আলো দিয়েই কি জাগানো যায় স্মৃতি, নোবেলজয়ী আবিষ্কারে নতুন আশা
Advertisement
যুগান্তর ডেস্ক
প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৫০ এএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট স্নায়ুকোষকে আলো দিয়ে সক্রিয় বা নিষ্ক্রিয় করে স্মৃতি, ভয়, ঘুম ও বিভিন্ন আচরণের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক পরীক্ষা করছেন বিজ্ঞানীরা। অপটোজেনেটিকস নামে পরিচিত এ প্রযুক্তি মস্তিষ্ক কীভাবে কাজ করে এবং মৃগীরোগ, পারকিনসনস ও বিষণ্নতার মতো সমস্যার পেছনে কোন জৈবিক প্রক্রিয়া কাজ করে, তা বোঝার নতুন সুযোগ তৈরি করেছে।
এ আবিষ্কারের জন্য ২০২৬ সালের চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন পিটার হেগেম্যান, জর্জ নাগেল ও কার্ল ডেইসেরথ। আলোতে সাড়া দেওয়া আয়ন চ্যানেল এবং অপটোজেনেটিকস প্রযুক্তির বিকাশে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ৫ অক্টোবর তাদের এ পুরস্কার দেওয়া হয়।
গবেষণাটির সূচনা হয়েছিল পুকুরের এক ধরনের এককোষী সবুজ শৈবাল নিয়ে অনুসন্ধান থেকে। পিটার হেগেম্যান জানতে চেয়েছিলেন, শৈবালটি কীভাবে আলোর দিকে এগিয়ে যায়। পরে হেগেম্যান ও জর্জ নাগেল এমন একটি প্রোটিনের ভূমিকা শনাক্ত করেন, যা আলো পড়লে কোষের ভেতর আয়ন চলাচলের পথ খুলে দেয়। প্রোটিনটির নাম চ্যানেলরোডপসিন।
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও বায়োইঞ্জিনিয়ার কার্ল ডেইসেরথ এরপর এ প্রোটিন তৈরির জিন স্নায়ুকোষে প্রবেশ করানোর ধারণা কাজে লাগান। এর ফলে আলো ব্যবহার করে নির্দিষ্ট স্নায়ুকোষকে সক্রিয় করা সম্ভব হয়। ২০০৬ সালে এ পদ্ধতি অপটোজেনেটিকস নামে পরিচিতি পায়।
এ প্রযুক্তিতে প্রথমে নির্বাচিত স্নায়ুকোষে আলো-সংবেদনশীল প্রোটিন তৈরির জিনগত নির্দেশনা দেওয়া হয়। এরপর আলো ব্যবহার করে ওই কোষের কার্যক্রম সক্রিয় বা দমন করে দেখা হয়, তাতে প্রাণীর আচরণে কী পরিবর্তন ঘটে।
মেডকেয়ার হাসপাতাল আল সাফার পরামর্শক স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ আনাস আবদুল মজিদের মতে, আগে বিজ্ঞানীরা মস্তিষ্কের কোন অংশ সক্রিয় হচ্ছে, তা পর্যবেক্ষণ করতে পারতেন। নতুন এ পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট স্নায়ুকোষ আসলে কী ভূমিকা রাখছে, তা পরীক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে।
স্মৃতির সঙ্গে ভয়ের সম্পর্ক
অপটোজেনেটিকসের কার্যকারিতা বোঝাতে ইঁদুরের ওপর করা একটি পরীক্ষার কথা উল্লেখ করেছেন গবেষকেরা। স্মৃতির সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণভাবে জড়িত মস্তিষ্কের হিপোক্যাম্পাস অঞ্চলে এমন কিছু কোষ শনাক্ত করা হয়, যেগুলো কোনো পরিবেশের সঙ্গে অপ্রীতিকর অভিজ্ঞতার সম্পর্ক তৈরির সময় সক্রিয় হয়েছিল।
পরবর্তী সময়ে অন্য পরিবেশে ওই কোষগুলোকে আলো দিয়ে সক্রিয় করলে ইঁদুরগুলো স্থির হয়ে যায়। এটি ভয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি আচরণ। অর্থাৎ, ইঁদুরগুলো নিরাপদ জায়গায় থাকলেও তাদের আচরণে আগের ভয়ংকর অভিজ্ঞতার সঙ্গে সম্পর্কিত প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।
তবে এর অর্থ এই নয় যে বিজ্ঞানীরা ইঁদুরের মনে কী স্মৃতি রয়েছে, তা পড়তে পেরেছেন। বরং পরীক্ষাটি দেখিয়েছে, নির্দিষ্ট কিছু স্নায়ুকোষ পুনরায় সক্রিয় করলে স্মৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত আচরণ ফিরিয়ে আনা সম্ভব হতে পারে।
কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি দুবাইয়ের স্বাস্থ্যবিজ্ঞান ও মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান মোহাম্মদ নামি সতর্ক করে বলেছেন, কোনো একটি স্নায়ুকোষ সক্রিয় করলেই নির্দিষ্ট আবেগ বা স্মৃতি তৈরি হয়, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়। স্মৃতি ও অনুভূতি মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশের পারস্পরিক ক্রিয়ায় তৈরি হয়।
মস্তিষ্কের রোগ গবেষণায় নতুন দিগন্ত
মস্তিষ্কের স্ক্যান থেকে কোনো অঞ্চলের গঠনগত পরিবর্তন বা কার্যক্রমের ধরন জানা যায়। কিন্তু ওই পরিবর্তনই রোগের উপসর্গ সৃষ্টি করছে, নাকি উপসর্গের ফল হিসেবে পরিবর্তনটি ঘটছে, তা সব সময় বোঝা যায় না।
অপটোজেনেটিকসের মাধ্যমে গবেষকেরা এ সম্পর্ক পরীক্ষা করতে পারেন। যেমন, মৃগীরোগের প্রাণীভিত্তিক মডেলে কোন স্নায়ুপথ থেকে খিঁচুনি শুরু হয় বা ছড়িয়ে পড়ে, তা অনুসন্ধান করা যায়। নির্দিষ্ট কোষের কার্যক্রম দমন করলে খিঁচুনি থামানো সম্ভব কি না, সেটিও পরীক্ষা করা যায়।
পারকিনসনস রোগের গবেষণায় চলাফেরার সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন স্নায়ুপথের ভূমিকা এবং বিষণ্নতার গবেষণায় পুরস্কার, প্রেরণা ও মানসিক চাপের সঙ্গে জড়িত মস্তিষ্কের সার্কিটগুলো পরীক্ষা করা হচ্ছে।
গবেষকদের মতে, এ পদ্ধতি ভবিষ্যতে রোগ নির্ণয়ের ধারণাও বদলে দিতে পারে। একই ধরনের উপসর্গ থাকা দুই রোগীর মস্তিষ্কে ভিন্ন ধরনের কার্যগত সমস্যা থাকতে পারে। আবার আলাদা রোগনির্ণয়ের ক্ষেত্রেও কোনো কোনো জৈবিক প্রক্রিয়ার মিল থাকতে পারে।
চিকিৎসায় ব্যবহার কতটা দূরে?
অপটোজেনেটিকস দিয়ে সরাসরি মৃগীরোগ, পারকিনসনস বা বিষণ্নতার চিকিৎসা করা যাবে কি না, তা নিয়ে আগ্রহ রয়েছে। তবে রোগের কার্যপ্রক্রিয়া বোঝা এবং নিরাপদ চিকিৎসা তৈরি করা এক বিষয় নয়।
মানুষের ক্ষেত্রে এ প্রযুক্তির সবচেয়ে স্পষ্ট অগ্রগতি দেখা গেছে চোখের রোগ নিয়ে গবেষণায়। বংশগত রেটিনার অবক্ষয়ে আক্রান্ত কিছু রোগীর চোখে অবশিষ্ট রেটিনার কোষকে আলোতে সাড়া দেওয়ার উপযোগী করার চেষ্টা করা হয়েছে। বিশেষ চশমার সঙ্গে জিন থেরাপি ব্যবহার করে রেটিনাইটিস পিগমেন্টোসায় আক্রান্ত এক রোগীর দৃষ্টিশক্তির কিছুটা কার্যকারিতা ফিরে পাওয়ার খবরও এসেছে। তবে এটি স্বাভাবিক দৃষ্টিশক্তি পুরোপুরি ফিরিয়ে আনার সমতুল্য নয়।
মস্তিষ্কে এ প্রযুক্তি প্রয়োগ করা আরও জটিল। নির্দিষ্ট কোষে আলো-সংবেদনশীল প্রোটিন তৈরি করানোর পাশাপাশি সেখানে আলো পৌঁছানোর ব্যবস্থাও প্রয়োজন। নিরাপদে জিন প্রবেশ করানো, সঠিক কোষকে লক্ষ্য করা এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিশ্চিত করার মতো চ্যালেঞ্জ এখনো রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মানসিক বা স্মৃতিসংক্রান্ত রোগের নিয়মিত চিকিৎসায় অপটোজেনেটিকস এখনো ব্যবহৃত হচ্ছে না। আপাতত এর বড় সম্ভাবনা হলো রোগের কার্যপ্রক্রিয়া সম্পর্কে নতুন তথ্য পাওয়া, যা ভবিষ্যতে আরও লক্ষ্যভিত্তিক ওষুধ বা মস্তিষ্কের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণের চিকিৎসা তৈরিতে সহায়তা করতে পারে।
ঘুম, মানসিক চাপ ও স্মৃতি নিয়ে গবেষণা
এ প্রযুক্তি শুধু রোগ নিয়ে গবেষণায় সীমাবদ্ধ নয়। ঘুম, স্মৃতি ও মানসিক চাপের সময় মস্তিষ্কের বিভিন্ন স্নায়ুপথ কীভাবে কাজ করে, তা বুঝতেও এটি ব্যবহার করা হচ্ছে।
ঘুমের বিভিন্ন পর্যায়, জেগে থাকা এবং স্বপ্ন দেখার সময় মস্তিষ্কের একাধিক ব্যবস্থার মধ্যে যোগাযোগের পরিবর্তন ঘটে। নির্দিষ্ট স্নায়ুপথের কার্যক্রম পরিবর্তন করে গবেষকেরা জানতে চাইছেন, কোন কোষগুলো জেগে থাকতে সাহায্য করে, কোনগুলো ঘুমের পর্যায় বদলায় এবং ঘুমের মধ্যে স্মৃতি সংরক্ষণে কোন স্নায়ুকোষের ভূমিকা রয়েছে।
একইভাবে, মানসিক চাপ কীভাবে মস্তিষ্কের নেটওয়ার্ক বদলে দেয় এবং তা চিন্তা, মনোযোগ ও স্মৃতিতে কী প্রভাব ফেলে, সেটিও অনুসন্ধান করা হচ্ছে। তবে অনিদ্রা, মানসিক চাপ বা স্মৃতির সমস্যার চিকিৎসায় এসব ফলাফল কাজে লাগাতে মানুষের ওপর আরও গবেষণা প্রয়োজন।
মানুষের মন নিয়ন্ত্রণের প্রযুক্তি নয়
আলো দিয়ে স্নায়ুকোষ সক্রিয় বা নিষ্ক্রিয় করার ধারণা থেকে মানুষের চিন্তা নিয়ন্ত্রণের আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান অপটোজেনেটিকস প্রযুক্তি দিয়ে মানুষের চিন্তা পড়ে ফেলা বা কোনো পরিবর্তন না করা মানবমস্তিষ্ককে দূর থেকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।
এ প্রযুক্তির অধিকাংশ গবেষণাই এখনো প্রাণীর ওপর করা হচ্ছে। মস্তিষ্কের গভীর অঞ্চলে আলো পৌঁছাতে যন্ত্র বসানোর প্রয়োজন হতে পারে। আবার একটি স্নায়ুপথের কার্যক্রম বদলালে অন্য স্নায়ুপথেও প্রভাব পড়তে পারে।
এ কারণে সম্মতি, ব্যক্তিস্বাধীনতা, মেজাজ বা স্মৃতিতে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন এবং প্রাণীর কল্যাণের মতো নৈতিক বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ।
মোহাম্মদ নামির মতে, প্রযুক্তির নির্ভুলতা বাড়লেই মস্তিষ্কের কার্যপ্রক্রিয়া সম্পর্কে সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা পাওয়া গেছে, এমনটি ভাবা উচিত নয়। নির্দিষ্ট কিছু কোষ সক্রিয় করে আচরণে পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব হলেও ওই আচরণের জন্য একটি মাত্র কোষ দায়ী, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না।
মস্তিষ্ক কীভাবে মন তৈরি করে?
অপটোজেনেটিকসের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য হয়তো তাৎক্ষণিক কোনো চিকিৎসা আবিষ্কারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং মস্তিষ্কের জৈবিক কার্যক্রম কীভাবে স্মৃতি, ভয়, অনুভূতি ও চিন্তার মতো অভিজ্ঞতা তৈরি করে, সে প্রশ্নের উত্তর খোঁজার পথ আরও শক্তিশালী হয়েছে।
বিজ্ঞানীরা এখন স্নায়ুকোষ ও মস্তিষ্কের নেটওয়ার্কের কার্যক্রম আরও সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি সেগুলোকে নিয়ন্ত্রিতভাবে পরিবর্তনও করতে পারছেন। এতে নির্দিষ্ট পরিবর্তনের পর চিন্তা ও আচরণে কী ঘটে, তা পরীক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে।
তবে মস্তিষ্কের একটি স্নায়ুপথে বৈদ্যুতিক বা জৈবিক কার্যক্রম থেকে কীভাবে ব্যক্তিগত স্মৃতি বা ভয় অনুভবের অভিজ্ঞতা তৈরি হয়, সেই প্রশ্নের পূর্ণ উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি।

-6adc42c7afc7f.jpg)