Logo
Logo
×

Advertisement

আনন্দ নগর

ফ্রান্সে সরকারবিরোধী আন্দোলন

হলিউডের শুটিং নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ

প্যারিস থেকে মার্সেই-সহিংসতা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগে অস্থির ফ্রান্স। নিরাপত্তা নিয়ে সতর্ক হলিউডের প্রযোজনা সংস্থাগুলো। বিপর্যয়ের মুখে পড়ার আশঙ্কা আন্তর্জাতিক সিনেমা শিল্পের, তবে সংকটের মধ্যেও প্রেক্ষাগৃহে দর্শকের উপস্থিতি দিচ্ছে আশার ইঙ্গিত। বিস্তারিত রয়েছে এ প্রতিবেদনে।

Advertisement

Icon

এফ আই দীপু

প্রকাশ: ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

Advertisement

গত কয়েকদিন ধরে ফ্রান্সের রাস্তায় দাঙ্গা, দোকানে লুটপাট, ঐতিহাসিক স্থাপনায় অগ্নিসংযোগ আর শহরজুড়ে রাতের কারফিউ-এমন পরিস্থিতিতে নতুন করে উদ্বেগে পড়েছে দেশটির সিনেমা ও বিনোদনশিল্প। যে ফ্রান্স আন্তর্জাতিক সিনেমা ও টেলিভিশন প্রযোজনার অন্যতম আকর্ষণীয় গন্তব্য, সে দেশেই এখন শুটিংয়ের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। পরিস্থিতির প্রভাব পড়তে শুরু করেছে প্রেক্ষাগৃহের প্রদর্শনী, দর্শক উপস্থিতি এবং ভবিষ্যৎ প্রযোজনার পরিকল্পনায়ও।

অথচ একই সময় ফ্রান্সে চলছে হলিউডের একাধিক বড় প্রকল্পের কাজ। নেটফ্লিক্সের ‘এমিলি ইন প্যারিস’ এবং এইচবিওর দ্য হোয়াইট লোটাস’-এর মতো জনপ্রিয় সিরিজের শুটিংয়ের কারণে দেশটি আন্তর্জাতিক বিনোদন জগতের নজরে রয়েছে। কিন্তু জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও সরকারি স্কুলের অবনতিশীল পরিস্থিতি নিয়ে ১৭ অক্টোবর শুরু হওয়া দেশব্যাপী বিক্ষোভ দ্রুত সহিংসতায় রূপ নেওয়ায় সেই আকর্ষণ এখন নিরাপত্তাসংক্রান্ত উদ্বেগে ঢাকা পড়েছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের বরাতে জানা গেছে, দেশটিতে বিক্ষোভের প্রথম পর্যায়ে প্রায় পাঁচ লাখ ৫০ হাজার মানুষ রাস্তায় নেমেছিলেন। পরে বিভিন্ন শহরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। শুরু হয় লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ। কর্তৃপক্ষের হিসাবে গ্রেফতারের সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় আড়াই হাজার। ক্ষতিগ্রস্ত হয় অন্তত ৩ হাজার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন স্থাপনা। সহিংসতার বিস্তার ঠেকাতে প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁর নির্দেশে প্যারিস, মার্সেই, লিয়ঁ, লিল, লিমোজ ও বোর্দোসহ একাধিক বড় শহরের নির্দিষ্ট এলাকায় রাতের কারফিউ জারি করা হয়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে রাতের বিনোদন, প্রেক্ষাগৃহের প্রদর্শনী এবং চলচ্চিত্রকর্মীদের চলাচলে।

* ফ্রান্সে শুটিং নিয়ে হলিউডের সতর্কবার্তা

অস্থিরতার মধ্যেও ফ্রান্সে বেশ কয়েকটি বড় আন্তর্জাতিক প্রযোজনার কাজ চলছিল। মাইক হোয়াইটের ‘দ্য হোয়াইট লোটাস’-এর চতুর্থ সিজনের শেষ পর্যায়ের শুটিং হচ্ছে ফরাসি রিভিয়েরা অঞ্চলে। ব্র্যাডলি কুপার পরিচালিত ও অভিনীত ওয়ার্নার ব্রাদার্সের ‘ওশানস’ সিরিজের প্রিক্যুয়েলের শুটিং চলছে মোনাকোতে। সিনেমাটিতে তার সঙ্গে রয়েছেন মার্গট রবি, জর্জ ম্যাকে ও মনিকা বারবারো। অন্যদিকে, মিমি কেইভ পরিচালিত মনস্তাত্ত্বিক থ্রিলার ‘পাম্পিং ব্ল্যাক’-এর শুটিং হচ্ছে নিস শহরে। এতে অভিনয় করছেন নাটালি পোর্টম্যান, জোনাথন বেইলি ও লুকাস গেজ।

এখন পর্যন্ত অবশ্য এসব প্রযোজনার কাজ বড় ধরনের বাধার মুখে পড়েনি। তবে শুটিং ইউনিটগুলোর মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ‘পাম্পিং ব্ল্যাক’-এর নির্বাহী প্রযোজক রাফায়েল বেনোলিয়েল জানান, মার্কিন দলের সদস্যরা পরিস্থিতির নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। তাদের আশ্বস্ত করা হয়েছিল যে, শুটিংয়ের স্থান থেকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং কাজ নির্বিঘ্নে চলছে।

কিন্তু ভবিষ্যতের শুটিংয়ের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে। বেনোলিয়েলের আরও জানিয়েছেন, হলিউডের স্টুডিওগুলোর নিরাপত্তা বিভাগ ইতোমধ্যে প্যারিস ও মার্সেই এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে। এমনকি এসব শহরে শুটিংয়ের স্থান পরিদর্শনের পরিকল্পনাও স্থগিত রাখার নির্দেশ আসতে পারে। তিনি বলেন, ‘যা ঘটেছে, তার কারণে ফ্রান্সকে এখন সমস্যাপ্রবণ এলাকা হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে।’ আন্তর্জাতিক প্রযোজনার জন্য এ সতর্কবার্তা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, শুটিংয়ের গন্তব্য নির্ধারণে শুধু লোকেশনের সৌন্দর্য বা অবকাঠামো নয়, নিরাপত্তা, যাতায়াত এবং বিমার ঝুঁকিও বিবেচনা করতে হয়।

তবে দক্ষিণ ফ্রান্সের সব অঞ্চল সমানভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। বেনোলিয়েলের মতে, মার্সেই বাদে দক্ষিণাঞ্চলের অনেক জায়গায় পরিস্থিতি প্যারিস বা লিলের তুলনায় ভালো রয়েছে। তিনি জানান, টেলিভিশনের পর্দায় দেখা দৃশ্য সবসময় ঘটনাস্থলের বাস্তব পরিস্থিতিকে পুরোপুরি তুলে ধরে না।

* নিসে আতঙ্ক, মোনাকোতে শুটিং শেষের প্রস্তুতি

ওশানস প্রিক্যুয়েলের প্রযোজনাসংক্রান্ত পরিষেবার দায়িত্বে থাকা গোমঁর নির্বাহী ইসাবেল দেজর্গ জানান, নিসে অবস্থানরত তার ইউনিটের সদস্যদের মধ্যে কিছুটা আতঙ্ক ছড়িয়েছিল। সপ্তাহান্তে শহরের কয়েকটি দোকানে লুটপাটের ঘটনা ঘটায় বড় বাজেটের মার্কিন সিনেমার কর্মীরা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন।

সৌভাগ্যক্রমে, গত শনিবার ও রোববার সিনেমাটির শুটিং ছিল না। ফলে ইউনিটের কেউ সরাসরি সহিংসতার মধ্যে পড়েননি। তবে দূর থেকে ঘটনাগুলো দেখার অভিজ্ঞতা তাদের মধ্যে অস্বস্তি তৈরি করে। সিনেমাটির শুটিং জুলাইয়ের শেষ দিকে প্যারিসে শুরু হয়েছিল। পরে ইউনিট মোনাকোতে চলে যায়। সেখানে কাজ শেষ করে বেলজিয়ামের একটি ওয়াটার ট্যাংকে কয়েক দিনের অতিরিক্ত শুটিং করার পরিকল্পনা রয়েছে।

দেজর্গের আশঙ্কা, সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সহিংসতার দৃশ্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রযোজকদের ফ্রান্সে কাজ করার বিষয়ে সাময়িকভাবে দ্বিধায় ফেলতে পারে। তিনি বলেন, এর প্রভাব কয়েক সপ্তাহ ধরে থাকতে পারে। পরিস্থিতি জুলাইয়ের মতো ব্যস্ত পর্যটন মৌসুমে ঘটেনি-এটিকে তিনি স্বস্তির বিষয় হিসাবে দেখছেন।

* ২ হাজার ৫০০ প্রেক্ষাগৃহের মধ্যে ২০-৩০টি প্রভাবিত

শুধু শুটিং নয়, ফ্রান্সের প্রদর্শনী খাতেও চাপ তৈরি হয়েছে। ফ্রান্সের ন্যাশনাল ফেডারেশন অব ফ্রেঞ্চ সিনেমাসের (এফএনসিএফ) সভাপতি রিশার পাত্রির হিসাবে, কারফিউয়ের কারণে প্রায় ২০ থেকে ৩০টি প্রেক্ষাগৃহ সরাসরি প্রভাবিত হয়েছে। দেশটিতে মোট প্রেক্ষাগৃহের সংখ্যা প্রায় ২ হাজার ৫০০। প্যারিসের ইউজিসি সিনে সিতে লে আলের মতো ব্যস্ত মাল্টিপ্লেক্সেও প্রদর্শনীর সময় এগিয়ে আনতে হয়েছে। কারফিউ শুরু হওয়ার আগে দর্শকরা যাতে বাড়ি ফিরতে পারেন, সেজন্য দিনের শেষ শো সন্ধ্যা সাতটায় নির্ধারণ করা হয়।

পাত্রির মতে, গুরুত্বপূর্ণ সিনেমাহল আগে বন্ধ করার প্রভাব অনিবার্য। কারফিউয়ের কারণে কিছু দর্শক সেখানে যাওয়া এড়িয়ে চলছেন। তবে গোটা দেশের দর্শকসংখ্যার ওপর দাঙ্গার প্রভাব ঠিক কতটা, তা নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন।

রেন্ট্রাক ফ্রান্সের কর্মকর্তা এরিক মার্তির তথ্য অনুযায়ী, দাঙ্গার প্রথম শনিবার আগের সপ্তাহান্তের তুলনায় সিনেমার দর্শকসংখ্যা প্রায় এক লাখ কমেছিল। স্কুলের ছুটি শুরুর সময় হওয়ায় এটি ছিল হতাশাজনক। তবে পরদিন রোববার দর্শকসংখ্যা আগের সপ্তাহের একই দিনের তুলনায় ৮০ হাজার বেড়ে যায়। অর্থাৎ, শনিবারের ঘাটতির কিছুটা পুষিয়ে নেওয়ার প্রবণতা দেখা গেছে।

* সংকটেও বাড়ছে বক্স অফিস

দাঙ্গার প্রভাব সত্ত্বেও ফরাসি বক্স অফিসের সামগ্রিক চিত্র পুরোপুরি নেতিবাচক নয়। প্রতিবেদনে উদ্ধৃত পাত্রির তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার শেষ হওয়া সপ্তাহে মোট দর্শক সংখ্যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১২ শতাংশ বেশি ছিল। ২০২৬ সালের শুরু থেকে ফরাসি বক্স অফিসের আয়ও বেড়েছে ২৬ শতাংশের বেশি।

গত সপ্তাহে মুক্তি পাওয়া স্টুডিওক্যানালের ‘লে মিজেরাবল’ সিনেমাটি প্রথম সপ্তাহান্তে ধীরগতিতে শুরু করলেও প্রথম সপ্তাহে ৪ লাখ ৮০ হাজার ৮২২টি টিকিট বিক্রি করেছে। এ পরিসংখ্যান দেখায়, নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও দর্শকের সিনেমা দেখার আগ্রহ পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি।

পাত্রি বলেন, ‘পরিস্থিতি যতই উদ্বেগজনক হোক না কেন, মানুষ এখনো সিনেমাহলে যেতে চায়। আর তারা যাচ্ছেও।’

* সামনে নির্বাচন, নজর পরিস্থিতির গতি-প্রকৃতিতে

ফ্রান্সের সিনেমা প্রযোজক ও প্রেক্ষাগৃহের মালিকরা এখন পরিস্থিতির পরবর্তী গতি-প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে আছেন। প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে সহিংসতা দীর্ঘস্থায়ী হবে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। জনমত সমীক্ষায় কট্টর ডানপন্থি ও উগ্র বামপন্থি দলগুলোর অবস্থানও রাজনৈতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। এদিকে নতুন করে দেশব্যাপী বিক্ষোভের কর্মসূচি থাকলেও কিছু বড় বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান পূর্বনির্ধারিত সূচি অনুযায়ী এগোনোর কথা। এর মধ্যে প্যারিসে নিউ অরলিন্স সেইন্টস ও পিটসবার্গ স্টিলার্সের এনএফএল ম্যাচ এবং ২৯ অক্টোবর অ্যাকর অ্যারেনায় ম্যাকলমোরের ‘ফ্রি প্যালেস্টাইন’ ট্যুর উল্লেখযোগ্য। তবে পরিস্থিতি বিবেচনায় ফ্রান্সের সামনে এখন দ্বিমুখী বাস্তবতা।

একদিকে সহিংসতা ও কারফিউ আন্তর্জাতিক প্রযোজকদের আস্থা এবং বিনোদনশিল্পের স্বাভাবিক কার্যক্রমকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে; অন্যদিকে প্রেক্ষাগৃহে দর্শকের প্রত্যাবর্তন ইঙ্গিত দিচ্ছে, সংকটের মধ্যেও সিনেমার প্রতি আগ্রহ টিকে রয়েছে। আগামী কয়েক সপ্তাহে পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, তার ওপর নির্ভর করতে পারে ফ্রান্সের আন্তর্জাতিক শুটিং গন্তব্য হিসাবে ভাবমূর্তি এবং দেশটির বিনোদনশিল্পের স্বাভাবিক ছন্দে ফেরার গতি।

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

ফ্রান্সে সরকারবিরোধী আন্দোলন হলিউডের শুটিং নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ

হলিউডের শুটিং নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ

সহসাই হচ্ছে না তিশার অভিষেক

সহসাই হচ্ছে না তিশার অভিষেক

আবারও মঞ্চে ‘এনিমেল ফার্ম’

আবারও মঞ্চে ‘এনিমেল ফার্ম’

নতুন ভিডিওতে মেহরাজ খান

নতুন ভিডিওতে মেহরাজ খান

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম