যেভাবে ২৪০ কোটি টাকার মালিক ৪ বার এমি অ্যাওয়ার্ড পাওয়া এমিলিয়া
Advertisement
বিনোদন ডেস্ক
প্রকাশ: ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৩৬ পিএম
হলিউড অভিনেত্রী এমিলিয়া ক্লার্ক। ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বেঁচে যাওয়াই যথেষ্ট নয়, সুস্থ হয়ে ওঠাও সমান গুরুত্বপূর্ণ বলে জানিয়েছেন ব্রিটিশ অভিনেত্রী এমিলিয়া ক্লার্ক । শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) ছিল তার জন্মদিন। ১৯৮৬ সালের এই দিনে লন্ডনে জন্ম নেওয়া ব্রিটিশ অভিনেত্রী ২০২৬ সালে পা দিলেন ৪০ বছরে। তিনি এইচবিওর বিখ্যাত ফ্যান্টাসি ড্রামা সিরিজ গেম অব থ্রোনসে 'ডিনেরিস টারগেরিয়ান' বা 'মাদার অব ড্রাগনস' চরিত্রে অভিনয় করে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি পান। তার এই দুর্দান্ত অভিনয়ের জন্য চারবার প্রাইমটাইম এমি পুরস্কারের জন্য মনোনীত হন তিনি।
এ অভিনেত্রীকে বিশ্বের কোটি দর্শক চেনেন শুধু ‘ড্রাগনের মা’ হিসেবে। কিন্তু পর্দার আড়ালে তার জীবনের সবচেয়ে বড় যুদ্ধটি ছিল না কোনো কাল্পনিক রাজ্যের জন্য। সেটি ছিল নিজের জীবন বাঁচানোর লড়াই।
মাত্র ২২ বছর বয়সে যখন তার অভিনীত ‘গেম অব থ্রোনস’ বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তুলতে শুরু করে, ঠিক তখনই আচমকা মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণে আক্রান্ত হন এমিলিয়া ক্লার্ক। এরপর আবার ২৪ বছর বয়সে দ্বিতীয়বারের মতো একই বিপর্যয়ের মুখোমুখি হন তিনি।
একটা সময় এমিলিয়া ক্লার্কের বাবা পিটার ক্লার্ক কাজ করতেন থিয়েটারে সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে। মা জেনিফার ডড ক্লার্ক ছিলেন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের বিপণন বিভাগের সঙ্গে যুক্ত। বাবার কাজের সুবাদেই ছোটবেলায় থিয়েটারের পরিবেশের সঙ্গে পরিচয় হয় এমিলিয়ার। মাত্র তিন বছর বয়সে শো বোট মঞ্চনাটক দেখার পর অভিনয়ের প্রতি তার আগ্রহ তৈরি হয়।
এমিলিয়া স্কুলজীবন থেকেই নাটকে অভিনয় করতেন। ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ডশায়ারে পড়াশোনা শেষে লন্ডনের ড্রামা সেন্টারে অভিনয় শেখেন। ২০০৯ সালে পড়াশোনা শেষ করে পেশাদার অভিনয়জীবন শুরু করেন। ২০১১ সালে সেই সুযোগ এল ‘গেম অব থ্রোনস’ সিরিজের মাধ্যমে। জর্জ আর আর মার্টিনের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত এই ফ্যান্টাসি সিরিজে ডেনেরিস টারগারিয়েনের চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকদের মন জয় করে নেন এমিলিয়া। চরিত্রটির বিবর্তন পর্দায় ফুটিয়ে তোলেন তিনি। সাদা চুলের ড্রাগনের মা হিসেবে তার উপস্থিতি হয়ে ওঠে সিরিজটির অন্যতম পরিচিত দৃশ্যচিহ্ন। সিরিজটি এমিলিয়াকে বিশ্বজুড়ে তারকাখ্যাতি এনে দেয়।
এই চরিত্রের জন্য চারবার প্রাইমটাইম এমি পুরস্কারের মনোনয়ন পেয়েছেন তিনি। ২০১৯ সালে সেরা অভিনেত্রী বিভাগেও মনোনয়ন পান। ‘গেম অব থ্রোনস’ তাকে শুধু পরিচিতিই দেয়নি, হলিউডের বড় বাজেটের চলচ্চিত্রে কাজের দরজাও খুলে দিয়েছে। বড়পর্দার পাশাপাশি মঞ্চেও কাজ করেছেন এমিলিয়া।
২০১৩ সালে ব্রডওয়েতে ‘ব্রেকফাস্ট অ্যাট টিফানিজ’ নাটকে হলি গোলাইটলি চরিত্রে অভিনয় করেন। পরে লন্ডনের ওয়েস্ট এন্ডেও মঞ্চে অভিনয় করেছেন। ২০১৮ সালে ব্রিটিশ শিল্পী হিসেবে বাফটা লস অ্যাঞ্জেলেসের ব্রিটানিয়া পুরস্কার পান। ২০১৯ সালে টাইম সাময়িকীর বিশ্বের ১০০ প্রভাবশালী ব্যক্তির তালিকাতেও জায়গা করে নেন তিনি।
সদ্য সম্প্রচার শুরু হয়েছে ‘গেম অব থ্রোনস’-এর প্রথম মৌসুম। অজানা এক তরুণী রাতারাতি আন্তর্জাতিক তারকায় পরিণত হচ্ছেন। কিন্তু ক্যারিয়ারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়েই একদিন জিমে ব্যায়াম করার সময় অসহনীয় মাথাব্যথা অনুভব করেন এমিলিয়া ক্লার্ক। পরে হাসপাতালে নিলে জানা যায়, তার মস্তিষ্কে অ্যানিউরিজম ফেটে গেছে। জরুরি অস্ত্রোপচার ছাড়া বাঁচার সম্ভাবনা নেই।
অভিনেত্রীর অস্ত্রোপচার সফল হলেও সামনে অপেক্ষা করছিল দীর্ঘ পুনর্বাসন। স্মৃতিশক্তি হারানোর ভয়, কথা বলতে না পারার আতঙ্ক— সবকিছুর মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে তাকে। তবে সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো— কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তিনি আবার ক্যামেরার সামনে ফিরে যান। বাইরে থেকে দেখে মনে হচ্ছিল সব ঠিক আছে। কিন্তু সত্যিটা ছিল ভিন্ন।
এমিলিয়া বলেন, বহু বছর ধরে তার মনে হতো তিনি যেন মৃত্যুকে প্রতারণা করে বেঁচে আছেন। তিনি বলেন, ‘আমি মনে করতাম— আমার এখানে থাকার কথা নয়। মনে হতো আমি যেন কোনো ভুল করেছি, আর মৃত্যু একদিন এসে আমাকে নিয়ে যাবে।’ এই মানসিক চাপ তাকে দীর্ঘদিন তাড়া করেছে। অনেক সময় এমিলিয়া অস্বাভাবিক ক্লান্তি অনুভব করতেন। উদ্বেগে ভুগতেন। এমনকি মস্তিষ্কের আঘাতের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবও তিনি বুঝতে পারেননি। কারণ চিকিৎসকরাও তখন তাকে ‘সুস্থ’ বলেই ধরে নিয়েছিলেন।
২০১৪ সালে আবারও ব্রেন হেমারেজে আক্রান্ত হন এমিলিয়া ক্লার্ক। এবার পরিস্থিতি আরও জটিল ছিল। দ্বিতীয় অস্ত্রোপচারও করতে হয়। একদিকে বিশ্বখ্যাত সিরিজের চাপ, অন্যদিকে মৃত্যুভয়— সব মিলিয়ে তার জীবন যেন এক অনিশ্চিত যাত্রা। তবু তিনি কাজ থামাননি।
আজকের দিনে তারকারা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা সহজেই শেয়ার করে নেন। কিন্তু এমিলিয়া দীর্ঘদিন নিজের অসুস্থতার কথা প্রকাশ করেননি। কারণ তিনি লজ্জা পেতেন।, রোগটি সম্পর্কে তিনি নিজেই ঠিকমতো বুঝতেন না। ভয় ছিল, মানুষ তাকে দুর্বল ভাববে। এমনকি এইচবিওকেও প্রথম দিকে বিষয়টি জানানো হয়নি। চিকিৎসকরা নিশ্চিত হওয়ার পর যে তিনি বেঁচে থাকবেন, তখন বিষয়টি জানানো হয়। এমিলিয়া বলেন, ‘যখন সবাই আপনাকে স্বাভাবিক মনে করে, তখন আপনিও নিজেকে জোর করে স্বাভাবিক ভাবতে শুরু করেন। কিন্তু বাস্তবে উদ্বেগ, স্মৃতিজনিত সমস্যা, মানসিক ক্লান্তি, আত্মবিশ্বাসের সংকট— এসব অনেক বছর ধরে থেকে যেতে পারে।
এমিলিয়ার আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস হচ্ছে গেম অব থ্রোনস। অভিনয়ের পাশাপাশি বিজ্ঞাপন ও বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সঙ্গে কাজ করেও আয় করেছেন তিনি। বিলাসবহুল গহনার ব্র্যান্ড ডিওর, সুগন্ধি ব্র্যান্ড ডলচে অ্যান্ড গাব্বানা ও প্রসাধনসামগ্রী প্রতিষ্ঠান ক্লিনিকের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এমিলিয়া। এসব কাজ তার আয়ের পরিধি বাড়িয়েছে।
সে কারণে এমিলিয়া ক্লার্কের সাফল্য পাল্লা দিয়ে দিন দিন বেড়েছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত প্যারেড সাময়িকীর এক প্রতিবেদনে সেলিব্রিটি সম্পদবিষয়ক ওয়েবসাইট সেলিব্রিটি নেট অর্থের হিসাব উদ্ধৃত করে তার মোট সম্পদের পরিমাণ আনুমানিক দুই কোটি মার্কিন ডলার বলা হয়েছে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ২৪০ কোটি টাকা।


