বৃদ্ধ বয়সে হঠাৎ ‘ভীমরতি’, নৈতিক স্খলন নাকি মস্তিষ্কে বাসা বেঁধেছে বিরল রোগ?
ডা. মোহাম্মদ সাঈদ এনাম
প্রকাশ: ৩১ জুলাই ২০২৬, ০৭:৪১ পিএম
প্রতীকী ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ধরা যাক, সেন্টুর (ছদ্মনাম) বয়স ৭০ বছর। হঠাৎ করেই তার বিরুদ্ধে পরিবারের পক্ষ থেকে গুরুতর অভিযোগ উঠল। সুযোগ পেলেই তিনি পরিবারের কম বয়সি নারী সদস্যদের জড়িয়ে ধরার চেষ্টা করেন, অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে চুমু দেন, এমনকি যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ কথাবার্তাও বলেন। স্বাভাবিকভাবেই পরিবারে শুরু হয় তীব্র অস্বস্তি, ক্ষোভ ও ভুল বোঝাবুঝি। অনেকেই মন্তব্য করেন, ‘বৃদ্ধ বয়সে মানুষটার চরিত্র নষ্ট হয়ে গেছে!’
কিন্তু একজন স্নায়ু ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে আমার কাছে মাঝেমধ্যেই এমন রোগী আসেন। অভিযোগগুলো প্রায় একই রকম—অশালীন কথাবার্তা, অনুপযুক্ত অঙ্গভঙ্গি, নিজের স্ত্রী ছাড়া অন্য নারীদের প্রতি অনভিপ্রেত যৌন আচরণ এবং সামাজিক সীমারেখা অতিক্রম করা।
কিন্তু রোগীর অতীত ইতিহাস পর্যালোচনা করলে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি চিত্র উঠে আসে।
পরিবারের সদস্যরা বিস্ময়কর একটি তথ্য জানান। এই মানুষটিই কৈশোর, তারুণ্য, যৌবন ও প্রৌঢ়—জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে ছিলেন অত্যন্ত ভদ্র, পরহেজগার, সৎ ও আত্মসংযমী। তার সততা ও শালীনতা ছিল পরিবারের গর্ব। জীবনের সাত দশকে তাঁর বিরুদ্ধে এমন কোনো অভিযোগ কখনোই ওঠেনি।
তখন প্রথম প্রশ্ন আসে—এটি কি সত্যিই চরিত্রের পরিবর্তন, নাকি মস্তিষ্কের কোনো রোগের লক্ষণ?
কারণ, বৃদ্ধ বয়সে হঠাৎ শুরু হওয়া এ ধরনের আচরণ অনেক সময় ডিসইনহিবিশন (Disinhibition) নামের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিউরোসাইকিয়াট্রিক উপসর্গের প্রকাশ হতে পারে। এতে মস্তিষ্কের ফ্রন্টাল লোবের কার্যকারিতা ব্যাহত হওয়ায় আত্মনিয়ন্ত্রণ কমে যায়। ফলে ব্যক্তি অশালীন কথা বলতে পারেন, যৌন আচরণে সংযম হারাতে পারেন, সামাজিক নিয়ম ভঙ্গ করতে পারেন, এমনকি নিজের আচরণ যে অনুপযুক্ত, সেটিও বুঝতে নাও পারেন (Stuss & Knight, 2013; Miller & Boeve, 2017)।
ডিসইনহিবিশন কোনো রোগ নয়; এটি বিভিন্ন রোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপসর্গ। এটি সবচেয়ে বেশি দেখা যায় Behavioral Variant Frontotemporal Dementia (bvFTD)-এ। এছাড়া ফ্রন্টাল লোব স্ট্রোক, মাথায় আঘাত, মস্তিষ্কের টিউমার, আলঝেইমার রোগ, লিউই বডি ডিমেনশিয়া, হান্টিংটন রোগ, বাইপোলার ডিসঅর্ডারের ম্যানিক পর্ব, অ্যালকোহল বা মাদকের প্রভাব এবং কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াতেও এ ধরনের আচরণ দেখা দিতে পারে (Rascovsky et al., 2011; American Psychiatric Association, 2022)।
তাই কোনো বয়োবৃদ্ধ মানুষের আচরণে যদি হঠাৎ ও স্পষ্ট পরিবর্তন দেখা যায়, বিশেষ করে যার অতীত জীবন ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন, তাহলে তাঁকে দ্রুত "চরিত্রহীন" বা "নৈতিকভাবে অধঃপতিত" বলে দাগিয়ে দেওয়ার আগে পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসাবৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন করা জরুরি। Mental State Examination (MSE), স্নায়ুবৈজ্ঞানিক পরীক্ষা এবং প্রয়োজনে MRI of the Brain রোগ নির্ণয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে (Darby & Dickerson, 2017)।
মনে রাখবেন—সব অনৈতিক বা সামাজিকভাবে অনুপযুক্ত আচরণ চরিত্রের ত্রুটি নয়; কখনও কখনও তা মস্তিষ্কের অসুস্থতার নীরব সংকেত। দ্রুত বিচার নয়, আগে প্রয়োজন সঠিক মূল্যায়ন।
লেখক: ডা. মোহাম্মদ সাঈদ এনাম
এমবিবিএস (ঢাকা মেডিকেল কলেজ), এমফিল (সাইকিয়াট্রি), বিসিএস (স্বাস্থ্য)
অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর, মনোরোগবিদ্যা
সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ
ইন্টারন্যাশনাল ফেলো, আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশন
তথ্যসূত্র
- American Psychiatric Association. Diagnostic and Statistical Manual of Mental Disorders (DSM-5-TR). 5th ed. Text Revision. APA Publishing; 2022.
- Darby RR, Dickerson BC. Continuum (Minneap Minn). 2017;23(2):440–456.
- Miller BL, Boeve BF, eds. The Behavioral Neurology of Dementia. 2nd ed. Cambridge University Press; 2017.
- Rascovsky K, Hodges JR, Knopman D, et al. Brain. 2011;134(9):2456–2477.
- Stuss DT, Knight RT, eds. Principles of Frontal Lobe Function. 2nd ed. Oxford University Press; 2013.
