Logo
Logo
×

Advertisement

অপরাধ

‘পুলিশে ধরার একদিনের মধ্যে ছাড়া পাইতে হুনছি, খরচ হইছে ৩০ লাখ’

Advertisement

Icon

যুগান্তর প্রতিবেদন

প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৪৩ পিএম

‘পুলিশে ধরার একদিনের মধ্যে ছাড়া পাইতে হুনছি, খরচ হইছে ৩০ লাখ’

ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

Advertisement

‘৩১ আগস্ট সে (উত্তরার সবচেয়ে প্রভাবশালী গ্যাং ‘দে লাড়া’ গ্রুপের শীর্ষ নেতা সাকিবুল হাসান সানি ওরফে পিচ্চি সানি) পুলিশের হাতে গ্রেফতার হইছিল। কিন্তু একদিন পরই বাইর হইয়া গেছে। ওই সময় টিভির খবরের ভিডিও ক্লিপ দেখিয়ে আরেকজন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলে, টিভিতে এই রকম নিউজ হইছে। কিন্তু কী লাভ। পরদিনই হেই ছাড়া পাইয়া গেছে। বুঝলেন না-ট্যাকায় কথা কয়। মাত্র একদিনের মধ্যে ছাড়া পাইতে হুনছি, খরচ হইছে ৩০ লাখ। মোটা অঙ্কের ট্যাকা খাইয়া পুলিশ অরে ছাইড়া দিছে।’

যুগান্তর টিমের সঙ্গে আলাপে তথ্যগুলো দিয়েছে গ্রুপটির শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন সদস্য।

‘সিটি অব গড’ হিসাবে পরিচিত রাজধানীর মোহাম্মদপুরের পরই ঢাকার সর্বাধিক কিশোর গ্যাংয়ের উত্থান উত্তরায়। পুলিশের তালিকায়ই উত্তরায় কিশোর গ্যাংয়ের সংখ্যা ৩০টির বেশি। পাড়া-মহল্লায় এদের দাপট ব্যাপক। বড়ভাইদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে তাদের বাধাহীন বিচরণে উদ্বিগ্ন উত্তরার অধিবাসীরা। উত্তরার সবচেয়ে প্রভাবশালী গ্যাংয়ের নাম ‘দে লাড়া’ গ্রুপ (পিচ্চি সানি)। এদের দৌরাত্ম্য উত্তরা থেকে শুরু করে উত্তর ও দক্ষিণখান হয়ে টঙ্গী পর্যন্ত বিস্তৃত। গত ৯ অক্টোবর একগুচ্ছ শর্ত মানার পর এই গ্রুপের শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন সদস্য যুগান্তর টিমের সঙ্গে আলাপে বসতে রাজি হয়। দীর্ঘ আলাপচারিতায় গ্রুপের শীর্ষ নেতা সাকিবুল হাসান সানি ওরফে পিচ্চি সানি সম্পর্কেও চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে আসে।

এদিন তাদের কথামতো বিকাল ৪টায় উত্তরখান ৮ নম্বর সেক্টর এলাকাসংলগ্ন একটি মাঠে যান যুগান্তর টিমের সদস্য। বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর এক নেতাসহ ৪ জন কিশোর এসে হাজির হয়। নাম-পরিচয় গোপন, কোনো ধরনের রেকর্ড না করার বিষয়টি কঠোরভাবে মেনে চলার শর্ত প্রথমেই স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়।

শুরুতেই একজন সদস্য মোবাইল বের করে ‘দে লাড়া’ গ্রুপের প্রধান পিচ্চি সানির ছবি দেখিয়ে বলে, ‘এলাকার সব থেকে বড় কিশোর গ্যাং লিডার হইল সানি। হ্যার গ্রুপে কয়েকশ সদস্য। সবাই মাদক ব্যবসা করে। কিছুদিন আগেও (৩১ আগস্ট) সে পুলিশের হাতে গ্রেফতার হইছিল। কিন্তু একদিন পরই বাইর হইয়া গেছে। ওই সময় টিভির খবরের ভিডিও ক্লিপ দেখিয়ে আরেকজন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলে, টিভিতে এই রকম নিউজ হইছে। কিন্তু কী লাভ। পরদিনই হেই ছাড়া পাইয়া গেছে। বুঝলেন না-ট্যাকায় কথা কয়। মাত্র একদিনের মধ্যে ছাড়া পাইতে হুনছি, খরচ হইছে ৩০ লাখ। মোটা অঙ্কের ট্যাকা খাইয়া পুলিশ অরে ছাইড়া দিছে।’

একজন সদস্য বলে, ‘উত্তরা ৮ নম্বর সেক্টর থেকে টঙ্গী রেলস্টেশন পর্যন্ত দীর্ঘ রেলপথের দুপাশে রীতিমতো মাদকের হাট বসে। কোটি কোটি টাকার মাদক বেচাকেনা হয়। গাঁজা, ইয়াবা, আইস ও ফেনসিডিলসহ নানা ধরনের মাদক বিক্রি হয় প্রকাশ্যে। মাদকের এই পুরো সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করে ‘দে লাড়া’ গ্রুপের পিচ্চি সানি।

‘লোকালে (স্থানীয়) এমন কেউ নাই যে সানিরে চিনে না। রায়হান নামের আরেক কিশোর গ্যাং নেতা তার ডান হাত হিসাবে পরিচিত। তবে সিন্ডিকেটের নেতাদের মধ্যে আরও আছে পলাশ ওরফে ছিনতাই পলাশ, রনি ওরফে রনি শিকদার, ইয়াবা ডিলার মশিউর, সাইফুল, শাওন, শিপু, ফারুক, আসাদুল, ফাহিম, শহিদুল ও নাজমুল। এদের সঙ্গে একজন নারীও আছেন। তার নাম স্থানীয়রা কেউই জানে না। এলাকায় তিনি শুধু ‘ভাবি’ নামে পরিচিত। তার স্বামীর নাম অপু।’

এভাবে মাদক ব্যবসা করলে পুলিশে ধরে না? এমন প্রশ্ন শুনে উপস্থিত কয়েকজন হাসতে হাসতে বলে, ‘পুলিশ কেমন, আপনারা তা জানেন না। সব তো টাকার খেলা। পিচ্চি সানিকে যেদিন পুলিশ ধরছে সেদিনই তার গাড়িতে ক্যাশ টাকা পাইছে ১০ লাখ। তাইলে বুঝেন হ্যার কাছে কত টাকা আছে।’

উপস্থিত একজন নিজের মোবাইল বের করে পিচ্চি সানির ফেসবুক পেজ খুলে বলে, দ্যাখেন-এখানে হ্যার সব পোলাপানের ছবি আছে। একটি ছবিতে নৌকা প্রতীক সংবলিত পরিচয়পত্র ঝুলিয়ে স্থানীয় কোনো ভোটকেন্দ্রের মাঠে সানিকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। তার সঙ্গে রয়েছে আরও বেশ কয়েকজন। আরেকটি ছবিতে ছাত্র আন্দোলনের সময় উত্তরা এলাকার রাস্তায় লাঠিসোঁটা হাতে শোডাউন দিচ্ছে ‘দে লাড়া’ গ্রুপের সদস্যরা। এছাড়া ফেসবুকের কয়েকটি রিলসে গ্যাং সদস্যবেষ্টিত পিচ্চি সানিকে স্লো মোশনে হাঁটতে দেখা যায়। এ সময় ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজছে কোনো হিন্দি সিনেমার ভিলেনের দুর্ধর্ষ সংলাপ।

পিচ্চি সানি ছাত্রলীগ না ছাত্রদল এমন প্রশ্ন করা হলে তারা বলে, আগে তার উত্তর ছাত্রলীগের পদ ছিল। তবে ৫ আগস্টের পর থেকে সে নিজেকে সরকারি দলের নেতা হিসাবে পরিচয় দেয়। অবশ্য ছাত্রদল কিংবা অন্য কোনো সংগঠনে তার কোনো পদ-পদবি আছে কি না তা আমাদের জানা নেই। তবে পুলিশের কাছ থেকে ছাড়া পাওয়ার পর রীতিমতো শোডাউন দিয়ে সে এলাকায় ঢুকেছে।

এলাকায় এভাবে একের পর এক বিভিন্ন নামে কিশোর গ্যাং গড়ে ওঠার কারণ জানতে চাইলে একজন সদস্য বলে, স্থানীয় স্কুল-কলেজেও শিক্ষার পরিবেশ ভালো নয়। কে ছাত্রলীগ, কে ছাত্রদল এসব নিয়ে গ্যাঞ্জাম। এসব কারণে অনেকেই সেভাবে লেখাপড়া করতে চায় না। বরং তারা মহল্লার বড়ভাইয়ের সঙ্গে থাকতে চায়। বিভিন্ন দলের রাজনৈতিক নেতারা যেভাবে ক্ষমতা দেখায়, দলবল নিয়ে চলাফেরা করে-তারাও সেভাবে চলতে চায়। কিন্তু চাইলেই এভাবে চলা যায় না। এজন্য দরকার প্রচুর টাকা। টাকা আয়ের সহজ পথ মাদক ব্যবসা।

একজন বলে, বড়ভাইদের গ্রুপের সঙ্গে থাকলে অনেক লাভ। এলাকায় মাস্তানি করলেও কেউ কিছু বলার সাহস পায় না। কারণ সবাই জানে ওরে কিছু বললে পোলাপান ঝামেলা করব। এলাকায় গ্যাঞ্জাম হইব। একপর্যায়ে এলাকার খালি প্লট কিংবা সরকারি জায়গা দখল কইর‌্যা অনেকে দোকান দেয়। কেউ মার্কেট কইর‌্যা ভাড়া দেয়। কেউ বা বস্তিঘর তোলে। অর্থাৎ একটা ভালো অঙ্কের টাকা রোজগারের পথ খুইল্যা যায়।

আরেকজন বলে, এলাকায় খেলার কোনো মাঠ নাই। ফাঁকা জায়গা যা ছিল সব দখল হয়ে গেছে। ৮ নম্বর সেক্টরসংলগ্ন উত্তরা পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের পাশে একটি মাত্র ফাঁকা জায়গা ছিল। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের সময় সেটি বন্ধ করা হয়েছিল। কিন্তু নির্মাণকাজ শেষ হলেও মাঠ খুলে দেওয়া হয়নি। বর্তমানে মাঠের একাংশ দখল করে কে বা কারা মার্কেট নির্মাণ করছে।

তবে গ্রুপের এক সদস্য বিদ্যমান পরিবেশে নিজের পরিবার নিয়ে উদ্বিগ্ন। তার ৪ বছর বয়সি একমাত্র ছোট ভাইকে নিয়ে অনেক চিন্তা হয়। এ কারণে তাদের পরিবার এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে চায়। যাতে বখাটেদের সঙ্গে মিশে ছোট ভাইয়ের জীবনও নষ্ট না হয়। সে বলে, এই যে পরিবেশ দেখতাছেন। মাদক, খুন, ছিনতাই এগুলো কি বড় হইলে সেও শিখব না। তাই আমরা এলাকা ছাইড়া অন্য জায়গায় চইল্ল্যা যামু।

উত্তরার কিশোর গ্যাংয়ের মধ্যে বিগ বস গ্রুপ (ছোটন খান), সুমন ওরফে শাহিদ গ্রুপ, দেওয়ান গ্রুপ, সেক্টর ইলেভেন গ্রুপ (সিনহা রহমান), নূর খান গ্রুপ এবং হৃদয় গাজী গ্রুপ অন্যতম।

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

সিলেট কিশোর গ্যাং বিরোধী অভিযানে আটক ৩০০

সিলেট কিশোর গ্যাং বিরোধী অভিযানে আটক ৩০০

কুমিল্লায় কিশোর গ্যাং বিরোধী অভিযানে আটক ৫১৯

কুমিল্লায় কিশোর গ্যাং বিরোধী অভিযানে আটক ৫১৯

কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে অভিযান, আটক ৩৫৩

কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে অভিযান, আটক ৩৫৩

কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের ২৫২ সদস্য আটক

কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের ২৫২ সদস্য আটক

নোয়াখালীতে কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযান, আটক ১১০৬

নোয়াখালীতে কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযান, আটক ১১০৬

মাদ্রাসাছাত্রীকে তুলে নেওয়ার চেষ্টার অভিযোগ, কিশোর গ্যাং সদস্য আটক

মাদ্রাসাছাত্রীকে তুলে নেওয়ার চেষ্টার অভিযোগ, কিশোর গ্যাং সদস্য আটক

আরও পড়ুন

‘দে লাড়া’ গ্রুপের শীর্ষ নেতা সম্পর্কে চাঞ্চল্যকর তথ্য

‘দে লাড়া’ গ্রুপের শীর্ষ নেতা সম্পর্কে চাঞ্চল্যকর তথ্য

‘পুলিশে ধরার একদিনের মধ্যে ছাড়া পাইতে হুনছি, খরচ হইছে ৩০ লাখ’

‘পুলিশে ধরার একদিনের মধ্যে ছাড়া পাইতে হুনছি, খরচ হইছে ৩০ লাখ’

ডিএমপির অভিযান: গত ২৪ ঘণ্টায় গ্রেফতার ৪৮১, মামলা ৪০

ডিএমপির অভিযান: গত ২৪ ঘণ্টায় গ্রেফতার ৪৮১, মামলা ৪০

কিশোর গ্যাং-এর বড় ভাইয়েরা আড়ালে অভিযানেও মিলছে না সুফল

অভিযানেও মিলছে না সুফল

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম