ব্যথানাশক ওষুধ সেবন, কিডনির যে পরিণতি হতে পারে
Advertisement
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৩১ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ব্যথা কমাতে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই নিয়মিত ওষুধ খেতেন ৪৯ বছর বয়সি এক কৃষক। পাঁচ বছর ধরে এভাবে ব্যথানাশক সেবনের পর তার দুই কিডনি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শেষ পর্যন্ত তাকে নিতে হয়েছে ডায়ালাইসিস। চিকিৎসকেরা বলছেন, বিশেষ করে শরীরে পানিশূন্যতা দেখা দিলে এবং দীর্ঘদিন ধরে ব্যথানাশক সেবন করলে কিডনির গুরুতর ক্ষতি হওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
ভারতের তামিলনাড়ুর তিরুভান্নামালাইয়ের বাসিন্দা ওই কৃষক দীর্ঘদিন ধরে মাঠে কাজ করার কারণে পিঠ ও শরীরে ব্যথায় ভুগছিলেন। ক্লান্তি, বমি বমি ভাব, বমি, শ্বাসকষ্ট ও পা ফুলে যাওয়ার মতো উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসকের কাছে গেলে পরীক্ষায় তার কিডনি বিকল হওয়ার বিষয়টি ধরা পড়ে।
চিকিৎসকের ভাষ্য অনুযায়ী, তার রক্তে ক্রিয়েটিনিনের মাত্রা ছিল প্রতি ডেসিলিটারে ১১ দশমিক ৪ মিলিগ্রাম, যেখানে স্বাভাবিক মাত্রার ঊর্ধ্বসীমা প্রায় ১ দশমিক ২ মিলিগ্রাম। আল্ট্রাসনোগ্রামেও দুই কিডনি ছোট হয়ে যাওয়া ও মারাত্মক ক্ষতির চিত্র ধরা পড়ে। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে তার জরুরি ভিত্তিতে ডায়ালাইসিস প্রয়োজন হয়।
অথচ ওই কৃষকের ডায়াবেটিস বা অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপের ইতিহাস ছিল না, যা দীর্ঘমেয়াদে কিডনি ক্ষতির পরিচিত কারণ। পরে তার ওষুধ সেবনের ইতিহাস জানতে গিয়ে চিকিৎসক জানতে পারেন, প্রায় পাঁচ বছর ধরে তিনি চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই ব্যথানাশক ওষুধ খাচ্ছিলেন।
যেভাবে কিডনির ক্ষতি হলো
ওই কৃষক প্রতিদিন দীর্ঘ সময় ধরে ধানখেতে কাজ করতেন। প্রচণ্ড গরমে কাজ করার সময় ঘামের সঙ্গে শরীর থেকে প্রচুর পানি বেরিয়ে যেত। পর্যাপ্ত পানি পান না করায় তার শরীরে পানিশূন্যতা দেখা দিত। তখন পিঠ ও শরীরের ব্যথা কমাতে তিনি স্থানীয় ফার্মেসি থেকে ওষুধ কিনে খেতেন।
তার ব্যবহৃত ওষুধের মধ্যে ছিল ডাইক্লোফেনাক ও এসিক্লোফেনাক। এগুলো নন-স্টেরয়ডাল অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি ড্রাগস বা এনএসএআইডি শ্রেণির ব্যথানাশক ওষুধ।
চিকিৎসকেরা বলছেন, এসব ওষুধ যথাযথভাবে ব্যবহার করলে ব্যথা ও প্রদাহ কমাতে কার্যকর। তবে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া দীর্ঘদিন ধরে কিংবা অতিরিক্ত মাত্রায় সেবন করলে কিডনির ওপর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে শরীরে পানিশূন্যতা থাকলে ঝুঁকি আরও বাড়ে।
পানিশূন্যতায় বাড়ে ঝুঁকি
কিডনি রক্ত থেকে বর্জ্য পদার্থ ও অতিরিক্ত তরল ছেঁকে বের করে এবং শরীরে পানি ও লবণের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। এ কাজের জন্য কিডনিতে পর্যাপ্ত রক্তপ্রবাহ প্রয়োজন।
প্রচণ্ড গরমে দীর্ঘ সময় কাজ করে ঘামের মাধ্যমে শরীর থেকে পানি বেরিয়ে গেলে কিডনিতে রক্তপ্রবাহ কমে যেতে পারে। স্বাভাবিক অবস্থায় শরীরের কিছু প্রক্রিয়া কিডনিতে রক্ত সরবরাহ বজায় রাখতে সাহায্য করে। কিন্তু এনএসএআইডি শ্রেণির ব্যথানাশক ওষুধ এসব সুরক্ষামূলক প্রক্রিয়ায় বাধা দিতে পারে।
ফলে কিডনির কার্যক্ষমতা হঠাৎ কমে গিয়ে তীব্র কিডনি আঘাত বা অ্যাকিউট কিডনি ইনজুরি হতে পারে। বারবার এমন ক্ষতি হলে দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগের ঝুঁকি বাড়ে। গুরুতর ক্ষেত্রে কিডনি স্থায়ীভাবে বিকলও হয়ে যেতে পারে।
তবে মাঝে মধ্যে ব্যথানাশক খেলেই কিডনি নষ্ট হবে, এমন নয়। ঝুঁকি নির্ভর করে ওষুধের মাত্রা, ব্যবহারের সময়কাল, শরীরের পানির ঘাটতি এবং আগে থেকে কিডনির কোনো সমস্যা আছে কি না, তার ওপর।
নীরবে বাড়ে কিডনির ক্ষতি
দাঁতের ব্যথা বা পেশির ব্যথার মতো কিডনির ক্ষতি সব সময় শুরুতেই বোঝা যায় না। কিডনির কার্যক্ষমতা কমতে থাকলেও অনেকে স্বাভাবিকভাবে কাজকর্ম চালিয়ে যেতে পারেন। উপসর্গ দেখা দেওয়ার আগেই কিডনির উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়ে যেতে পারে।
কিডনির সমস্যায় ক্লান্তি, বমি বমি ভাব, বমি, পা বা মুখ ফুলে যাওয়া, প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া, শ্বাসকষ্ট, ক্ষুধামন্দা কিংবা বিভ্রান্তির মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে। এসব উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
কারা বেশি ঝুঁকিতে
আগে থেকেই কিডনির রোগ রয়েছে, এমন ব্যক্তিদের ব্যথানাশক ব্যবহারে বিশেষ সতর্ক থাকা প্রয়োজন। বয়স্ক ব্যক্তি এবং ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা হৃদ্রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও ঝুঁকি বেশি হতে পারে। পানিশূন্যতা থাকলেও ঝুঁকি বাড়ে।
একই ধরনের উপাদান থাকা একাধিক ব্যথানাশক ওষুধ একসঙ্গে খাওয়ার বিষয়টিও বিপজ্জনক হতে পারে। অনেক সময় ভিন্ন ব্র্যান্ডের ওষুধে একই বা একই শ্রেণির উপাদান থাকায় রোগীরা অজান্তেই একাধিক ওষুধ সেবন করেন। তাই চিকিৎসক বা ফার্মাসিস্টকে নিজের ব্যবহৃত সব ওষুধের তথ্য জানানো গুরুত্বপূর্ণ।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন
কাজের ব্যথা কমাতে নিয়মিত ব্যথানাশক খেতে হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। পা ফুলে যাওয়া, অস্বাভাবিক ক্লান্তি, প্রস্রাবের পরিমাণ বা ধরনে পরিবর্তন, বমি কিংবা অকারণে শ্বাসকষ্ট দেখা দিলেও অবহেলা করা ঠিক নয়।
দীর্ঘদিন ব্যথানাশক সেবনকারীদের প্রয়োজন অনুযায়ী রক্তে ক্রিয়েটিনিনের মাত্রা, কিডনির ছাঁকনক্ষমতা এবং প্রস্রাব পরীক্ষা করে কিডনির অবস্থা যাচাই করা যেতে পারে।

-6addc8bd02f28.jpg)