নিজের টিউমার থেকেই তৈরি টিকা, ক্যানসার চিকিৎসায় নতুন সাফল্য
Advertisement
যুগান্তর ডেস্ক
প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৪৭ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ত্বকের ক্যানসার মেলানোমার চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনা দেখিয়েছে ব্যক্তিকেন্দ্রিক ক্যানসার টিকা। প্রচলিত একটি ইমিউনোথেরাপির ওষুধের সঙ্গে এই টিকা প্রয়োগে রোগীর ক্যানসারে মৃত্যু বা রোগ ফিরে আসার ঝুঁকি ৪২ শতাংশ কমেছে বলে বড় একটি ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে দেখা গেছে।
বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গবেষকেরা এই ফলাফলকে ক্যানসার চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিকিৎসাপদ্ধতিকে আরও এগিয়ে নিতে পারে এই আবিষ্কার।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, শুধু ইমিউনোথেরাপি ব্যবহারের তুলনায় নতুন ওষুধ-টিকার সমন্বয়ে দুই বছরের মধ্যে মেলানোমা শরীরের অন্য অংশে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি ৩৮ শতাংশ কমেছে।
ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান এমএসডি ও মডার্না জানিয়েছে, কিডনি, মূত্রথলি ও ফুসফুসের ক্যানসারসহ অন্যান্য টিউমারের চিকিৎসায়ও একই পদ্ধতি পরীক্ষা করা হচ্ছে।
তবে স্বাধীন ক্যানসার বিশেষজ্ঞরা ফলাফলকে আশাব্যঞ্জক বললেও রোগীদের গড় আয়ু বাড়াতে এই চিকিৎসা কতটা কার্যকর, তা নিশ্চিত হতে আরও দীর্ঘমেয়াদি গবেষণার প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন।
যেভাবে কাজ করে টিকা
অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে যেসব ক্যানসার রোগীর টিউমার অপসারণ করা হয়েছে, তাদের জন্য এই চিকিৎসাপদ্ধতি তৈরি করা হয়েছে।
পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ১ হাজার ১৩৭ জন প্রাপ্তবয়স্ক রোগীকে কিট্রুডা নামের একটি প্রচলিত ইমিউনোথেরাপির ওষুধ দেওয়া হয়। এটি শরীরের রোগপ্রতিরোধব্যবস্থাকে ক্যানসার কোষ শনাক্ত করে সেগুলোর বিরুদ্ধে লড়তে সহায়তা করে।
অংশগ্রহণকারীদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশকে পরীক্ষামূলক টিকা দেওয়া হয়। বাকিদের দেওয়া হয় প্লাসিবো বা কার্যকর ওষুধের মতো দেখতে নিষ্ক্রিয় উপাদান।
ইন্টিসমেরান নামের এই টিকায় কোভিডের কয়েকটি টিকায় ব্যবহৃত এমআরএনএ প্রযুক্তি কাজে লাগানো হয়েছে। প্রতিটি রোগীর নিজস্ব টিউমার থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে টিকাটি তৈরি করা হয়। এর লক্ষ্য হলো, রোগীর রোগপ্রতিরোধব্যবস্থাকে ক্যানসার কোষ চিনতে শেখানো, যাতে ভবিষ্যতে ক্যানসার ফিরে এলে শরীর সেগুলোকে শনাক্ত করে আক্রমণ করতে পারে।
চিকিৎসা শুরুর দুই বছর পর দেখা যায়, টিকা পাওয়া রোগীদের মেলানোমা ফিরে আসা বা শরীরের অন্য অংশে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তুলনামূলকভাবে কম।
কেমব্রিজের অ্যাডেনব্রুকস হাসপাতালে গবেষণার একটি অংশ পরিচালনায় যুক্ত চিকিৎসক অধ্যাপক পিপা কোরি বলেন, ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিকিৎসা একটি নতুন ধাপ এবং প্রযুক্তিটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। তবে এর প্রকৃত উপকার কতটা, তা প্রমাণ করাই গুরুত্বপূর্ণ।
ক্যানসারমুক্ত
গবেষণায় অংশ নেওয়া রোগীদের একজন ৭৫ বছর বয়সি টনি চ্যাপম্যান। ২০১৯ সালে তার মেলানোমা শনাক্ত হয়। বুক থেকে টিউমার অপসারণের পর তার বগলের নিচে একটি পিণ্ড দেখা দেয়। পরে তাকে জানানো হয়, ক্যানসার ফিরে এসেছে এবং দ্বিতীয়বার অস্ত্রোপচার করতে হবে।
এরপর তিনি গবেষণায় অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তবে অন্য অংশগ্রহণকারীদের মতো তিনিও জানেন না, ইমিউনোথেরাপির পাশাপাশি তাকে পরীক্ষামূলক টিকা দেওয়া হয়েছিল, নাকি প্লাসিবো।
টনি বলেন, বিজ্ঞানকে এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি নিজেরও কিছু উপকার হতে পারে, এমন একটি উদ্যোগে অংশ নেওয়াকে তিনি ভালো সুযোগ মনে করেছিলেন।
বর্তমানে তার নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হচ্ছে। সর্বশেষ পরীক্ষায় দেখা গেছে, ক্যানসার শনাক্ত হওয়ার তিন বছর পরও তিনি ক্যানসারমুক্ত রয়েছেন।
অনুমোদন ও খরচ নিয়ে প্রশ্ন
টিকা তৈরির দুই প্রতিষ্ঠান এমএসডি ও মডার্নার শেয়ারের দাম আগে বাড়লেও বৃহস্পতিবার আর্থিক বিশ্লেষকেরা আগের তুলনায় ছোট একটি পরীক্ষার ফলাফলের সঙ্গে নতুন ফলাফল তুলনা করে প্রত্যাশার চেয়ে কম সাফল্যের কথা বলার পর শেয়ারের দাম কমে যায়।
প্রতিষ্ঠান দুটি জানিয়েছে, তারা ওষুধ নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করছে। আগামী বছর থেকেই অনুমোদনের আবেদন করা হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছে তারা।
তবে যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় (এনএইচএস) ব্যাপকভাবে এই চিকিৎসা চালু করা নির্ভর করবে খরচের ওপর। কারণ, প্রত্যেক রোগীর টিউমারের জিনগত বিশ্লেষণ করে আলাদাভাবে টিকা তৈরি করতে হবে।
গবেষণাটি চলবে। এতে অংশ নেওয়া রোগীদের দীর্ঘ সময় পর্যবেক্ষণ করা হবে, যাতে ক্যানসার আবার ফিরে আসে কি না এবং শেষ পর্যন্ত এই চিকিৎসা রোগীদের আয়ু বাড়াতে পারে কি না, তা মূল্যায়ন করা যায়।
লন্ডনের ইনস্টিটিউট অব ক্যানসার রিসার্চের অধ্যাপক অ্যালান মেলচার গবেষণায় অংশ না নিলেও ফলাফলকে ‘অত্যন্ত চিত্তাকর্ষক’ বলে বর্ণনা করেছেন। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, একটি মেলানোমা গবেষণার ফল থেকে সব ধরনের ক্যানসারে একই চিকিৎসা কার্যকর হবে বলে ধরে নেওয়া যায় না। রোগীদের সামগ্রিকভাবে বেঁচে থাকার ওপর চিকিৎসাটির প্রভাব বুঝতে দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণ জরুরি।
গবেষণার পূর্ণাঙ্গ ফল শনিবার মাদ্রিদে ইউরোপিয়ান সোসাইটি ফর মেডিক্যাল অনকোলজির (ইএসএমও) ক্যানসার সম্মেলনে উপস্থাপনের কথা রয়েছে। তবে এখনো ফলাফলটি বিশেষজ্ঞদের স্বাধীন পর্যালোচনার জন্য কোনো চিকিৎসাবিষয়ক গবেষণা সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়নি।

-6adc3489b77ba.jpg)
-6adc47139c502.jpg)