চেষ্টা না করেই কীভাবে আরও বেশি ব্যায়াম করা যায়?
Advertisement
যুগান্তর ডেস্ক
প্রকাশ: ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৫৭ এএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সারাদিন বসে কাজ, গাড়িতে যাতায়াত, এরপর বাসায় ফিরে সোফায় বসে সময় কাটানো— এভাবেই অনেকের দিন পার হয়ে যায়। রাতের খাবারের সময় মনে পড়ে, সারা দিনে আর ব্যায়াম করা হয়নি। অথচ আলাদা করে ব্যায়ামের জন্য সময় বের না করেও দৈনন্দিন কাজের মধ্য দিয়ে শরীরকে সক্রিয় রাখা সম্ভব।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ সময় বসে থাকা হৃদরোগসহ বিভিন্ন গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই একটানা বসে থাকার সময় কমানো এবং দৈনন্দিন কাজে শরীরের নড়াচড়া বাড়ানো সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী।
এ ধরনের শারীরিক নড়াচড়াকে বলা হয় অনিচ্ছাকৃত বা দৈনন্দিন ব্যায়াম। ইংরেজিতে একে ‘ইনসিডেন্টাল এক্সারসাইজ’ বলা হয়। এর মধ্যে রয়েছে হাঁটাচলা, ঘরের কাজ করা, সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা কিংবা বসে থাকা অবস্থায় পায়ের পেশি নাড়ানো। ঘুম, খাওয়া বা পরিকল্পিত ব্যায়ামের বাইরে শরীরের নড়াচড়ায় যে শক্তি খরচ হয়, চিকিৎসাবিজ্ঞানে তাকে ‘নন-এক্সারসাইজ অ্যাক্টিভিটি থার্মোজেনেসিস’ বা ‘নিট’ বলা হয়।
নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ড ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির গবেষক অনন্ত নারায়ণনের মতে, বসে থাকার সময় পায়ের পেশি নাড়ানো, শরীরের ভঙ্গি পরিবর্তন করা, কাঁধ ঘোরানো কিংবা পায়ের পাতা বাঁকানোও এ ধরনের কার্যকলাপের মধ্যে পড়ে।
পা নাড়ানোর অভ্যাসও উপকারী
ছোটবেলা থেকেই অনেককে বসে থাকার সময় হাত-পা নাড়াতে নিষেধ করা হয়। কারণ, এ আচরণকে অনেক সময় অমনোযোগ বা বিরক্তির লক্ষণ হিসেবে দেখা হয়। তবে দীর্ঘ সময় বসে থাকার মধ্যে পা নাড়ানোর কিছু স্বাস্থ্যগত উপকার থাকতে পারে।
দীর্ঘক্ষণ বসে থাকলে পায়ের পেশি তুলনামূলকভাবে কম সক্রিয় থাকে। এতে রক্তে গ্লুকোজ ব্যবস্থাপনা এবং স্বাভাবিক রক্ত চলাচলে সহায়তাকারী পেশির সংকোচন কমে যায়।
অন্যদিকে, পা নাড়ালে পেশির কার্যকলাপ বাড়ে এবং স্থির বসে থাকার তুলনায় বেশি শক্তি খরচ হতে পারে। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত পা ঝাঁকানোর অভ্যাসে স্থির বসে থাকার তুলনায় প্রায় ১৬ শতাংশ বেশি শক্তি খরচ হতে পারে।
গবেষকদের মতে, পেশির এমন ছোট ছোট নড়াচড়া রক্তনালির কার্যকারিতা ও রক্তে শর্করার নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে। তবে শুধু পা নাড়ানোকে নিয়মিত ব্যায়ামের বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।
ঘরের কাজেও কমে বসে থাকার সময়
শরীর সক্রিয় রাখতে প্রতিদিন ব্যায়ামাগারে যাওয়া কিংবা নির্দিষ্ট সময় বের করা জরুরি নয়। রান্না করা, বাগান পরিচর্যা, ঘর ঝাড়ু দেওয়া, মেঝে পরিষ্কার করা কিংবা শিশুদের সঙ্গে খেলাধুলাও দৈনন্দিন শারীরিক কার্যকলাপের অংশ।
২০২৪ সালের একটি বড় গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিদিন চার মিনিটের মতো অল্প সময়ের শারীরিক কার্যকলাপও দীর্ঘ সময় বসে থাকার সঙ্গে সম্পর্কিত হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে। এসব কার্যকলাপের প্রতিটি এক মিনিটের কম সময়ের ছোট পর্বেও করা সম্ভব।
গবেষণাটিতে যুক্তরাজ্যের ২২ হাজারের বেশি মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। তাদের শরীরে এমন যন্ত্র পরানো হয়েছিল, যা দৈনন্দিন চলাফেরা পরিমাপ করতে পারে। অংশগ্রহণকারীদের আট বছর ধরে পর্যবেক্ষণ করা হয়। তাদের মধ্যে যারা নিয়মিত পরিকল্পিত ব্যায়াম করতেন না, তাদের তথ্যও গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত ছিল।
গবেষকেরা দেখতে পান, দৈনন্দিন শারীরিক কার্যকলাপের মাত্রা বেশি হলে দিনে ১১ ঘণ্টার বেশি বসে থাকার সঙ্গে সম্পর্কিত স্বাস্থ্যঝুঁকি কম হতে পারে। পরবর্তী গবেষণাতেও এ ধরনের কার্যকলাপের সঙ্গে অকালমৃত্যুর ঝুঁকি কম থাকার সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
অস্ট্রেলিয়ার মোনাশ ইউনিভার্সিটির জ্যেষ্ঠ গবেষক নিকোলাস কোয়েমেলের মতে, সিঁড়ি দিয়ে ওঠা, বাজারের ভারী ব্যাগ বহন করা কিংবা শিশুদের সঙ্গে খেলার মতো কাজ দৈনন্দিন নড়াচড়া বাড়াতে পারে।
হাঁটুন একটু দ্রুত, বাজার করুন হেঁটে
দৈনন্দিন কাজের মধ্যেই শরীরকে আরও সক্রিয় রাখার সুযোগ রয়েছে। কোথাও যাওয়ার সময় স্বাভাবিকের তুলনায় একটু দ্রুত হাঁটা, দোকানে গেলে কিছুটা দূরে গাড়ি রাখা কিংবা লিফটের বদলে সিঁড়ি ব্যবহার করার অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে।
বাজার করার সময় ট্রলির বদলে ঝুড়ি ব্যবহার করলেও কিছুটা ওজন বহন করতে হয়। এতে হাঁটাচলার পাশাপাশি পেশিও সক্রিয় থাকে। তবে ভার বহনের ক্ষেত্রে নিজের শারীরিক সক্ষমতা ও নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় রাখা জরুরি।
পুরোনো অভ্যাসের সঙ্গে যোগ করুন নতুন নড়াচড়া
নিয়মিত ব্যায়ামের বড় লক্ষ্য অনেকের কাছেই কঠিন মনে হতে পারে। এ ক্ষেত্রে আগে থেকেই করা দৈনন্দিন কাজের সঙ্গে ছোট ছোট শারীরিক কার্যকলাপ যুক্ত করা যেতে পারে।
যুক্তরাজ্যের লাফবরো ইউনিভার্সিটির আচরণগত চিকিৎসাবিজ্ঞানের অধ্যাপক আমান্ডা ডেলি এ কৌশলকে পরিচিত অভ্যাসের সঙ্গে নতুন অভ্যাস যুক্ত করা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।
যেমন, দাঁত ব্রাশ করার সময় গোড়ালি উঁচু করে দাঁড়ানো, ডেস্কে বসে পা ওঠানো কিংবা ফোনে কথা বলার সময় বসে না থেকে হাঁটাহাঁটি করা যেতে পারে।
কর্মক্ষেত্রেও এমন পরিবর্তন আনা সম্ভব। একটি গবেষণায় চিকিৎসকদের দাঁড়িয়ে কাজ করার উপযোগী ডেস্ক দেওয়া হয়েছিল। এতে তাঁদের প্রতিদিন বসে থাকার সময় প্রায় দুই ঘণ্টা কমেছিল। পাশাপাশি রোগীদের সঙ্গে দীর্ঘ সময় বসে থাকার স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়েও তাঁদের আলোচনা বেড়েছিল।
অল্প নড়াচড়া, দীর্ঘমেয়াদি অভ্যাস
বিশেষজ্ঞদের মতে, দৈনন্দিন শারীরিক কার্যকলাপের বড় সুবিধা হলো—এর জন্য আলাদা করে দীর্ঘ সময় বরাদ্দ করার প্রয়োজন হয় না। নিজের জীবনযাত্রার সঙ্গে মানানসই ছোট পরিবর্তন দিয়ে শুরু করা যায়।
প্রথমে প্রতিদিন কয়েকবার উঠে দাঁড়ানো, অল্প দূরত্ব হেঁটে যাওয়া কিংবা ঘরের কাজে অংশ নেওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে। ধীরে ধীরে এসব কাজ দৈনন্দিন রুটিনের অংশ হয়ে উঠতে পারে।

-6ae18c5a355a0.jpg)