে নারাজ। তারা বলছেন, নয়ন বন্ডকে ‘মেরে ফেলা’ হয়েছে। নয়ন গ্রেফতার হলে স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক মহলের মুখোশ উন্মোচিত হয়ে যেত- এ কারণেই তাকে ‘হত্যা’ করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, স্থানীয় পুলিশের অনেক অসাধু কর্মকর্তার কুর্কীতিও সামনে চলে আসত নয়ন বেঁচে থাকলে। 

স্থানীয়রা বলছেন, আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নির সঙ্গে পূর্ব সম্পর্কের জেরে নয়ন বন্ড রিফাত শরীফকে খুন করেছে এটি যেমন সত্য, ঠিক তেমনি সত্য হচ্ছে- নয়নের ‘বন্ড’ হয়ে উঠার পেছনে রাজনীতিবিদরাই দায়ী।  

অন্য অপরাধীর মতো নয়নের উত্থানটাও ছিল বেশ চমকের। নয়নের একসময়ের সহপাঠীরা জানান, স্থানীয় সংসদ সদস্যের ছেলে সুনাম দেবনাথ ও থানার কতিপয় অসাধু পুলিশ কর্মকর্তার আশকারায় সাব্বির আহমেদ থেকে নয়ন বন্ড হয়ে উঠে সে।

নয়নের বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার পর স্থানীয় এমপিপুত্র সুনাম দেবনাথ এবং তার চাচাতো শ্যালক শাওন তালুকদার ও অভিজিৎ তালুকদারের সঙ্গে নয়নের সখ্য গড়ে ওঠে। অভিজিৎ ও নয়ন একসঙ্গে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন। তখন বিভিন্ন ছাত্রাবাসে গিয়ে ছাত্রদের কাছ থেকে মুঠোফোন ও টাকা ছিনিয়ে নেয়া, চাঁদাবাজি ও মোটরসাইকেল ছিনিয়ে নেয়া ছিল তাদের নিয়মিত কাজ।

তাদের আশ্রয়ে ছিঁচকে চোর থেকে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হয়ে উঠে নয়ন। মাদক, নারী, অবৈধ টাকা এসবের সঙ্গে ছিল তার নিত্য আনাগোনা। নিজের বাংলোয় (বিশেষ কক্ষ) ডেকে নিয়ে বহু তরুণীর সর্বনাশ করেছে নয়ন। নারীর পাশাপাশি মাদক নেশায়ও বুঁদ হয়ে পড়েছিল নয়ন।

সন্ত্রাসের পাশাপাশি ইয়াবা ব্যবসায়ও ছিল তার বড় হাত। এসব অপরাধের মধ্য দিয়ে অল্প সময়ের ব্যবধানে এলাকার নেতৃত্বাস্থানীয়দের নজরে চলে নয়ন। তার সঙ্গে সখ্য গড়ে উঠে এলাকার রাজনৈতিক মহলের। পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গেও নয়নের ওঠবস ছিল চোখে পড়ার মতো। 

২০১৭ সালের শেষ দিকে বিপুল মাদকসহ পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয় নয়ন। ওই একই রাতে পুলিশ অভিযান চালায় কলেজ রোডের সুনাম দেবনাথের প্রতিষ্ঠান সুনাম দেবনাথ ব্লাড ফাউন্ডেশনের অফিসে। পুলিশ যখন ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করেছিল, তখন পেছন দিয়ে পালিয়ে যায় দুই-তিনজন।

বলাবলি হচ্ছে- ‘ওই অফিসে যদি অপরাধ কর্মকাণ্ড নাই-ই ঘটবে, তা হলে কেন তাদের পালিয়ে যেতে হলো?’ তার পর বন্ধ হয়ে যায় সুনাম ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম। জেলা আওয়ামী লীগের এক নেতা বলেন, ‘রিফাত হত্যার পর সুনামই গণমাধ্যমে বলেছেন, রিফাত তাদের কর্মী ছিল। রিফাতকে অনেক ভালোবাসতেন।’ মজার ব্যাপার হচ্ছে- এই রিফাতও মাদকসহ গ্রেফতার হয়েছিল। রিফাত হত্যার পর আলোচনায় আসে নয়ন বন্ডের ‘০০৭ গ্রুপ’ ও ‘টিম সিক্সটি’ নামের দুটি গ্রুপ। টিম সিক্সটির প্রধান হচ্ছে- মঞ্জুরুল আলম জন। জনের বিরুদ্ধে রয়েছে মাদকের পাইকারি বাণিজ্যের অভিযোগ।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নয়ন বন্ড প্রথমে ছিঁচকে চোর ছিল। একপর্যায়ে মেয়েদের হ্যান্ডব্যাগ, মোবাইল ফোন নিয়ে দৌড় দিত। তবে নিষিদ্ধ মাদকের জগতে ঢুকে সে ক্ষমতাবান হয়ে ওঠে। বছরখানেক ধরে জেলার প্রভাবশালী লোকজনের সঙ্গে নয়নের ওঠবস শুরু হয়। কয়েক মাস ধরে সে বেপরোয়া হয়ে ওঠে।

নয়নের একসময়ের ঘনিষ্ঠ বন্ধু নূর হোসেন জানান, বাবার মৃত্যুর কিছু দিন পর প্রেমে বিচ্ছেদ হয়। এর পর নয়ন গাঁজা সেবন শুরু করেন। ২০১১ সালে মাধ্যমিক পেরোনোর আগেই সে ইয়াবা ও হেরোইনে আসক্ত হয়ে পড়ে। তখন মাদকের টাকা জোগাতে মানুষের মুঠোফোন, গহনা ছিনিয়ে নেয়ার মতো ছিঁচকে অপরাধ শুরু করে।

মাদকের টাকার জন্য নয়নের এমন অপরাধ দিন দিন বাড়তে থাকে। ২০১৫ সালের মধ্যে তার বিরুদ্ধে অস্ত্র, ছিনতাইসহ বিভিন্ন অভিযোগে পাঁচটি মামলা হয়। ভুক্তভোগীরা তখন বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তির কাছে নয়নের বিষয়ে অভিযোগ করতে শুরু করেন। নয়নও তখন রাজনৈতিক আশ্রয় খুঁজতে শুরু করেন। একপর্যায়ে জেলা ছাত্রলীগের সহসভাপতি মুরাদ হোসেইনের হাত ধরে রাজনীতিতে সক্রিয় হয়

নয়নের বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার পর সুনাম দেবনাথ এবং তার চাচাতো শ্যালক শাওন তালুকদার ও অভিজিৎ তালুকদারের সঙ্গে নয়নের সখ্য গড়ে ওঠে। অভিজিৎ ও নয়ন একসঙ্গে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হয় তখন বিভিন্ন ছাত্রাবাসে গিয়ে ছাত্রদের কাছ থেকে মুঠোফোন ও টাকা ছিনিয়ে নেয়া, চাঁদাবাজি ও মোটরসাইকেল ছিনিয়ে নেয়া ছিল তাদের নিয়মিত কাজ। তবে সুনাম দেবনাথ বরাবরই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন।

বরগুনা শহরে সাধারণ লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নয়ন বন্ডের ক্ষমতার উৎস শহরের কারও কাছেই অজানা নয়। বিভিন্ন রাজনৈতিক সভা-সমাবেশে নয়নকে স্থানীয় প্রভাবশালীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মিশতে দেখা গেছে। বখাটে নয়নকে নষ্ট রাজনীতিতে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে অসাধু রাজনীতিকরা।

হলিউডের বিখ্যাত সিনেমা ‘০০৭ লাইসেন্স’র নায়কের নামানুসারে নিজের নামের সঙ্গে ‘বন্ড’ যুক্ত করে নয়ন। এর পর সিনেমাটির গল্পের আদলে গড়ে তোলেন সন্ত্রাসী বাহিনী।

নয়নের বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে, নয়নের ঘরে সাদা দেয়ালে লাল রঙ দিয়ে এক জায়গায় লেখা ০০৭ (নয়নের সন্ত্রাসী গ্রুপের সাংকেতিক নাম)।

প্রসঙ্গত ‘০০৭ লাইসেন্স’ একটি বিখ্যাত হলিউড সিনেমা সিরিজ। সিনেমার মৌলিক গল্প অনুযায়ী ০০৭ হচ্ছে মানুষ হত্যার লাইসেন্স। এতে যিনি নায়কের চরিত্রে অভিনয় করেন, তার নাম জেমস বন্ড।

স্থানীয়ভাবে জানা গেছে, এই ছবি দেখে নয়ন বিশেষভাবে প্রভাবিত হয় এর পর নিজেকে ‘০০৭ লাইসেন্স’ সিনেমার নায়ক ভাবতে শুরু করেন। একপর্যায়ে নিজের নামের সঙ্গে নিজেই যুক্ত করে দেয় ‘বন্ড’ শব্দটি এবং একই সঙ্গে গড়ে তোলেন ০০৭ নামের সন্ত্রাসী বাহিনী। এই বাহিনী নয়নের হুকুমে চলত। তার নির্দেশমতো অপকর্ম করে বেড়াত।

পুলিশের সঙ্গে ছিল নয়নের নিত্য ওঠবস। শহরের বাসিন্দারা এমনও বলছেন, নয়ন চাইলে যে কাউকে পুলিশ দিয়ে হয়রানি বা গ্রেফতার করাতে পারত। নয়ন কাজ করত পুলিশের বিশ্বস্ত সোর্স হিসেবে।

সন্ত্রাসের পাশাপাশি নারী নেশায় বুঁদ ছিল নয়ন। নয়ন বন্ডের হাতে ঠিক কতজন তরুণীর সর্বনাশ হয়েছে তার সঠিক হিসাব নেই পুলিশের কাছেও। তবে নয়নের ‘বিশেষ কক্ষ’ থেকে উদ্ধার একটি ল্যাপটপে বহু পর্নো ভিডিও পাওয়া গেছে।

কয়েকটি আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি পর্নো ভিডিওতে নয়ন বন্ডের সঙ্গে একাধিক তরুণীর বিশেষ মুহূর্তের দৃশ্য রয়েছে। একেক দিন একেক তরুণী নিয়ে সে যে ফুর্তিতে মেতে উঠেছিল তা স্পষ্ট।

পুলিশের সূত্র বলছে, নয়ন বন্ডের ওই বিশেষ কক্ষের গোপন জায়গায় সুকৌশলে আইপি ক্যামেরা (ইন্টারনেট ক্যামেরা) বসানো থাকত।

বিশেষ উদ্দেশে নয়ন বন্ড যাদের ওই কক্ষে আনতেন তারা কেউ ক্যামেরার অস্তিত্ব টের পেতেন না। একবার নয়নের সঙ্গে অন্তরঙ্গ হওয়ার পর ওই মেয়ের আর রক্ষা ছিল না।

ভিডিও দেখিয়ে ব্ল্যাকমেইল করে বারবার কিশোরী- তরুণীদের ব্যবহার করত সে। অনেক তরুণী নয়নের হাত থেকে বাঁচতে কলেজ ছাড়তে পর্যন্ত বাধ্য হয়েছেন।

অনেকে আবার নয়নের চাহিদামতো মোটা অঙ্কের অর্থ দিয়ে মুক্তি পাওয়ার চেষ্টা করেছেন। পুলিশের হাতে এমন অন্তত ১২ তরুণীর তথ্য আছে বলে জানা গেছে।

নয়ন কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কে বা কারা এসব ভিডিও ছড়াচ্ছে তার সন্ধান করতে পারেনি পুলিশ।

নয়ন বন্ডের বাড়ি বরগুনা শহরের ডিকেপি রোডের মাঝ বরাবর একটি সরু গলির শেষ প্রান্তে। বাড়ির সামনে অনেকটা জায়গা খালি।

বাড়ি নির্মাণের জন্য সম্প্রতি সেখানে অনেক ইট এনে রাখা হয়েছে। নয়নের বাড়ির মূল দরজার পাশেই একটা ছোট্ট বৈঠক ঘর। নয়ন সেখানেই থাকত। গভীর রাত পর্যন্ত ঘরের দরজা খোলা থাকত। সারা দিন এখানে-সেখানে ঘোরাঘুরির পর গভীর রাতে বাড়ি ফিরত।

রাত ১২টার পর তার কক্ষে লোকজনের আনাগোনা বেড়ে যেত। আসতেন পুলিশের সদস্যরাও। প্রতিবেশীরা বলছেন, পুলিশের কয়েকজন অসাধু সদস্য মাদক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিল। তারা নয়নকে ব্যবহার করে নির্বিঘ্নে মাদক ব্যবসা চালিয়ে গেছে। শহরের অনেকেই মাদকের সঙ্গে যুক্ত ওই পুলিশ কর্মকর্তাদের চেনে- জানে। কিন্তু কেউ-ই মুখ খুলতে নারাজ।

শহরের বাজার রোডের আরেক বাসিন্দা যুগান্তরকে বলেন, নয়নের মনোরঞ্জনে ব্যবহৃত অনেক তরুণীকে পরে পুলিশের মনোরঞ্জনে ব্যবহৃত হওয়ার কথা শোনা গেছে। বিনিময়ে পুলিশের উদ্ধার করা মাদকের ভাগ পেত নয়ন।

বরগুনা পুলিশের এক কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, নয়নের শোবার ঘর থেকে যে ল্যাপটপটি উদ্ধার করা হয়েছে সেখানে কয়েকশ’ নীল ফিল্ম রয়েছে। স্থানীয় অনেক তরুণী যে তার শিকারে পরিণত হয়েছেন ল্যাপটপের ওই ভিডিও-ই তার প্রমাণ।

জেলা পুলিশের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা এসব ভিডিও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছেন।

Advertisement

রিফাতকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা নয়ন বন্ড

Advertisement

আরও পড়ুন

কৃষক সেজে হাওড় থেকে হত্যা মামলার প্রধান আসামি গ্রেফতার

কৃষক সেজে হাওড় থেকে হত্যা মামলার প্রধান আসামি গ্রেফতার

নিখোঁজের একদিন পর ব্যবসায়ীর আগুনে ঝলসানো লাশ উদ্ধার

নিখোঁজের একদিন পর ব্যবসায়ীর আগুনে ঝলসানো লাশ উদ্ধার

নারায়ণগঞ্জ বার ভবনে আইনজীবীদের দুপক্ষের হট্টগোল-ধাক্কাধাক্কি

নারায়ণগঞ্জ বার ভবনে আইনজীবীদের দুপক্ষের হট্টগোল-ধাক্কাধাক্কি

সেতু আছে, সংযোগ সড়ক নেই...

সেতু আছে, সংযোগ সড়ক নেই...

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম