Logo
Logo
×

Advertisement

ডাক্তার আছেন

সঠিক সময়ে অস্ত্রোপচার না হলে বাড়ে নবজাতকের মৃত্যুঝুঁকি

Advertisement

Icon

ডা. মো. শরীফ ইমাম

প্রকাশ: ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ০৬:২৩ পিএম

সঠিক সময়ে অস্ত্রোপচার না হলে বাড়ে নবজাতকের মৃত্যুঝুঁকি

ফাইল ছবি

Advertisement

অনেক নবজাতক বিভিন্ন ধরনের জন্মগত ত্রুটি নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। দক্ষ শিশু শল্যচিকিৎসক, অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট এবং আধুনিক নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (এনআইসিইউ) রয়েছে—এমন হাসপাতালে চিকিৎসা করানো গেলে এসব নবজাতকের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়।

কিন্তু বাংলাদেশে প্রায়ই চিত্রটি ভিন্ন। নবজাতক অসুস্থ হয়ে পড়লে পরিবারের সদস্যরা প্রথমে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক, গ্রাম্য চিকিৎসক কিংবা ঝাড়ফুঁককারী ও আধ্যাত্মিক নিরাময়কারীদের শরণাপন্ন হন। অস্ত্রোপচারের ভয়, কুসংস্কার এবং পুত্রসন্তানের প্রতি প্রবল পক্ষপাতের কারণে অনেক শিশুকন্যা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হয়। এমনকি দীর্ঘ বিলম্বের পর পরিবারগুলো যখন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসার জন্য যায়, তখন অনেক ক্ষেত্রে উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজনে নবজাতকদের নিকটবর্তী বিশেষায়িত হাসপাতালে পাঠানো হয়।

ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে যায়। শরীরের তাপমাত্রা কমে যাওয়া, পানিশূন্যতা ও জীবাণুর সংক্রমণের কারণে নবজাতকেরা এতটাই দুর্বল হয়ে পড়ে যে জীবন রক্ষাকারী অস্ত্রোপচার আর সম্ভব হয় না, কিংবা তা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। এ ছাড়া অপরিণত জন্ম (প্রিম্যাচিউরিটি) এবং কম জন্ম-ওজনের কারণে অস্ত্রোপচারের পর শিশুমৃত্যুর ঝুঁকি তিন গুণেরও বেশি বেড়ে যায়।

এসব সমস্যা যথাযথভাবে শনাক্ত ও সমাধান করার মতো সক্ষমতা আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় এখনো গড়ে ওঠেনি। বাংলাদেশে প্রতি দুই লাখ শিশুর জন্য রয়েছেন মাত্র একজন শিশু শল্যচিকিৎসক (পেডিয়াট্রিক সার্জন) এবং প্রতি দেড় লাখ মানুষের জন্য রয়েছেন একজন অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট। শিশুদের জন্য বিশেষজ্ঞ অ্যানেস্থেসিওলজিস্টের সংখ্যা আরও নগণ্য।

দেশের ৫০টি জেলা হাসপাতালে নবজাতকদের জন্য বিশেষায়িত সেবা কেন্দ্র (এনআইসিইউ) এবং প্রায় ২২টি জেলা হাসপাতালে শিশুদের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (পিআইসিইউ) রয়েছে। তবে বড় শহর ও প্রধান স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের বাইরে ইনফিউশন পাম্প, ইনকিউবেটর, ভেন্টিলেটর এবং নিরবচ্ছিন্ন অক্সিজেন সরবরাহের ব্যবস্থায় ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে।

জাতীয় বাজেটের মাত্র ৫ থেকে ৫ দশমিক ৪ শতাংশ প্রতিবছর স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়। অন্যদিকে, স্বাস্থ্যসেবা ব্যয়ের প্রায় তিন-চতুর্থাংশই পরিবারের সদস্যদের নিজস্ব অর্থ থেকে বহন করতে হয়। ফলে নবজাতকের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচারের ব্যয় পরিবারের জন্য অসহনীয় আর্থিক বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। এর প্রভাব পড়ে অস্ত্রোপচার-পরবর্তী দীর্ঘমেয়াদি তদারকি বা ফলোআপ ব্যবস্থার ওপরও।

বাংলাদেশে নবজাতকের বেঁচে থাকার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। ২০১৭ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে প্রতি এক হাজার জীবিত জন্মে নবজাতকের মৃত্যুহার ২৭ থেকে কমে প্রায় ১৮-তে নেমে এসেছে। তবুও বাংলাদেশে নবজাতকের মৃত্যুর প্রায় ১২ দশমিক ৭ শতাংশের জন্য জন্মগত ত্রুটি দায়ী, যা জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অ্যানোরেক্টাল ম্যালফরমেশন (মলদ্বার ও মলাশয়ের গঠনগত ত্রুটি), গ্যাস্ট্রোস্কিসিস, ইনটেস্টাইনাল অ্যাট্রেসিয়া এবং হার্শস্প্রং ডিজিজের মতো অনেক জন্মগত সমস্যা সময়মতো চিকিৎসার মাধ্যমে নিরাময় করা সম্ভব। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে নবজাতকদের অস্ত্রোপচারের পর মৃত্যুহার প্রায় ২০ থেকে ৩০ শতাংশ, যার বড় একটি অংশ প্রতিরোধযোগ্য। এসব সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে অস্ত্রোপচারকক্ষে যাওয়ার অনেক আগেই।

প্রথমত, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে নবজাতকের স্বাস্থ্য সম্পর্কে প্রয়োজনীয় জ্ঞান পৌঁছে দিতে হবে। কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মী এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের এমনভাবে প্রশিক্ষণ দিতে হবে, যাতে তাঁরা ঝুঁকিপূর্ণ নবজাতকের লক্ষণ দ্রুত শনাক্ত করতে পারেন এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য দ্রুত বিশেষায়িত হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করতে পারেন। অ্যাসোসিয়েশন অব পেডিয়াট্রিক সার্জনস অব বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশ পেডিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশন যৌথভাবে বিভিন্ন কর্মশালা ও জনসচেতনতামূলক প্রচারণার মাধ্যমে এ কাজে সহায়তা করতে পারে।

দ্বিতীয়ত, প্রসবপূর্ব সেবার মান উন্নত করা অপরিহার্য। বর্তমানে ৪৭ শতাংশ গর্ভবতী নারী গর্ভকালীন সময়ে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নির্ধারিত চারটি স্বাস্থ্য পরীক্ষা বা ভিজিট সম্পন্ন করেন। এক দশক আগে এ হার ছিল ৩১ শতাংশ। গর্ভাবস্থার ২৪ সপ্তাহের মধ্যে অন্তত একবার আলট্রাসনোগ্রাম করালে গর্ভস্থ শিশুর অর্ধেকেরও বেশি গুরুতর শারীরিক ত্রুটি শনাক্ত করা সম্ভব হয়। এর ফলে পরিবারগুলো সন্তান প্রসবের জন্য এমন হাসপাতাল বেছে নিতে পারে, যেখানে এনআইসিইউ সুবিধা এবং তাৎক্ষণিক প্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচারের ব্যবস্থা রয়েছে।

তৃতীয়ত, পরিবহণ ও রেফারেল প্রক্রিয়াকে আরও নিরাপদ করতে হবে। নবজাতককে উষ্ণ ও আর্দ্র পরিবেশে রাখতে হবে এবং তার শারীরিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হবে। স্থানান্তরের সময় বিশেষ মাল্টি-চ্যানেল ট্রান্সপোর্ট মনিটরের মাধ্যমে প্রতি ৩০ মিনিট অন্তর তার শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে হবে। নবজাতকের শ্বাসনালি সচল ও পরিষ্কার রাখতে একজন দক্ষ চিকিৎসক এবং একজন প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীকে অবশ্যই সঙ্গে রাখতে হবে। পাশাপাশি, রেফারেল হাসপাতালকে নবজাতকের আগমন এবং তার বর্তমান শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে আগেই বিস্তারিত জানিয়ে রাখতে হবে।

চতুর্থত, প্রয়োজন পর্যাপ্ত অবকাঠামো ও দক্ষ জনবল। বাংলাদেশের প্রতিটি বিভাগে শিশুদের জন্য স্বতন্ত্র হাসপাতাল থাকা জরুরি, যেখানে এনআইসিইউ ও পিআইসিইউতে অভিজ্ঞ এবং পর্যাপ্তসংখ্যক চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী থাকবেন। নবজাতকের জন্মগত ত্রুটির অস্ত্রোপচার শিশু শল্যচিকিৎসার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই শিশু শল্যচিকিৎসক, বিশেষজ্ঞ অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট ও নিওনেটোলজিস্টের সংখ্যা বাড়ানো জরুরি। সীমিত সম্পদের মধ্যেও কিছু কার্যকর পদ্ধতি—যেমন লোকাল ও কডাল অ্যানেস্থেসিয়া এবং সম্ভব হলে মিনিমালি ইনভেসিভ সার্জারি—অস্ত্রোপচারকে আরও নিরাপদ করে তুলতে পারে।

পঞ্চমত, নবজাতকের জন্মগত ত্রুটি ও সংশ্লিষ্ট চিকিৎসাপদ্ধতি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। এ জন্য একটি জাতীয় ডেটাবেইস তৈরি করা প্রয়োজন, যেখানে নবজাতকের জন্মগত ত্রুটি ও অস্ত্রোপচারসংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষিত থাকবে এবং তা সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে। এই ডেটাবেইসের মাধ্যমে জানা যাবে, কোথায় এবং কী কারণে নবজাতকেরা মারা যাচ্ছে। এ বিষয়ে প্রকাশিত গবেষণালব্ধ তথ্য সরকারের নীতিনির্ধারক ও দাতাসংস্থাগুলোকে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগে উৎসাহিত করবে।

সরকারি নেতৃত্ব ছাড়া এসব উদ্যোগের কোনোটিই পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। নবজাতকের অস্ত্রোপচার অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ, ব্যয়বহুল এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। তাই এর দায়িত্ব কেবল বেসরকারি খাত কিংবা পরিবারের সঞ্চয়ের ওপর ছেড়ে দেওয়া যায় না। আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সহযোগিতায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য মন্ত্রণালয়কে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

বাংলাদেশে জন্মগ্রহণকারী প্রতিটি শিশুরই জীবনে সমান সুযোগ পাওয়ার অধিকার রয়েছে। নবজাতকের প্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচারসেবা কোনো বিশেষ সুবিধা, ভৌগোলিক অবস্থান কিংবা পারিবারিক আয়ের ওপর নির্ভরশীল হওয়া উচিত নয়; বরং এটি একটি মৌলিক অধিকার। রোগনির্ণয়ে দ্রুত পদক্ষেপ, নিরাপদ রেফারেল ব্যবস্থা, প্রশিক্ষিত জনবল এবং সরকারি বিনিয়োগের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা গেলে নবজাতকের জন্মগত ত্রুটিজনিত সমস্যাগুলো সফলভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব হবে।

লেখক

ডা. মো. শরীফ ইমাম

সহকারী অধ্যাপক, পেডিয়াট্রিক সার্জারি বিভাগ

চেম্বার: আলোক হাসপাতাল লিমিটেড

হটলাইন: ১০৬৭২, ০৯৬১০১০০৯৯৯

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

পুরুষের বন্ধ্যত্বের কারণ কী, চিকিৎসা ও করণীয়

পুরুষের বন্ধ্যত্বের কারণ কী, চিকিৎসা ও করণীয়

মায়ের ঠান্ডা লাগলে কি নবজাতকেরও ঠান্ডা লাগে, কী বলছে চিকিৎসাবিজ্ঞান?

মায়ের ঠান্ডা লাগলে কি নবজাতকেরও ঠান্ডা লাগে, কী বলছে চিকিৎসাবিজ্ঞান?

টিবি আক্রান্ত রোগের লক্ষণ

টিবি আক্রান্ত রোগের লক্ষণ

ঘনঘন মাথা ব্যথার কারণ কী?

ঘনঘন মাথা ব্যথার কারণ কী?

রাতে মাত্র ৪ ঘণ্টা ঘুম, পুরুষের জন্য যে বিপদ

রাতে মাত্র ৪ ঘণ্টা ঘুম, পুরুষের জন্য যে বিপদ

সিফিলিস কী? এ থেকে বাঁচার উপায়

সিফিলিস কী? এ থেকে বাঁচার উপায়

আরও পড়ুন

সঠিক সময়ে অস্ত্রোপচার না হলে বাড়ে নবজাতকের মৃত্যুঝুঁকি

সঠিক সময়ে অস্ত্রোপচার না হলে বাড়ে নবজাতকের মৃত্যুঝুঁকি

৭ কারণে দেখা দেয় রক্তস্বল্পতা, লক্ষণ ও প্রতিরোধে করণীয়

৭ কারণে দেখা দেয় রক্তস্বল্পতা, লক্ষণ ও প্রতিরোধে করণীয়

ত্বক তারুণ্য ধরে রাখতে খাবেন যেসব খাবার, জানুন ৩ উপায়

ত্বক তারুণ্য ধরে রাখতে খাবেন যেসব খাবার, জানুন ৩ উপায়

ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে-পিছিয়ে দিলে কি স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ে?

ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে-পিছিয়ে দিলে কি স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ে?

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম