প্রস্রাবেই ধরা পড়বে মূত্রথলি ক্যানসার, জানা যাবে কোন চিকিৎসায় মিলবে সমাধান
Advertisement
যুগান্তর ডেস্ক
প্রকাশ: ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৫৮ পিএম
ছবি: সংগৃহীক
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
মূত্রথলির ক্যানসার শনাক্ত করা, অস্ত্রোপচারের পর রোগের অবশিষ্টাংশ খুঁজে বের করা এবং কোন চিকিৎসায় রোগী বেশি উপকৃত হবেন, তা নির্ধারণে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে প্রস্রাবের একটি পরীক্ষা। যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড মেডিসিন ও ভিএ পালো আল্টো হেলথ কেয়ার সিস্টেমের গবেষকেরা এই পরীক্ষাটি তৈরি করেছেন। তাদের দাবি, প্রচলিত কয়েকটি পরীক্ষার তুলনায় নতুন পদ্ধতিটি ক্যানসার শনাক্ত করতে বেশি কার্যকর।
পরীক্ষাটিতে প্রস্রাবে থাকা ক্যানসার কোষ থেকে নিঃসৃত আরএনএ বিশ্লেষণ করা হয়। এর মাধ্যমে শুধু ক্যানসারের উপস্থিতি শনাক্ত করাই নয়, টিউমারের সক্রিয় বৈশিষ্ট্য সম্পর্কেও ধারণা পাওয়া সম্ভব। ফলে রোগী ইমিউনোথেরাপি নাকি কেমোথেরাপিতে বেশি উপকৃত হতে পারেন, তা অনুমান করতেও পরীক্ষাটি সহায়তা করতে পারে।
গবেষণাটি চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী নেচার মেডিসিনে প্রকাশিত হয়েছে। গবেষকদের তৈরি পরীক্ষাটির নাম ‘ইউআরএআরই-সিক’।
গবেষকেরা রোগী ও সুস্থ স্বেচ্ছাসেবীদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা ৬৮৩টি প্রস্রাবের নমুনা পরীক্ষা করেন। এতে নতুন পদ্ধতিটি মূত্রথলিতে সীমাবদ্ধ ক্যানসারে আক্রান্ত ৯৫ শতাংশ ব্যক্তিকে সঠিকভাবে শনাক্ত করতে পেরেছে। অন্যদিকে, যাদের ক্যানসার ছিল না, তাদের ৯০ শতাংশের ক্ষেত্রে পরীক্ষাটি সঠিকভাবে ক্যানসার না থাকার ফল দিয়েছে।
গবেষকদের দাবি, প্রচলিত ইউরিন সাইটোলজি পরীক্ষা এবং ডিএনএ-ভিত্তিক প্রস্রাব পরীক্ষার তুলনায় নতুন পদ্ধতিটি ভালো ফল দিয়েছে। অস্ত্রোপচার ও বিসিজি ইমিউনোথেরাপির পর শরীরে ক্যানসারের অবশিষ্টাংশ রয়ে গেছে কি না, তা শনাক্ত করতেও এটি কার্যকর বলে গবেষণায় দেখা গেছে।
তবে এই ফলাফল প্রাথমিক গবেষণার ওপর ভিত্তি করে পাওয়া। বৃহত্তর পরিসরে এবং একাধিক চিকিৎসাকেন্দ্রে আরও গবেষণার মাধ্যমে পরীক্ষাটির কার্যকারিতা যাচাই করতে চান গবেষকেরা।
বর্তমানে অনেক তরল নমুনাভিত্তিক ক্যানসার পরীক্ষায় ডিএনএর পরিবর্তন বা মিউটেশন খোঁজা হয়। কিন্তু মূত্রথলির স্বাভাবিক কোষেও এমন কিছু পরিবর্তন থাকতে পারে, যা ক্যানসার কোষের পরিবর্তনের সঙ্গে মিলে যায়। এতে পরীক্ষার ফল বিভ্রান্তিকর হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
নতুন পদ্ধতিতে ডিএনএর পরিবর্তে আরএনএ বার্তা বিশ্লেষণ করা হয়। আরএনএ থেকে কোষে কোন জিনগুলো সক্রিয় রয়েছে, সে সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। ফলে ক্যানসারের উপস্থিতি শনাক্ত করার পাশাপাশি টিউমারের আচরণ সম্পর্কেও তথ্য পাওয়া সম্ভব হতে পারে।
গবেষণার জ্যেষ্ঠ লেখক ও স্ট্যানফোর্ড মেডিসিনের অধ্যাপক ম্যাক্সিমিলিয়ান ডিয়েন বলেন, ডিএনএ বিশ্লেষণ থেকে ক্যানসার আছে কি না জানা যেতে পারে। আরএনএ বিশ্লেষণ ক্যানসারটি কী ধরনের কার্যকলাপ চালাচ্ছে, সে সম্পর্কেও ধারণা দেয়।
আরেক গবেষক অ্যাশ আলিজাদেহের মতে, ডিএনএ-ভিত্তিক কিছু পরীক্ষায় রোগীর টিউমারের নির্দিষ্ট মিউটেশন আগে থেকে শনাক্ত করতে হয়। কিন্তু আরএনএ বিশ্লেষণে রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত জৈবিক বৈশিষ্ট্য খোঁজা হয়। ফলে রোগীর টিউমারের নমুনার সঙ্গে আলাদাভাবে মিলিয়ে দেখার প্রয়োজন কমতে পারে।
কোন চিকিৎসায় উপকার হবে, আগেই বোঝার সম্ভাবনা
মূত্রথলির ক্যানসারের অস্ত্রোপচারের পর অনেক রোগীকে বিসিজি নামের একটি ইমিউনোথেরাপি দেওয়া হয়। যক্ষ্মার টিকা তৈরিতে ব্যবহৃত ব্যাকটেরিয়ার দুর্বল একটি ধরন থেকে তৈরি এই চিকিৎসা ক্যাথেটারের মাধ্যমে সরাসরি মূত্রথলিতে প্রয়োগ করা হয়। এর উদ্দেশ্য হলো, অস্ত্রোপচারের পর থেকে যাওয়া ক্যানসার কোষ ধ্বংস করতে রোগীর রোগপ্রতিরোধব্যবস্থাকে সক্রিয় করা।
তবে এই চিকিৎসা সবার ক্ষেত্রে সমান কার্যকর হয় না। গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব রোগী বিসিজি চিকিৎসায় সাড়া দিয়েছেন, তাদের চিকিৎসার আগের প্রস্রাবে টি-সেল ও রোগপ্রতিরোধব্যবস্থার কার্যকলাপের সঙ্গে সম্পর্কিত আরএনএ বার্তা বেশি ছিল। অন্যদিকে, যারা চিকিৎসায় সাড়া দেননি, তাদের নমুনায় দ্রুত বিভাজিত হওয়া টিউমার কোষের বৈশিষ্ট্য দেখা গেছে।
এই তথ্যের ভিত্তিতে গবেষকেরা এমন একটি জৈবিক সূচক তৈরি করেছেন, যা দিয়ে কোন রোগীর ক্যানসার ইমিউনোথেরাপি নাকি কেমোথেরাপিতে বেশি সাড়া দিতে পারে, তা অনুমান করা সম্ভব হতে পারে।
মূত্রথলির ক্যানসার শনাক্ত ও চিকিৎসার পর নজরদারিতে বর্তমানে সিস্টোস্কোপি নামে একটি পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। এতে সরু ক্যামেরাযুক্ত যন্ত্র মূত্রনালি দিয়ে মূত্রথলিতে প্রবেশ করিয়ে সন্দেহজনক টিস্যু পরীক্ষা করা হয়। তবে এই পদ্ধতিতে কিছু ক্যানসার শনাক্ত না হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। গবেষকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সিস্টোস্কোপিতে ক্যানসারের প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত ঘটনা শনাক্ত না-ও হতে পারে।
বিশেষ করে যাদের মূত্রথলির ক্যানসার পুনরায় হওয়ার ঝুঁকি বেশি, তাদের নিয়মিত বিরতিতে এই পরীক্ষা করাতে হয়। কিছু রোগীর ক্ষেত্রে প্রতি তিন মাস পরপর সিস্টোস্কোপি প্রয়োজন হতে পারে। এতে শারীরিক অস্বস্তির পাশাপাশি চিকিৎসার ব্যয়ও বাড়ে।
স্ট্যানফোর্ডের গবেষক জোসেফ লিয়াও বলেন, বর্তমানে ক্যানসারের নজরদারির জন্য সুপারিশ বা অনুমোদিত কোনো জৈবিক সূচক নেই। রোগীদের জন্য এসব চিকিৎসা শারীরিক ও আর্থিক—দুই দিক থেকেই কষ্টকর। চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নিতে সহায়ক পরীক্ষা তৈরি করা গেলে রোগী ও চিকিৎসক উভয়েই উপকৃত হতে পারেন।
যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিবছর প্রায় ৮৫ হাজার মানুষের মূত্রথলির ক্যানসার শনাক্ত হয়। রোগটি পুনরায় দেখা দেওয়ার প্রবণতা থাকায় দীর্ঘদিন ধরে নজরদারি প্রয়োজন হয়।

-6ae1a814d6c20.jpg)