রয়টার্সের প্রতিবেদন
স্টারলিংক ব্যবহারকারীদের ওপর ইসরাইলি প্রতিষ্ঠানের নজরদারি!
Advertisement
যুগান্তর ডেস্ক
প্রকাশ: ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:০৬ পিএম
স্টারলিংকের লোগো। ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ডিজিটাল বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে স্পেসএক্সের স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবা স্টারলিংক ব্যবহারকারীদের লক্ষ্যবস্তু করার অভিযোগ উঠেছে ইসরাইলি বিজ্ঞাপন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ডিসকভার-টেকের বিরুদ্ধে। ব্যবহারকারীদের অবস্থান শনাক্ত করা কিংবা তাদের ওপর নজরদারি চালানোর উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠানটি বিজ্ঞাপন ব্যবহার করে থাকতে পারে বলে জানিয়েছেন এ বিষয়ে অবগত ছয় ব্যক্তি।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে।
জাপানের টোকিওভিত্তিক সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান ট্রেন্ড মাইক্রোর সহযোগী প্রতিষ্ঠান ট্রেন্ডএআইয়ের গবেষকরা ডিজিটাল বিজ্ঞাপনের তথ্য বিশ্লেষণ করে এ বিষয়ে সন্দেহজনক কার্যক্রমের সন্ধান পেয়েছেন। তাদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, স্পেসএক্সের স্টারলিংক সেবার ব্যবহারকারীদের কাছে প্রদর্শিত ডিজিটাল বিজ্ঞাপনের অন্যতম বড় উৎস হয়ে উঠেছিল ডিসকভার-টেক। এ বিষয়ে অবগত ছয় ব্যক্তি এসব তথ্য জানিয়েছেন।
গবেষকদের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, স্টারলিংক ব্যবহারকারীদের লক্ষ্য করে বিজ্ঞাপন দেখানোর জন্য দরপত্রে অংশ নেওয়া বিশ্বের শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি হয়ে উঠেছিল ডিসকভার-টেক। শতাধিক দেশে স্টারলিংকের ইন্টারনেট ট্রাফিকের বিপরীতে বিজ্ঞাপন কেনার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটি শীর্ষ অবস্থানে ছিল। এসব দেশের মধ্যে এমন কয়েকটি দেশও রয়েছে, যেখানে স্টারলিংক সেবা নিষিদ্ধ কিংবা সীমিত।
ডিজিটাল বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রে বিজ্ঞাপনদাতারা ব্যবহারকারীদের ব্রাউজার ও অ্যাপে বিজ্ঞাপন প্রদর্শনের জায়গা পেতে জটিল নিলামপ্রক্রিয়ায় অংশ নেন। এই প্রক্রিয়ায় ব্যবহারকারীদের ইন্টারনেট ব্যবহারের কিছু তথ্য বিজ্ঞাপন কেনার জন্য দরপত্রে অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানের কাছে পৌঁছাতে পারে।
স্টারলিংকের ব্যবহারকারীদের লক্ষ্য করে চালানো এই কার্যক্রম নিয়ে গত ১৫ অক্টোবর একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে ট্রেন্ডএআই। তবে প্রতিবেদনে ডিসকভার-টেকের নাম উল্লেখ করা হয়নি। সেখানে সন্দেহভাজন প্রতিষ্ঠানটিকে ‘শ্যাডো-আর্থ-৭৯’ নামে উল্লেখ করা হয়। সংশ্লিষ্ট ছয় ব্যক্তি জানিয়েছেন, এটি ডিসকভার-টেকের জন্য ট্রেন্ডএআইয়ের ব্যবহৃত সাংকেতিক নাম।
প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠানটির নাম সরাসরি উল্লেখ না করার কারণ জানতে চাইলে ট্রেন্ডএআই জানায়, ভুলভাবে কোনো পক্ষকে দায়ী করার ঝুঁকি কমানো এবং অতিরঞ্জিত বা বিভ্রান্তিকর পরিচিতি এড়ানোর লক্ষ্যেই তারা এ ধরনের পদ্ধতি অনুসরণ করে। প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য, ভুল পরিচিতি নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের বিভ্রান্ত করতে পারে, ঝুঁকি নির্ধারণের অগ্রাধিকার বদলে দিতে পারে এবং অনুপযুক্ত পদক্ষেপ নেওয়ার কারণ হতে পারে।
স্টারলিংক ব্যবহারকারীদের শনাক্ত ও অনুসরণ করার কৌশল খোঁজা এখন একটি বিশেষায়িত শিল্পে পরিণত হয়েছে। বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন সরকার স্যাটেলাইট ইন্টারনেট টার্মিনালের বিস্তার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে।
স্টারলিংক জাতীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তে স্পেসএক্স পরিচালিত স্যাটেলাইটের মাধ্যমে তথ্য আদান-প্রদান করে। ফলে এসব টার্মিনাল ব্যবহার করে স্থানীয় ইন্টারনেট বিধিনিষেধ এড়িয়ে যোগাযোগ করা, সংঘাতপূর্ণ এলাকায় সংযুক্ত থাকা কিংবা যুদ্ধক্ষেত্রে সামরিক তৎপরতা সমন্বয় করা সম্ভব হয়।
ইউক্রেনের জন্য স্টারলিংক বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দেশটির সামরিক বাহিনী সম্মুখসারিতে যোগাযোগ এবং ড্রোন হামলা পরিচালনার কাজে এই সেবার ওপর নির্ভর করে।
গত মে মাসে ইসরাইলি সংবাদপত্র হারেৎজ ও ওয়েবসাইট ইন্টেলিজেন্স অনলাইন পৃথক প্রতিবেদনে জানায়, ইসরাইলি মালিকানাধীন কিছু প্রতিষ্ঠান স্টারলিংক ব্যবহারকারীদের শনাক্ত ও অনুসরণ করার কৌশল সম্ভাব্য গ্রাহকদের কাছে তুলে ধরছিল। হারেৎজের প্রতিবেদনে বলা হয়, এ কাজে ডিজিটাল বিজ্ঞাপনের তথ্য কাজে লাগানো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকতে পারে।
বৃহত্তর নজরদারি কার্যক্রমের অভিযোগ
ট্রেন্ডএআইয়ের প্রতিবেদন প্রকাশের দিনই কানাডার সাইবার নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ সংস্থা সিটিজেন ল্যাব এবং নিউইয়র্কভিত্তিক বিজ্ঞাপন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান কনফিয়্যান্ট পৃথক তদন্তের ফল প্রকাশ করে ডিসকভার-টেকের নাম উল্লেখ করে।
দুই প্রতিষ্ঠানই অভিযোগ করে, ডিসকভার-টেক বিজ্ঞাপন কেনার নিলামপ্রক্রিয়ার অপব্যবহার করেছে। এ প্রক্রিয়ায় ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের কিছু তথ্য বিজ্ঞাপন কেনার জন্য দরপত্রে অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানের কাছে ফাঁস হয়ে যেতে পারে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব তথ্য সংগ্রহ, একত্র করা এবং অন্য তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে ব্যবহারকারীর পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে। এর মাধ্যমে ইন্টারনেটে ব্যবহারকারীদের গতিবিধি অনুসরণ করা এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাদের লক্ষ্য করে নজরদারি সফটওয়্যার ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সিটিজেন ল্যাব ও কনফিয়্যান্ট জানিয়েছে, ডিসকভার-টেকের বিজ্ঞাপন সংবাদমাধ্যম, সরকারি প্রতিষ্ঠান ও প্রযুক্তি কোম্পানির অন্তর্ভুক্ত কয়েক ডজন সংবেদনশীল নেটওয়ার্কে প্রদর্শিত হয়েছিল।
তদন্তের পর গুগল, কমকাস্টসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, তারা নিজেদের বিজ্ঞাপন প্ল্যাটফর্ম থেকে ডিসকভার-টেককে সরিয়ে দিয়েছে।
এ বিষয়ে অবগত এক ব্যক্তি ও আরও একজনের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত একটি বড় প্রযুক্তি কোম্পানি এবং একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা সম্প্রতি তাদের কর্মীদের লক্ষ্য করে ডিসকভার-টেকের বিজ্ঞাপন দেখানো হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে অভ্যন্তরীণ তদন্ত শুরু করেছে।
ইয়েমেন ও দক্ষিণ সুদানে বিজ্ঞাপন কেনায় শীর্ষে
ট্রেন্ডএআইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়, সন্দেহভাজন প্রতিষ্ঠানটির বিজ্ঞাপন কেনার ধরন এমন ইঙ্গিত দেয় যে, এটি সাধারণ বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন কার্যক্রমের পরিবর্তে ব্যবহারকারীদের লক্ষ্যবস্তু করা ও তাদের গতিবিধি অনুসরণের অবকাঠামো পরিচালনা করছিল।
প্রতিবেদনে স্টারলিংক ব্যবহারকারীদের লক্ষ্য করে বিজ্ঞাপন কেনার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটির অস্বাভাবিক ঝোঁকের বিষয়টি তুলে ধরা হয়। পাশাপাশি বলা হয়, সিরিয়া, লিবিয়া, ইয়েমেন ও দক্ষিণ সুদানে বিজ্ঞাপন কেনার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটি শীর্ষ অবস্থানে ছিল। আফগানিস্তানে ছিল দ্বিতীয় অবস্থানে।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, নিষেধাজ্ঞার আওতাধীন কিংবা সক্রিয় সংঘাত চলছে এমন দেশগুলোতে বৈধ পশ্চিমা বিজ্ঞাপনের চাহিদা কার্যত শূন্য। এমন পরিস্থিতিতে এসব দেশে প্রতিষ্ঠানটির বিপুলসংখ্যক বিজ্ঞাপনের দরপত্র জেতা সন্দেহজনক।
হাঙ্গেরি, ইসরাইল, মিসর, আজারবাইজান ও ভেনেজুয়েলাসহ কয়েকটি দেশে প্রতিষ্ঠানটি অবিশ্বাস্য রকমের বেশি দরপত্র জিতেছিল বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
বিষয়টি সম্পর্কে অবগত ছয় ব্যক্তির ভাষ্য অনুযায়ী, ট্রেন্ডএআইয়ের গবেষকরা নিশ্চিত ছিলেন যে সন্দেহজনক দরপত্র কার্যক্রমের পেছনে ডিসকভার-টেক রয়েছে। প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠানটির নাম প্রকাশ করা হবে কি না, তা নিয়েও তারা আলোচনা করেছিলেন। তবে ট্রেন্ডএআইয়ের নির্বাহীরা আইনি ঝুঁকির বিষয়টি উত্থাপন করার পর পাঁচজনের ভাষ্য অনুযায়ী, শেষ পর্যন্ত প্রকাশ্যে প্রতিষ্ঠানটির নাম উল্লেখ না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
শিল্পসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাইবার নিরাপত্তা খাতে এ ধরনের আত্মসংযমের ঘটনা অস্বাভাবিক নয়। বিশেষ করে কোনো নজরদারি কার্যক্রম প্রকাশ করলে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার আশঙ্কা থাকলে প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক সময় সরাসরি দায়ী পক্ষের নাম প্রকাশ থেকে বিরত থাকে।
এর আগে চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্রের সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান পালো অল্টো নেটওয়ার্কস একটি বৈশ্বিক সাইবার গুপ্তচরবৃত্তির অভিযান নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে চীনের প্রতি সরাসরি ইঙ্গিত করা বক্তব্য বাদ দিয়েছিল। যদিও প্রতিষ্ঠানটির গবেষকরা হামলার পেছনে বেইজিংয়ের সংশ্লিষ্টতা সম্পর্কে নিশ্চিত ছিলেন বলে সে সময় রয়টার্সের প্রতিবেদনে জানানো হয়।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, চীনের নাম সরাসরি উল্লেখ করলে দেশটিতে পালো অল্টোর ব্যবসায় সমস্যা তৈরি হতে পারে—এমন আশঙ্কায় প্রতিবেদনটির ভাষা নরম করা হয়েছিল। এর আগে চীনা কর্তৃপক্ষ দেশটির প্রতিষ্ঠানগুলোকে পালো অল্টোর পণ্য ব্যবহার না করার নির্দেশ দিয়েছিল এবং কোম্পানিটির কার্যক্রম পর্যালোচনার আওতায় ছিল।
তবে পালো অল্টো জানিয়েছিল, প্রতিবেদনে সরাসরি দায়ী পক্ষের নাম উল্লেখ না করার সঙ্গে চীনের ক্রয়সংক্রান্ত বিধিনিষেধের কোনো সম্পর্ক নেই। এ বিষয়ে ভিন্ন কোনো দাবি ‘অনুমাননির্ভর ও অসত্য’ বলেও উল্লেখ করেছিল প্রতিষ্ঠানটি।



