Logo
Logo
×

Advertisement

সারাদেশ

হাসপাতালের বেডে মৃত্যুর প্রহর গোনা তাইজুল এখন বিচারক

Advertisement

Icon

মাদারীপুর প্রতিনিধি

প্রকাশ: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:২১ পিএম

হাসপাতালের বেডে মৃত্যুর প্রহর গোনা তাইজুল এখন বিচারক

এসএম তাইজুল ইসলাম

Advertisement

মাত্র আড়াই বছর বয়সেই বাবাকে হারিয়েছিলেন এসএম তাইজুল ইসলাম। স্বামীকে হারিয়ে তিন সন্তানকে নিয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন মা হাওয়া বেগম। অভাবের সংসারে কখনো না খেয়ে থেকেছেন, কখনো সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিতে না পেরে কেঁদেছেন। তবু একটি স্বপ্ন আঁকড়ে ধরে ছিলেন—ছেলেকে পড়াশোনা করিয়ে একদিন বিচারকের আসনে বসাবেন।

মায়ের সেই স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। তবে বিচারকের আসনে পৌঁছানোর পথটি ছিল কণ্টকাকীর্ণ। পিতৃহীন শৈশব, দারিদ্র্য ও কঠিন সংগ্রাম পেরিয়ে স্বপ্নের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময়ই তাইজুলের জীবনে নেমে আসে ভয়াবহ বিপর্যয়। দুই কিডনি অকেজো হয়ে যায় তার। শুরু হয় নিয়মিত ডায়ালাইসিস। ব্যয়বহুল চিকিৎসা ও কিডনি প্রতিস্থাপনের প্রয়োজনীয়তায় থমকে যায় তার পড়াশোনা ও স্বাভাবিক জীবন। একসময় হাসপাতালের বেডে শুয়ে মৃত্যুর প্রহর গুনছিলেন তিনি।

চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন ছিল লাখ লাখ টাকা। যে পরিবারে একসময় একবেলা খাবার জোগাড় করাও কঠিন ছিল, সেই পরিবারের কাছে এত টাকা জোগাড় করা ছিল প্রায় অসম্ভব। তখন পাশে দাঁড়ান বন্ধু, সহপাঠী, বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় ভাই, আত্মীয়স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা। মায়ের অক্লান্ত চেষ্টা ও মানুষের সহযোগিতায় ২০১৭ সালে ভারতে গিয়ে কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয় তাইজুলের।

এরপর ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে আবার পড়াশোনায় ফেরেন তিনি। অবশেষে ১৮তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (বিজেএস) পরীক্ষায় ১২০তম স্থান অর্জন করে সিভিল জজ হিসেবে উত্তীর্ণ হয়েছেন এস এম তাইজুল ইসলাম।

মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার পূর্ব এনায়েতনগর ইউনিয়নের পূর্ব আলীপুর গ্রামের সন্তান তাইজুল। মাত্র আড়াই বছর বয়সে বাবাকে হারানোর পর তার বেড়ে ওঠা মায়ের সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। সন্তানদের পড়াশোনা চালিয়ে নিতে হাওয়া বেগমকে কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে নিজের ভাইদের কাছ থেকেও সহযোগিতা নিয়েছেন তিনি। কখনো না খেয়ে থেকেছেন, আবার কখনো নিজের প্রয়োজনের কথা ভুলে সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিয়েছেন।


দীর্ঘ ৩১ বছর ধরে একাই সন্তানদের জন্য সংগ্রাম করেছেন হাওয়া বেগম। অভাবের সংসারে বেড়ে উঠলেও ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় মেধার স্বাক্ষর রাখেন তাইজুল। ২০০৮ সালে আলীপুর দাখিল মাদ্রাসা থেকে দাখিল পরীক্ষায় গোল্ডেন এ প্লাস অর্জন করেন তিনি। পরিবার ও স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই মাদ্রাসার ইতিহাসে তিনিই প্রথম গোল্ডেন এ প্লাস অর্জনকারী শিক্ষার্থী। এরপর ঢাকা কলেজের মানবিক বিভাগ থেকে ২০১০ সালের এইচএসসি পরীক্ষাতেও এ প্লাস অর্জন করেন।

পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি পরীক্ষায় মেধাক্রমে ৫৮তম স্থান অর্জন করে আইন বিষয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। ২০১৫ সালে এলএলবি এবং ২০১৮ সালে এলএলএম সম্পন্ন করেন তিনি।

তবে এর মধ্যেই শুরু হয় জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়। ২০১৩ সাল থেকে শারীরিক নানা জটিলতায় ভুগতে শুরু করেন তাইজুল। প্রথমে কোমর ও পিঠে ব্যথাসহ বিভিন্ন সমস্যা দেখা দেয়। পরে ২০১৫ সালে কিডনিতে জটিলতা ধরা পড়ে। একপর্যায়ে চিকিৎসকেরা জানান, তার দুই কিডনিই অকেজো হয়ে গেছে।

শুরু হয় নিয়মিত ডায়ালাইসিস। বাড়তে থাকে চিকিৎসার ব্যয়। একসময় চিকিৎসকেরা কিডনি প্রতিস্থাপনের পরামর্শ দেন। এর জন্য প্রয়োজন ছিল প্রায় ৩০-৪০ লাখ টাকা। পরিবারের আর্থিক অবস্থার কারণে এ অর্থ জোগাড় করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। তখন তাইজুলের বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু, সহপাঠী, বড় ভাই, আত্মীয়স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা পাশে দাঁড়ান। যে যার সামর্থ্য অনুযায়ী সহযোগিতা করেন।

মা হাওয়া বেগম নিজের জমিজমা ও সঞ্চিত সম্পদ বিক্রি করে ছেলের চিকিৎসার বাকি অর্থ জোগাড় করেন। ২০১৭ সালে ভারতে গিয়ে কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয় তাইজুলের। এরপর ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে আবার পড়াশোনায় ফেরেন তিনি। দীর্ঘ লড়াই শেষে ১৮তম বিজেএস পরীক্ষায় ১২০তম স্থান অর্জন করে সিভিল জজ হিসেবে উত্তীর্ণ হন তিনি।

এলাকাবাসী বলেন, আমরা ভেবেছিলাম তাইজুল আর বাঁচবে না। কিন্তু মানুষের সহযোগিতায় সে চিকিৎসা পেয়েছে, সুস্থ হয়েছে। আজ সে জজ হয়েছে। এটা শুধু তার পরিবারের নয়, আমাদের পুরো এলাকার জন্য আনন্দের বিষয়।

মা হাওয়া বেগম বলেন, আমার ছেলে এমন রোগে পড়েছিল যে মনে হয়েছিল, তাকে আর বাঁচাতে পারব না। কিন্তু আল্লাহর রহমতে আর মানুষের সহযোগিতায় সে ফিরে এসেছে। আমার ছেলে আজ জজ হয়েছে। আমার সেই স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। আল্লাহর কাছে আমি কৃতজ্ঞ।

তাইজুল বলেন, আমার দুটি কিডনি যখন ড্যামেজ হয়ে গেল, তখন লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়। আমি তখন অনার্স তৃতীয় বর্ষে। আমাদের ঘরে খাওয়ার মতো চালও থাকত না। এমন অবস্থায় ৩০ লাখ টাকা চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন হলো। তখন মনে হয়েছিল, আমি হয়তো আর বাঁচব না, মায়ের স্বপ্নও পূরণ করতে পারব না। আমার মা চেয়েছিলেন আমি জজ হই। বন্ধুবান্ধব, বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় ভাই, আত্মীয়স্বজন অনেকে আমাকে সহযোগিতা করেছেন। তারা যদি সেদিন পাশে না দাঁড়াতেন, হয়তো আমি আজ এখানে থাকতাম না। আল্লাহর রহমতে আমি বেঁচে আছি এবং আজ জজ হতে পেরেছি। আমি সবার প্রতি কৃতজ্ঞ।

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

শিবচরে দুই বাসের সংঘর্ষে নিহত ৩, আহত ১০

শিবচরে দুই বাসের সংঘর্ষে নিহত ৩, আহত ১০

স্বর্ণালংকারসহ প্রবাসীর স্ত্রী উধাও

স্বর্ণালংকারসহ প্রবাসীর স্ত্রী উধাও

ভালোবেসে বিয়ে, স্বামীর হাতে স্ত্রী খুন হওয়ার অভিযোগ

ভালোবেসে বিয়ে, স্বামীর হাতে স্ত্রী খুন হওয়ার অভিযোগ

সেই তুষারকেই জেলা কমিটির আহ্বায়ক করেছে এনসিপি

সেই তুষারকেই জেলা কমিটির আহ্বায়ক করেছে এনসিপি

প্রেমের টানে কুড়িগ্রামের তরুণী মুকসুদপুরে প্রেমিকের বাড়িতে

প্রেমের টানে কুড়িগ্রামের তরুণী মুকসুদপুরে প্রেমিকের বাড়িতে

ঘরে ঢুকে প্রবাসীর স্ত্রীকে কুপিয়ে হত্যা, নিয়ে গেল আইফোন

ঘরে ঢুকে প্রবাসীর স্ত্রীকে কুপিয়ে হত্যা, নিয়ে গেল আইফোন

আরও পড়ুন

কিশোর গ্যাং বিরোধী যৌথ অভিযানে আটক ১০০

কিশোর গ্যাং বিরোধী যৌথ অভিযানে আটক ১০০

রংপুর পাবলিক লাইব্রেরি ঐতিহ্য হারিয়ে ধুঁকছে পাঠকখরায়

ঐতিহ্য হারিয়ে ধুঁকছে পাঠকখরায়

স্কুলছাত্রীর লাশ ঘিরে মিলছে নানা তথ্য যশোরে মন্দির দখলে নিতে ইসকনের অপতৎপরতা

যশোরে মন্দির দখলে নিতে ইসকনের অপতৎপরতা

খুলনা সিটি নির্বাচন বিএনপির বাধা কোন্দল গ্রুপিং জামায়াতের টার্গেট ‘মেয়র’

বিএনপির বাধা কোন্দল গ্রুপিং জামায়াতের টার্গেট ‘মেয়র’

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম