জেলিফিশেই মানুষের বার্ধক্য ঠেকানোর আশা গবেষকদের
Advertisement
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৪৫ এএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সমুদ্রের ক্ষুদ্র এক প্রজাতির জেলিফিশ নিজের জীবনচক্রকে উল্টো পথে ঘুরিয়ে আবার তরুণ অবস্থায় ফিরে যেতে পারে। ‘অমর জেলিফিশ’ নামে পরিচিত এই প্রাণীর বৈজ্ঞানিক নাম টারিটোপসিস ডোরনি। এর কোষ কীভাবে বয়সের প্রক্রিয়া পেছনে ফেলে নতুন জীবনচক্র শুরু করে, তা নিয়ে গবেষণা করছেন বিজ্ঞানীরা। তাদের আশা, এই প্রাণীর রহস্য উন্মোচন করে মানুষের বয়সজনিত রোগের চিকিৎসায় নতুন পথ খুঁজে পাওয়া যেতে পারে।
বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জেলিফিশটির ওপর নানা প্রতিকূল পরিস্থিতি প্রয়োগ করেও বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, এটি কখনো কখনো মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসে। সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানী মারিয়া মিগলিয়েত্তা পরীক্ষাগারে জেলিফিশগুলোকে কেটে, ফুটন্ত পানিতে দিয়ে, খাবার না দিয়ে এবং পানিতে লবণের মাত্রা পরিবর্তন করে পরীক্ষা করেছেন। প্রতিকূল পরিস্থিতিতে প্রাণীগুলো নড়াচড়া বন্ধ করে ট্যাংকের তলদেশে নেমে যায়। এরপর তাদের দেহের গঠন বদলে কোষের গোলাকার পিণ্ডে পরিণত হয়।
এক থেকে তিন দিনের মধ্যে ওই পিণ্ড থেকে পলিপ নামের প্রাথমিক জীবনপর্যায়ের গঠন তৈরি হয়। পরে তা একটি কলোনিতে পরিণত হয়, যেখান থেকে নতুন জেলিফিশ জন্ম নেয়। এভাবে পূর্ণবয়স্ক জেলিফিশটি আবার জীবনের শুরুর পর্যায়ে ফিরে যেতে পারে।
মিগলিয়েত্তার ভাষায়, একটি জেলিফিশ থেকে এমন একটি কলোনি তৈরি হতে পারে, যেখান থেকে আরও শত শত জেলিফিশ জন্ম নিতে পারে। নতুন জন্ম নেওয়া প্রতিটি জেলিফিশও একইভাবে জীবনচক্রের আগের পর্যায়ে ফিরে যাওয়ার সক্ষমতা রাখে।
বিজ্ঞানীরা এখন জেলিফিশটির জিন ও আণবিক প্রক্রিয়া নিয়ে গবেষণা করছেন। তাদের লক্ষ্য, কোন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রাণীটির কোষ আগের অবস্থায় ফিরে যায়, তা শনাক্ত করা।
১৯৯২ সালে ইতালির এক বিজ্ঞানী পরীক্ষাগারে জেলিফিশগুলো নিয়ে কাজ করার সময় ঘটনাটি প্রথম লক্ষ করেন। সপ্তাহান্তে খাবার না দেওয়ার পর ফিরে এসে তিনি প্রাণীগুলো মৃত অবস্থায় পাওয়ার আশা করেছিলেন। কিন্তু পাত্রে নতুন পলিপ দেখতে পান।
পরে ইতালির ইউনিভার্সিটি অব সালেন্তোর জীববিজ্ঞানী স্তেফানো পিরাইনো বিষয়টি নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। তিনি দেখতে পান, জেলিফিশটির কিছু টিস্যু ‘ট্রান্সডিফারেনশিয়েশন’ নামের একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়। এতে পরিণত কোষ আবার অপরিণত, স্টেম-সেলসদৃশ অবস্থায় ফিরে গিয়ে নতুন ধরনের কোষে রূপান্তরিত হতে পারে।
সাধারণত শরীরের কোষ নির্দিষ্ট কাজের উপযোগী হয়ে ওঠার পর সেই পরিচয় ধরে রাখে। কিন্তু অমর জেলিফিশের ক্ষেত্রে কিছু কোষ সেই অবস্থা বদলে নতুনভাবে গঠিত হওয়ার সুযোগ পায়। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, এই প্রক্রিয়াই প্রাণীটির জীবনচক্রকে পেছনে ফিরিয়ে নেওয়ার অন্যতম রহস্য।
মানুষের চিকিৎসায় কীভাবে কাজে লাগতে পারে
যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের শিশু ক্যানসার বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসাবিজ্ঞানী মাইকেল কোলডবস্কি মনে করেন, এই গবেষণা পুনর্জননমূলক চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে মানুষের বয়সকে পুরোপুরি উল্টো দিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার বিষয়টি এখনো কল্পবিজ্ঞানের পর্যায়ে রয়েছে।
বিজ্ঞানীরা বরং মানুষের কোষ ও টিস্যুকে আরও তরুণসদৃশ অবস্থায় ফিরিয়ে আনার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছেন। তা সম্ভব হলে ক্ষত নিরাময়, স্ট্রোক বা হার্ট অ্যাটাকের পর ক্ষতিগ্রস্ত টিস্যু পুনরুদ্ধার এবং বয়সজনিত দৃষ্টিশক্তি হ্রাসের ক্ষতি মোকাবিলায় নতুন চিকিৎসাপদ্ধতি তৈরি হতে পারে। আলঝেইমার রোগের মতো স্নায়ুক্ষয়জনিত রোগের ক্ষতি কমানোর ক্ষেত্রেও গবেষণাটি ভবিষ্যতে কাজে আসতে পারে।
কোলডবস্কির মতে, মানুষ আবার ভ্রূণাবস্থায় ফিরে যাবে, এমন নয়। তবে অঙ্গ ও টিস্যুর পর্যায়ে বয়সজনিত ক্ষয় কিছুটা উল্টে দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
২০২২ সালের একটি গবেষণায় বিজ্ঞানীরা অমর জেলিফিশের জিনের সঙ্গে এমন একটি সম্পর্কিত প্রজাতির জিনের তুলনা করেন, যেটির এভাবে পুনর্যৌবন লাভের সক্ষমতা জানা নেই। গবেষণায় দেখা যায়, অমর জেলিফিশের ডিএনএতে এমন কিছু জিনের অতিরিক্ত অনুলিপি রয়েছে, যেগুলো ডিএনএর ক্ষতি মেরামত করতে সাহায্যকারী প্রোটিন তৈরি করে।
এ ছাড়া টেলোমিয়ার রক্ষণাবেক্ষণের সঙ্গে যুক্ত জিনেরও বেশি অনুলিপি পাওয়া গেছে। টেলোমিয়ার হলো ডিএনএর প্রান্তে থাকা সুরক্ষামূলক অংশ, যা জিনগত উপাদানকে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সাধারণত টেলোমিয়ার ছোট হতে থাকে। অমর জেলিফিশের এগুলো মেরামত বা রক্ষণাবেক্ষণের বাড়তি সক্ষমতা তার দীর্ঘস্থায়ী জীবনচক্রের একটি কারণ হতে পারে বলে মনে করছেন গবেষক ভিক্টর কেসাদা।
২০১৯ ও ২০২১ সালের গবেষণাতেও ডিএনএ মেরামত এবং টেলোমিয়ার রক্ষণাবেক্ষণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জিনের সক্রিয়তা পাওয়া যায়। পাশাপাশি, জেলিফিশটির কোষের বিশেষ পর্যায়ে সক্রিয় হওয়া কিছু জিনের সঙ্গে মানুষের দীর্ঘায়ুর সম্পর্কযুক্ত জিনের মিলও দেখা গেছে।
তবে গবেষণাটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে। এসব প্রক্রিয়া মানুষের কোষে কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা যাবে কি না, তা জানতে আরও গবেষণা প্রয়োজন। স্তন্যপায়ী প্রাণীর কোষে পুনর্যৌবনসদৃশ প্রক্রিয়া ঘটানোর কিছু পদ্ধতি ইতোমধ্যে শনাক্ত হয়েছে। কিন্তু মানুষের টিস্যুতে তা প্রয়োগ করা এখনো কঠিন।
অমর হলেও পুরোপুরি মৃত্যুহীন নয়
নাম ‘অমর জেলিফিশ’ হলেও প্রাণীটি যে কখনোই মারা যায় না, এমন নিশ্চয়তা নেই। বিজ্ঞানীরা জানেন, কিছু জেলিফিশ পুনর্যৌবন লাভ করতে পারে না। আবার যারা পারে, তাদেরও কতবার এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা রয়েছে, তা স্পষ্ট নয়।
পরীক্ষাগারে দীর্ঘ সময় ধরে প্রাণীটিকে বাঁচিয়ে রাখাও কঠিন, কারণ এর বেঁচে থাকার জন্য বিশেষ পরিবেশ প্রয়োজন। প্রকৃতিতে খাদ্য প্ল্যাঙ্কটনের প্রাপ্যতা কমে যাওয়া, শিকারি প্রাণীর আক্রমণ কিংবা শৈবালের কারণে জেলিফিশের কলোনি ঢেকে যাওয়ার মতো পরিস্থিতিতে এটি মারা যেতে পারে।
স্পেনের ইনস্টিটিউট অব মেরিন সায়েন্সেসের গবেষক মারিয়া পাসকুয়াল-টর্নার বলেন, অমর জেলিফিশের পুনর্যৌবন লাভের সক্ষমতা থাকলেও এটি অত্যন্ত ভঙ্গুর একটি প্রাণী। অর্থাৎ, বয়সের প্রভাব পেছনে ফেলার বিশেষ ক্ষমতা থাকলেও প্রকৃতির অন্য বিপদ থেকে এর রেহাই নেই।

-6add90f60e063.jpg)